দেশের ইলেকট্রনিক পণ্যের দেশীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে আপনারা বাজারে বেশ শক্তিশালী অবস্থানে আছেন। দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখা এবং গ্রাহকের আস্থায় থাকার পেছনের গল্পটা কী?
ইলেক্ট্রো মার্ট ১৯৮০ সালে যাত্রা শুরু করে। প্রথমদিকে আমরা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের পণ্য সরাসরি এনে দেশের বাজারে বিক্রি করতাম। পরে ১৯৯৮ সালে আমরা চীনের বিখ্যাত ব্র্যান্ড কনকা ও গ্রীর সঙ্গে প্রযুক্তি শেয়ারিংয়ের কাজ শুরু করি। ২০০৪ সালের দিকে অ্যাসেম্বলিং কারখানা তৈরি করি। ২০১৮ সালে আমরা নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় পূর্ণাঙ্গ কারখানা চালু করি। নিজেরা সরাসরি অ্যাসেম্বলিং ও উৎপাদন করায় নতুন নতুন প্রযুক্তি খুব দ্রুত সংযোজন করতে পারছি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আবহাওয়া, গ্রাহক চাহিদা, পণ্য ব্যবহারে গ্রাহকের অভ্যস্ততা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে পণ্যের মান উন্নয়ন ও ডিজাইন তৈরি করি। প্রযুক্তি সংযোজনেও আমরা গ্রাহকের চাহিদার কথা মাথায় রাখি। একই সঙ্গে গ্রাহককে বিক্রয়োত্তর সেবা দেয়া এবং পণ্যের দাম নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করছি। এছাড়া ১৯৯৮ সালে আমরাই প্রথম কোনো ইলেকট্রনিক পণ্যে পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি দিই। তখন মানুষ পণ্য কেনার সময় গুণগত মান নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকার নিশ্চয়তা পায়। এসব কারণে গ্রাহক অন্য অনেক ব্র্যান্ডের তুলনায় আমাদের ওপর বেশি আস্থাশীল।
দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ এবং কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ পুরনো। আপনারা প্রায় ৪৫ বছর ধরে দেশের ইলেকট্রনিকস খাতে বড় বিনিয়োগ নিয়ে ব্যবসা করছেন। বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে আপনাদের অভিজ্ঞতা কী?
বাংলাদেশের বিনিয়োগে একটু চ্যালেঞ্জ তো আছেই। তার মধ্যে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, মন্ত্রণালয় থেকে বেশকিছু অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এসব অনুমোদন নেয়ার ক্ষেত্রে অনেক বেশি সময় লাগে। যেটি বিনিয়োগের শুরুতেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। সরকারের অনুমোদন, ভূমির মালিকানা হস্তান্তর, গ্যাসের অনুমোদনসহ বেশকিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। আমরা চাই নতুন বিনিয়োগ নিয়ে যারাই আসুন, তারা যেন ঝামেলামুক্তভাবে কাজ করতে পারেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনুমোদন যৌক্তিক সময়ের মধ্যে হাতে পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) একটি বিনিয়োগ সামিট করেছে। সেখানে তারা অনেক বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমরা আশা করি, যারা পুরনো বিনিয়োগকারী আছেন এবং নতুন যারা আসবেন সবাই যেন প্রাপ্য সেবা যৌক্তিক মূল্যে, সহজভাবে কম সময়ে পান। অনেক সময় ব্যাংক সুদ এবং ব্যাংক লোন নিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়। সরকারের দিক থেকে নীতিসহায়তার প্রয়োজন হয়। আশা করি সেই বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখবে সরকার। একই সঙ্গে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাও সরকার বিনিয়োগকারীদের দেবে, সেই প্রত্যাশা থাকবে।
আপনারা অ্যাসেম্বল করার কারণে বিভিন্ন পণ্যের যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে সবকিছুই দেশের বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়। এক্ষেত্রে এলসি করার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যায় পড়তে হয় কিনা?
