চিটাগং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি (সিআইইউ) কীভাবে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করতে কাজ করছে?

চিটাগং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি (সিআইইউ) মূলত ১৯৯৯ সালে ঢাকায় ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) শাখা ক্যাম্পাস হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও ২০১৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বাংলাদেশ সরকার ও ইউজিসির অনুমোদন লাভ করে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ট্রাস্টের নাম ‘ইএসটিসিডিটি’ বা ‘এডুকেশন, সায়েন্স, টেকনোলজি অ্যান্ড কালচারাল ডেভেলপমেন্ট ট্রাস্ট’, যা দেশের খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পপতি ও প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের সমম্বয়ে গঠিত। এই ট্রাস্ট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর প্রাসঙ্গিক নিয়ম ও বিধান অনুসরণ করে সমাজ উন্নয়নমূলক কাজের অংশ হিসেবেই ঢাকায় আইইউবি এবং চট্টগ্রামে চিটাগং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি (সিআইইউ) প্রতিষ্ঠা করে। চিটাগং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজ সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচালনা করে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষাদর্শন মূলত লিবারেল আর্টস ফাউন্ডেশনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ফলে শিক্ষার্থীরা যে বিষয়েই বিশেষায়িত হোক না কেন তারা সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে মৌলিক জ্ঞান লাভ করে থাকে। শিক্ষার ক্ষেত্রে সিআইইউ নর্থ আমেরিকান কারিকুলাম পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকে। ওপেন ক্রেডিট পদ্ধতিতে পরিচালিত এ পদ্ধতিতে প্রায় প্রতিটি কোর্সে ছাত্রছাত্রীদের জন্য ক্লাস প্রেজেন্টেশন বাধ্যতামূলক। তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়মিত ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুরে যেতে হয়, ফলে তারা বাহ্যিক জগৎ সম্পর্কে একটি আগাম ব্যবহারিক ধারণা পেয়ে থাকে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ‘লাইভ ইন ফিল্ড এক্সপেরিয়েন্স’ বা ‘এলএফই’, যার আওতায় ছাত্রছাত্রীদের গ্রামীণ জীবন তথা গ্রামীণ অর্থনীতি, সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা প্রদান করা হয়। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি অনুষদে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। অনুষদগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই রয়েছে পর্যাপ্ত পরিমাণে পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষকমণ্ডলী এবং তাদের প্রায় সবাই দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাকাজে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং তাদের প্রবন্ধগুলো এরই মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশ হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে যেখানে প্রায় ২ হাজার ২০০ জন শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি প্রদান করা হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কী ধরনের নীতিসহায়তা পাওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?

আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়নের প্রধান উৎস শিক্ষার্থীদের থেকে পাওয়া টিউশন ফি। এর বাইরে সরকারি বিশ্ববিদ্যায়গুলোর মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারের কাছ থেকে কোনো ধরনের অনুদান পায় না। ফলে একাডেমিক কার্যক্রম বা ক্যাম্পাস উন্নয়নের মতো বিপুল কর্মযজ্ঞ সম্পাদন করার পর গবেষণা বা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে খুব বেশি অর্থ ব্যয়ের মতো সামর্থ্য বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর থাকে না। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাই আগামী অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করছি।

চট্টগ্রামের অর্থনীতি ও শিল্পপ্রবণতা মাথায় রেখে সিআইইউ কীভাবে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগ গড়ে তুলছে?

বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের স্থানীয় শিল্প বা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষা-গবেষণার ক্ষেত্রে যেমন লাভবান হয়, ঠিক ইন্ডাস্ট্রিগুলোও বিশ্ববিদ্যালয়ের এ গবেষণালব্ধ ফলাফল থেকে ব্যাপকভাবে লাভবান হয়। আমাদের চিটাগং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি ঠিক একই ধরনের ফিলোসফি বা দর্শন নিয়ে এগিয়ে চলেছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে খ্যাতনামা কোরিয়ান বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী ইয়ংওয়ান করপোরেশন এবং চিটাগং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির (সিআইইউ) মধ্যে এক সমঝোতা স্মারক চুক্তি সম্পাদন হয়, যাতে ইয়ংওয়ান করপোরেশন সিআইইউর শিক্ষার্থীদের জন্য একগুচ্ছ সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব দিয়েছে। এ সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইয়ংওয়ান সিআইইউর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থীকে চার বছরের জন্য শতভাগ বৃত্তি প্রদান করবে। এসব শিক্ষার্থীকে ইয়ংওয়ানের নির্বাহীরা সময় সময় মেন্টরশিপ প্রদান করবেন এবং অধ্যয়ন শেষে তারা ইয়ংওয়ানের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ ও চাকরির সুযোগ লাভ করবে। এছাড়া শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কোরিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনেও ইয়ংওয়ান আমাদের সহায়তা করবে। নিয়মিত শিক্ষক ছাড়াও আমাদের এখানে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পে কর্মরত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ‘অ্যাডজাংকট ফ্যাকাল্টি’ হিসেবে নিয়মিত ক্লাস নিয়ে থাকেন। আমাদের ব্যবসায় অনুষদের ‘করপোরেট টক’, ‘কানেক্টিং সি-সুইট’-এর মতো অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। এছাড়া সিআইইউর বিভিন্ন অনুষদ নিয়মিত ওয়ার্কশপ এবং সেমিনারের আয়োজন করে থাকে যেখানে ইন্ডাস্ট্রি হতে আগত নির্বাহীরা রিসোর্স পারসন বা প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকেন। আমাদের অনুষদগুলোর পাঠ্যক্রম বা কারিকুলাম হালনাগাদকরণের সময়ও আমরা ইন্ডাস্ট্রি এক্সপার্টের মতামত গ্রহণ করি, ফলে আমরা পাঠ্যক্রমগুলো শিল্পের চাহিদা এবং তাদের চাওয়া-পাওয়ার ওপর গড়ে ওঠে। এছাড়া আমাদের শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক ইন্ডাস্ট্রি ভিজিটে যেতে হয়। ২০২৩ সালে আমরা একটি জব ফেয়ারের আয়োজন করি যেখানে বড় বড় কোম্পানি অংশগ্রহণ করে। বেশ কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামের বিখ্যাত ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘বিএসআরএম’-এর সঙ্গে আমরা যৌথভাবে একটি ম্যানেজমেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম পরিচালনা করেছিলাম। অতিসম্প্রতি চট্টগ্রামের একটি বিখ্যাত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের ব্যবসায় অনুষদের শিক্ষকরা একটি যৌথ গবেষণার কাজ সম্পাদন করেছেন যেটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি কর্তৃক বেশ প্রশংসিত হয়েছে। বিভিন্ন প্রফেশনাল বডি এবং করপোরেট সংস্থার সঙ্গে আমরা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি যাদের মধ্যে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব চার্টার্ড সার্টিফায়েড অ্যাকাউন্ট্যান্টস’, ‘ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ’, ‘লংকাবাংলা সিকিউরিটিজ বাংলাদেশ’, ‘ইউএসএইড ফিড দ্য ফিউচার’, ‘ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ’, পিটুপি ফ্যামিলি, সিটি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক উল্লেখযোগ্য। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে আমরা বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছি। এসব পদক্ষেপ বা প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা ইন্ডাস্ট্রিগুলোর সঙ্গে একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছি এবং ভবিষ্যতেও এ প্রবণতা বজায় রাখার ইচ্ছা পোষণ করছি। দেশীয় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ওপর ‘বিজনেস কেইস’ তৈরিতে আমাদের সিআইইউর শিক্ষকরা কাজ করে চলেছেন।