সিরামিকের আন্তর্জাতিক বাজার ক্রমেই বড় হচ্ছে। সিরামিক পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে দেশীয় কোম্পানিগুলো কেমন করছে?
আমি আপনাদের সঙ্গে এ বিষয়ে একমত। বাংলাদেশ সিরামিক কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে টেবিলওয়্যার রফতানিতে আমাদের কোম্পানিগুলো উন্নত মান নিশ্চিত করে একাধিক দেশে প্রতিযোগিতা করে পণ্য পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে টেবিলওয়্যার রফতানির প্রধান গন্তব্য হলো ইউরোপ, আমেরিকা, পশ্চিমা দেশ ও মধ্যপ্রাচ্য। এছাড়া স্বল্প পরিসরে স্যানিটারিওয়্যার রফতানিও শুরু হয়েছে। টাইলস রফতানি বাড়বে যদি উন্নত দেশের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক ডিজাইন, ইউনিক সারফেস ও বড় স্লাবের টাইলস উৎপাদন করা সম্ভব হয়।
মানের ক্ষেত্রে কী দেশীয় সিরামিক বিদেশী পণ্যের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে?
বিদেশী পণ্যের সঙ্গে শুধু পাল্লা দেয়া নয়, বরং আমরা দেশীয় সিরামিক কোম্পানিগুলো বাজারে আধিপত্য বিস্তার করেছি। প্রমাণস্বরূপ, বিসিএমইএর ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের টাইলস পণ্যের চাহিদার শতকরা ৮৫ ভাগ, স্যানিটারি পণ্যের ৫৯ ভাগ ও টেবিলওয়্যারের শতকরা ৯২ ভাগ দেশীয় কোম্পানিগুলো পূরণ করেছে। এটা সম্ভব হচ্ছে দেশীয় কোম্পানিগুলোর বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ক্রমাগত প্রযুক্তিগত ও দক্ষতাগত উন্নয়নের ফলে। নতুন ডিজাইন ও মডেলের পণ্য তৈরি, গুণগত মানের উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি এবং বিস্তৃত ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে দেশীয় কোম্পানিগুলো এক দশক ধরে দেশের বাজারে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই ধারা আগামীতেও অটুট থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।
সিরামিকে দেশীয় কাঁচামাল কতটা এবং আমদানি করতে হয় কতটুকু?
প্রয়োজনীয় কাঁচামালের শতকরা ১০ ভাগ দেশীয়ভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব। বাকি ৯০ ভাগ কাঁচামাল, যেমন বল ক্লে, চায়না ক্লে, ফেল্ডস্পার এবং অন্যান্য খনিজ পদার্থ বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতে হয়।
সিরামিক পণ্য বর্তমানে বিলাসপণ্যের গণ্ডি পার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে। এর দাম ক্রেতা সাধারণের নাগালে রাখতে গেলে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন? বাজেটে সিরামিক খাতের জন্য ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা কী?
এটা ঠিক যে সিরামিক পণ্য একটা সময় সম্পূর্ণরূপে বিলাসপণ্য হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এখন এটা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। এর পেছনে মূল কারণ হলো দেশীয় কোম্পানিগুলোর বাজারে আধিপত্য বিস্তার এবং বিভিন্ন স্তরের আয়ের মানুষদের চাহিদামাফিক সিরামিক পণ্য উৎপাদন। সিরামিক পণ্যের দাম ক্রেতা সাধারণের নাগালে রাখতে সরকার থেকে কিছু নীতিগত সমন্বয় করা প্রয়োজন। গত তিন অর্থবছরের বাজেট পরিকল্পনায় আমাদের যা দাবি ছিল, সেই অনুযায়ী যথারীতি এবারো দাবি তুলছি, সিরামিক টাইলসের ওপর সম্পূরক কর মওকুফ করার ব্যাপারে। এ ব্যাপারে বর্তমান সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি। আগেও বলেছি, সিরামিক টাইলসের জন্য আমদানি করা কাঁচামালে থাকা পানি ও ময়েশ্চারের ওপরও আমাদের ট্যাক্স ডিউটি দিতে হয়। সরকারের কাছে বরাবরের মতো এবারো প্রত্যাশা থাকবে এ ট্যাক্স ডিউটি যেন সমন্বয় করা হয়। এছাড়া উৎপাদনশীল খাত হিসেবে সিরামিক পণ্য শিল্পকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব রাখছি। এসব প্রত্যাশার প্রতিফলন হলে দামও নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আর এ শিল্পও বিকশিত হবে।
বিগত বাজেটে আপনাদের দাবি কতটা পূরণ হয়েছে?