কয়েক বছর ধরে বিশ্বে নানা যুদ্ধবিগ্রহ লেগে আছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘাত নতুন করে বিশ্বে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তাপ। আমাদের এখানেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে আমাদের এখানে দীর্ঘদিন ধরে ডলার সংকট চলছে, এলসি করতে অসুবিধা হচ্ছে। যদিও এখন এটি অনেকটাই কমে এসেছে। তবু যতটুকু আছে, তার চাপ যেন গ্রাহক পর্যায়ে না যায় সেই চেষ্টা আমরা করে যাচ্ছি।
ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা দীর্ঘদিনের। একই সঙ্গে ব্যাংক সুদের হার নিয়েও ব্যবসায়ীদের আপত্তি রয়েছে। ব্যাংক খাত নিয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কী?
ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে বেশকিছু জটিলতা রয়েছে। লম্বা সময় লাগা, সুদের হার বেশি হওয়া এবং যখন তখন সুদের হার বেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও রয়েছে। ফলে আমরা চাই, এ সমস্যাগুলোর সমাধান হোক। ব্যাংক সুদের হার যেন সিঙ্গেল ডিজিট (৯ শতাংশ বা তার কম) করা হয়। পৃথিবীর অন্য কোথাও এত বেশি সুদের হার আছে কিনা আমার জানা নেই। উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করা প্রায় অসম্ভব বিষয়। ব্যাংক সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে এলে বিনিয়োগ বাড়বে, দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে। বর্তমানে যুবসমাজের বড় একটি অংশ বেকার। ফলে এখানে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা খুব জরুরি।
বিদেশী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বাজার প্রতিযোগিতার জায়গায় দেশীয় পণ্যের গুণগত মান উন্নয়নে কতটুকু এগিয়েছে? একজন ভোক্তা বিদেশ থেকে আসা ফ্রেশ পণ্য না নিয়ে দেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বেশি আস্থা রাখবে কীভাবে?
দেশে ইলেকট্রনিকস খাতে যেসব পণ্য তৈরি হচ্ছে সেগুলোর সঙ্গে বিদেশ থেকে আসা ফ্রেশ পণ্যের গুণগত মানের দিক থেকে কোনো পার্থক্য আছে বলে আমি মনে করি না। বরং দেশে উৎপাদিত পণ্য বেশি এগিয়ে। কারণ এখানে যখন উৎপাদন হয়, তখন এখানকার মানুষের প্রয়োজন, অভ্যস্ততা এবং এখানকার পরিবেশের বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়। কিন্তু বিদেশে তৈরি হয়ে আসা একটি পণ্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যায়। শুধু বাংলাদেশে আসে তা কিন্তু নয়। ফলে তাদের পক্ষে আমাদের এখানকার পরিবেশ এবং ভোক্তার প্রয়োজনগুলো ঠিকভাবে বিবেচনায় নেয়ার সুযোগ কম। কনকা এবং গ্রী বিশ্বের ২০০টির বেশি দেশে বিক্রি হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও অন্য অনেক দেশে এই দুটি ব্র্যান্ডের কারখানা রয়েছে। এর মূল কারণই হচ্ছে ওইসব দেশের পরিবেশ ও মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে মানানসই করে পণ্য তৈরি করা। ফলে বিদেশী ফ্রেশ পণ্যের চেয়ে দেশে উৎপাদিত পণ্যের ওপর বেশি আস্থা রাখা যায়।
বর্তমান যুগ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) যুগ। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং এআই সংযোজনে আপনারা কতটুকু এগিয়েছেন?
