জুলাই অভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উদ্যোক্তা হিসেবে শিক্ষার্থীদের এ ত্যাগ ও সংগ্রামের বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
গত বছর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়, যার নেতৃত্বে ছিল দেশের ছাত্রসমাজ। গণ-অভ্যুত্থানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। একজন শিক্ষা উদ্যোক্তা হিসেবে আমি এ তরুণদের নেতৃত্ব, ত্যাগ ও দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রশংসা করি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা শুধু অংশই নেননি, জীবনও উৎসর্গ করেছেন। অধিকার আদায়ের প্রতিটি ধাপে তাদের দায়িত্বশীলতা, শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বগুণ ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তারা সমাজের নানা স্তরে গণসচেতনতা সৃষ্টি করেছেন, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে জনমত গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করে তথ্য ছড়িয়ে দিয়েছেন, যা আজকের যুগের তরুণদের এগিয়ে রেখেছে।
শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা ও সুপারিশের ভিত্তিতেই বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হয়েছে। এ সরকারের কাছে কেমন বাজেট চান?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পেছনে দেশের ছাত্রসমাজের অসামান্য ভূমিকা রয়েছে। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও সুপারিশকে সম্মান জানিয়ে গঠিত এ সরকারের কাছ থেকে একটি শিক্ষাবান্ধব ও ভবিষ্যৎমুখী বাজেট প্রত্যাশা করা অত্যন্ত স্বাভাবিক। বিশেষত, শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের যে বৈষম্য ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য এবারের বাজেটে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক।
উল্লেখযোগ্য দাবিগুলোর মধ্যে প্রথমেই আসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহারের বিষয়টি। এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি কোনো অনুদান পায় না, শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়। কর আরোপের ফলে সেই আর্থিক চাপ শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়ে, যা উচ্চশিক্ষাকে ব্যয়বহুল করে তোলে। অন্যদিকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি পায়। এ পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট বৈষম্যের জন্ম দেয়, যা দূর করতে হলে এ কর দ্রুত প্রত্যাহার করা জরুরি।
এছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে বাজেটে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা জরুরি। পাঠক্রমের আধুনিকীকরণ, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী শিক্ষার ভিত্তি গড়ে তোলা সম্ভব। একই সঙ্গে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে শিল্পায়ন, উদ্যোক্তা সহায়তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এতে দক্ষ যুবশক্তি দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারবে।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করা জরুরি। এর মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের পথ উন্মোচন হবে এবং শিক্ষিত বেকারত্ব কমবে। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মৌলিক গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে বিশেষ গবেষণা তহবিল বরাদ্দ অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা যায়।
আরো একটি বিষয় হলো ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা। গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবা সহজলভ্য হলে সর্বজনীন শিক্ষার পথ আরো প্রশস্ত হবে। এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের মাধ্যমে এবারের বাজেট শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
শিক্ষা খাতের জন্য বাজেটে বিশেষ কী প্রত্যাশা করছেন?
প্রত্যাশার বিষয়টি অনেক গভীর ও ব্যাপক হলেও প্রাথমিকভাবে অত্যাবশ্যকীয় কিছু প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করতে চাই, যা কিনা শিক্ষা খাতের উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ একটি নির্ধারক উপাদান। এ খাতের জন্য এবারের বাজেটে কিছু অত্যাবশ্যকীয় প্রত্যাশা রয়েছে, যা বাস্তবায়ন হলে সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
সর্বপ্রথম জাতীয় বাজেটে উল্লেখযোগ্য হারে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা জরুরি, যাতে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত মানোন্নয়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ বাস্তবায়ন করা যায়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় মানোন্নয়নের পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। আধুনিক পাঠ্যপুস্তক, কার্যকর পাঠদানের কৌশল এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রসার শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান দৃঢ় করতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে দেশের তরুণদের জন্য কর্মমুখী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ খাতে বাজেট বাড়ানো হলে বেকারত্ব হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের চাহিদা পূরণ সহজ হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার এ খাতের অন্যতম প্রধান দাবি। শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি নির্ভর এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর কর আরোপ শিক্ষাকে ব্যয়বহুল করে তুলছে। এ কর প্রত্যাহার করা হলে উচ্চশিক্ষা অধিক সহজলভ্য হবে এবং শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক চাপও কমবে। একইভাবে সব ধরনের শিক্ষা উপকরণ, ল্যাব সরঞ্জাম ও আইটি ডিভাইসের ওপর থেকে কর প্রত্যাহার করা উচিত, যাতে শিক্ষা গ্রহণ ব্যয়সাধ্য না হয়।