পূর্ববর্তী বাজেটগুলোয় আমাদের কিছু দাবির আংশিক প্রতিফলন দেখা গেছে। তবে একটু আগেই বলেছি, অপ্রত্যাশিত ট্যাক্স ডিউটি সমন্বয় ও বিশেষ সুবিধা প্রদান করলে সিরামিক শিল্পের বিকাশ ঘটবে।
দেশের বাজারে আপনারা কয় ধরনের সিরামিক পণ্য সরবরাহ করেন?
দেশের বাজারে আমরা ‘ফ্রেশ সিরামিকস’ ব্র্যান্ডের অধীনে সিরামিক টাইলস উৎপাদন ও বাজারজাত করে আসছি। তবে ভবিষ্যতে স্যানিটারিওয়্যার ব্যবসারও পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা ফ্রেশ সিরামিকস শুরু থেকেই ‘নান্দনিক জীবনের ফ্রেশ সূচনা’ এ দর্শনকে ধারণ করে এগিয়ে চলেছি। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল—ভোক্তাদের হাতে পৌঁছে দিতে এমন সিরামিক টাইলস, যা মানে আপসহীন এবং ডিজাইনে সময়োপযোগী। ক্রেতাদের জীবনযাত্রায় সৌন্দর্য ও মানের এক ফ্রেশ সূচনা দিতেই আমরা নিরলসভাবে কাজ করেছি। আর তাই ভোক্তাদের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতিফলনেই আজ আমরা ‘বিক্রয়ে দেশসেরা টাইলস ব্র্যান্ড’ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। আমরা সম্মানিত ভোক্তাদের উদ্দেশে আগেও বলেছি আর এখনো আবার অনুরোধ করব—পণ্যের দামের পাশাপাশি গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দিন। কারণ একটি মানসম্মত পণ্য কেবল আপনার বাসাবাড়ির মান নয়, আপনার জীবনযাত্রার মানও বদলে দিতে পারে। সবশেষে আসুন আমরা সবাই মিলে দেশীয় সিরামিক পণ্য ব্যবহার করে দেশের সিরামিক শিল্পের অগ্রযাত্রায় ভূমিকা রাখি।
সিরামিক খাতে দেশে কর্মসংস্থান এখন কত? বিনিয়োগের পরিমাণ কত?
বর্তমানে দেশের সিরামিক শিল্পে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন দক্ষ শ্রমিক, প্রকৌশলী, স্থপতি, ডিজাইনার, মার্কেটিং ও সেলস পেশাজীবীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের জনবল।
এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ এরই মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ছাড়িয়ে গেছে, যা প্রতি বছরই বাড়ছে। দেশীয় ও বিদেশী উদ্যোক্তাদের আগ্রহের কারণে নতুন নতুন কারখানা ও উৎপাদন ইউনিট স্থাপিত হচ্ছে, যা কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো সম্প্রসারণ করছে।
তাছাড়া গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে সিরামিক শিল্প দিন দিন আরো উন্নত ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছে—যা ভবিষ্যতে আরো বড় পরিসরে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের দিক উন্মোচন করবে।
সিরামিক খাতে প্রধান কাঁচামাল গ্যাস। গ্যাস সংকটের কারণে এ খাত প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছে। এখন পরিস্থিতি কী?
এর আগেও বলেছি, সিরামিক খাতে জ্বালানি সংকট মোকাবেলা একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অব্যাহত প্রক্রিয়া। এ চ্যালেঞ্জ সবসময়ই ছিল।