আমাদের বেশির ভাগ পণ্যে এরই মধ্যে এআই প্রযুক্তি সংযোজন করা হয়েছে। একসময় ছিল স্মার্ট টিভি, এখন ভয়েস কন্ট্রোল টিভি। ওয়াশিং মেশিনে আমরা এআই ব্যবহার করেছি। ওয়াশিং মেশিনে কাপড় ধোয়ার সময় কতটুকু পানি প্রয়োজন, কীভাবে সেটি ওয়াশ করতে হবে এবং ডিটারজেন্টের পরিমাণ কতটুকু হবে—এর সবকিছু ঠিকঠাক নিশ্চিত করা হচ্ছে এআইয়ের কাজ। আমাদের এসি ওয়াই-ফাইয়ের মাধ্যমে কন্ট্রোল করা যায়। এভাবে আমরা আমাদের সব পণ্যেই সর্বশেষ আপডেট প্রযুক্তির সংযোজন করছি।
এবারের বাজেটে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
যারা দেশে কারখানা করেছে তাদের বছরভিত্তিক সরকার একটা কর অব্যাহতি দিয়ে থাকে। এটি এক বছর মেয়াদি। পরবর্তী বছর আবার এটি বাড়ানো হয়। প্রতি বছরই নতুন নতুন শর্ত জুড়ে দেয়া হয়। নানা সংযোজন-বিয়োজন থাকে। প্রতি বছর সরকারি নানা সুবিধা নেয়া এবং শর্ত মানার জন্য আমাদের বাড়তি সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। একই সঙ্গে সেসব শর্তের সঙ্গে মিল রেখে কার্যক্রমেও পরিবর্তন আনতে হয়। যেটি ব্যবসার ঝুঁকি বাড়ায়, ঝামেলা তৈরি করে। আমরা চাই, এটি প্রতি বছর পরিবর্তন না করে দীর্ঘ সময়ের জন্য যেন বহাল রাখা হয়। তাহলে আমরাও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারি। বিডাও বলেছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হবে। এখন যদি সরকার জানিয়ে দেয়, আগামী ১০ বছর করহার এই হবে, কাস্টমস এই নীতিতে চলবে, আমদানি-রফতানি এই নীতিতে এতটুকু ফি দিতে হবে; এই ১০ বছর এটি আর কোনো পরিবর্তন হবে না। যদি এমনটা করা যায় তাহলে তা নতুন-পুরনো সব বিনিয়োগকারীর জন্য সুবিধাজনক হবে। ঝামেলামুক্ত ব্যবসায়ের পরিবেশ তৈরি হবে। আমরাও ১০ বছরের বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়ের পরিকল্পনা করতে পারব। বাড়তি অর্থ ও সময় অপচয় হবে না। হয়রানিও থাকবে না, ঝুঁকিও কমবে।
নকল পণ্য তৈরি এবং ব্যবহৃত পণ্য আমদানি করা হয়। এ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য কী?
আমরা যারা দেশে পণ্য উৎপাদন করি তারা দেশের বাজারে বিক্রি এবং বিদেশে রফতানির উদ্দেশ্যেই কারখানা গড়েছি। সেজন্য আমাদের সরকারের উচিত, কেউ যেন নকল পণ্য বাজারে নিয়ে আসতে না পারে তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে দেশের মধ্যেও অনেকে নকল পণ্য তৈরি করে, স্টিকার পরিবর্তন করে বাজারে নিয়ে আসে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। ভোক্তা অধিকারসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা যেন তদারকি বাড়ায় এবং আমদানির সময় কাস্টমসও যেন বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখে। পণ্য কোথা থেকে এল, কাগজপত্র, ডিক্লারেশন—এসব কিছুই দেখতে হবে। দেশে যেসব ক্ষেত্রে ব্যবহৃত পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ রয়েছে, অনেক সময় দেখা যায় নানা কৌশলে সেসব পণ্য আমদানি হয়। এটিও বন্ধ করতে হবে। বিদেশে যে পণ্যটির মেয়াদ শেষ অথবা ব্যবহার হয়েছে সেটি এখানে নিয়ে এলে দিন শেষে এ দেশ উন্নত বিশ্বের ইলেকট্রনিক পণ্যের ভাগাড়ে পরিণত হবে। এটি করতে দেয়া যাবে না।










