২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এলপিজি খাতের জন্য কী ধরনের নীতিসহায়তা প্রত্যাশা করছেন? বিশেষ করে ভ্যাট ও আমদানিতে শুল্কে কোনো পরিবর্তন চান?
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এলপিজি খাতের জন্য নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ভ্যাট ও আমদানি শুল্কের ক্ষেত্রে। লোয়াব ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের কিছু সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন ও সহায়তা প্রত্যাশা রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে এলপিজি বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য, যা ভোক্তাকে বহন করতে হয়। এটি মওকুফ করা গেলে প্রতি সিলিন্ডারে গ্রাহকের প্রায় ১০০ টাকা সাশ্রয় হবে। এলপিজি আমদানিতে বিদ্যমান শুল্কহার কমিয়ে ভোক্তাদের জন্য মূল্য সহনীয় রাখা সম্ভব। এক্ষেত্রে আমদানি ও বিক্রি দুই পর্যায়ে পৃথকভাবে ভ্যাট ও শুল্ক আরোপের পরিবর্তে এই দুটি ধাপ একীভূত করে শুধু আমদানী পর্যায়ে শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে। ফলে সরকার সম্পূর্ণ রাজস্ব পাবে এবং একই সঙ্গে এলপিজি শিল্পে সমতা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে। বর্তমানে এলপিজি অপারেটরদের বিভিন্ন
লাইসেন্স ও অনুমোদনের জন্য প্রায় ২০টি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এ জটিলতা দূর করতে একটি ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করলে ব্যবসা পরিচালনায় সময় ও খরচ কমবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য অস্থিরতা এবং দেশে ডলার সংকট—এ দুটি বিষয় কীভাবে খাতকে প্রভাবিত করছে?
আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য অস্থিরতা এবং দেশে ডলার সংকট বাংলাদেশের এলপিজি খাতকে বহুমাত্রিকভাবে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের এলপিজি চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ হয়, যা মূলত ডলারে পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু চলমান ডলার সংকটের কারণে অনেক ব্যাংক এলসি খুলতে অনিচ্ছুক। ফলে আমদানিকারকরা সময়মতো এলসি খুলতে পারছেন না। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত এক্সচেঞ্জ রেট থেকেও অনেক বেশি রেটে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এলসি সেটেল করছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির মূল্য ওঠানামা করছে। সৌদি আরামকোর কন্ট্রাক্ট প্রাইসের (সিপি) পরিবর্তন অবধারিত হারে অনুসরণ করতে হবে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য এলপিজিকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করে এলসি খোলার ক্ষেত্রে একে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পাশাপাশি এলপিজি আমদানির এলসি নিষ্পত্তি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত বিনিময় হারেই সম্পন্ন করতে হবে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এলপিজি খাতের স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
শহর ও গ্রামে পাইপলাইন গ্যাস সম্প্রসারণের উদ্যোগের মধ্যে এলপিজি খাতের ভবিষ্যৎ কীভাবে দেখছেন?
শহর ও গ্রামে পাইপলাইন গ্যাস সম্প্রসারণের উদ্যোগ বাংলাদেশের এলপিজি খাতের ভবিষ্যতের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশ সরকার শহর ও গ্রামীণ অঞ্চলে পাইপলাইন গ্যাস সরবরাহ সম্প্রসারণের জন্য একাধিক প্রকল্প রয়েছে। তবে বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী দেশে বর্তমানে প্রায় ৯ থেকে ১০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় এক টিসিএফ গ্যাস ব্যবহৃত হওয়ায়, বিদ্যমান রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৯-১০ বছর স্থায়ী হবে বলে ধারণা করা যাচ্ছে। এছাড়া পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রাখতে হলে আমদানীকৃত এলএনজি ব্যবহার করতে হয়, যার জন্য বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এ বাস্তবতায় পাইপলাইন সম্প্রসারণ প্রকল্প অর্থনৈতিক দিক থেকে তেমনভাবে বাস্তবসম্মত নয়। বর্তমানে দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন নয় এবং দেশীয় কোনো একটি গ্যাসক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি হলে সারা দেশে সংকট দেখা দেয়। তাই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিকল্প উৎসের ওপর গুরুত্বারোপ করা এখন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে এলপিজি খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ কেমন?
বর্তমানে বাংলাদেশের এলপিজি কোম্পানিগুলোর যে উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা রয়েছে, তা ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট। বর্তমানে মোট সক্ষমতার মাত্র ৬০-৭০ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে, বাকিটা অব্যবহৃত অবস্থায় রয়েছে। এ অতিরিক্ত অব্যবহৃত সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়, বর্তমানে এলপিজি খাতে নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ একটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এলপিজি খাতে অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ কী কী?
এলপিজি খাতের টেকসই ও নিরাপদ প্রবৃদ্ধির জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে এ খাতে কয়েকটি বড় স্ট্রাকচারাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে, বিশেষ করে বন্দর, ডিপো ও পরিবহনসংক্রান্ত ক্ষেত্রে। এলপিজি খাতে অবকাঠামোগত প্রধান চ্যালেঞ্জ বন্দর-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ। পানির গভীরতা কম হওয়া এবং চ্যানেলের প্রশস্ততার জন্য ভিএলজিসি বা মাদার ভেসেল আমাদের জেটিতে প্রবেশ করতে পারে না, ফলে স্মলার ফিডার ভেসেল ব্যবহার করতে হয়, যা ব্যয়বহুল। এর জন্য গভীর সমুদ্রবন্দর ব্যবহার সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। ডিপো ও স্টোরেজসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে বাল্ক স্টোরেজ কম। জাতীয় পর্যায়ে এলপিজি সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত বাল্ক টার্মিনাল ও স্টোরেজ ফ্যাসিলিটি নেই। ফলে চাহিদা বৃদ্ধির সময় সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয়। তাই চট্টগ্রাম, মোংলা বা পায়রায় ডিপ সি পোর্ট স্থাপন করা প্রয়োজন। এছাড়া রোড নেটওয়ার্ক দুর্বলতা, যেমন দুর্গম অঞ্চলে বড় ট্রেইলার বা বাল্ক ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা ও ব্রিজ নেই। ট্যাংকার ও পরিবহন ব্যবস্থায় আইওটি-ভিত্তিক ট্র্যাকিং সিস্টেম গড়ে তোলা যেতে পারে। এলপিজি খাতে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি ও সেবা মান নিশ্চিত করতে হলে অবকাঠামোগত এ চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করাই হবে মূল শর্ত।
বাজারে এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণে যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে সেগুলো কীভাবে সমাধান করা যায়? ভোক্তা স্বার্থ রক্ষায় কী ধরনের নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি?
এলপিজির বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণ একটি জটিল ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। কারণ এটি আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানিনির্ভরতা, ভোক্তা সক্ষমতা এবং সরবরাহ চেইনের নানা ঘাটতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাজারে এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা। এলপিজি পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হওয়ায় বিশ্ববাজারে এর ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন সরবরাহকারী দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সরবরাহ সংকট হলে দাম বেড়ে যায়। এছাড়া বাংলাদেশে বর্তমানে ডলার ঘাটতির কারণে এলসি খোলায় সমস্যা হয়। এতে সময়মতো আমদানি ব্যাহত হয় এবং দাম বেড়ে যায়। সরবরাহ ব্যবস্থার খরচ ও অনিয়ম প্রভাব ফেলে। পরিবহন, খালাস এবং কিছু ক্ষেত্রে অধিক মুনাফার লোভে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে মূল্য বাড়ে। কিছু খুচরা বিক্রেতা বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করেন। মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন ঘাটতি থাকায় প্রতি মাসে বিইআরসি এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তার যথাযথ বাস্তবায়ন হয় না। এক্ষেত্রে ভোক্তা পর্যায়ে বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নে মনিটরিং টাস্কফোর্স গঠন কাজে দেবে। প্রতিটি সিলিন্ডারে কিউআর কোড বা ভোক্তা মূল্য সেলস পয়েন্টে ভিজিবল করা ভালো একটি পদক্ষেপ হতে পারে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে অন্য কোনো দেশ থেকেও আমদানি করে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। প্রান্তিক সহায়তা হিসেবে গরিব পরিবারের জন্য সিলিন্ডার ভর্তুকি (উদাহরণ: এলপিজি কার্ড মডেল প্রতিষ্ঠা) দেয়া যেতে পারে।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এলপিজি খাতকে আরো টেকসই ও আধুনিক করতে লোয়াব কী ধরনের রোডম্যাপ বা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে?
এলপিজি খাতকে আরো টেকসই ও আধুনিক করতে লোয়াব আগামী পাঁচ বছরের জন্য একটি রোডম্যাপ গ্রহণ করেছে। এ রোডম্যাপের মূল লক্ষ্য হলো এলপিজি খাতের নিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধবতা ও ভোক্তা সেবার মান উন্নয়ন। লোয়াবের রোডম্যাপের মূল দিকনির্দেশনায় (২০২৫-২০৩০) নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ জোরদার গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ, সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ, লাইসেন্স সহায়তাকরণে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। লোয়াবের এ রোডম্যাপের মাধ্যমে এলপিজি খাতকে আরো টেকসই, নিরাপদ ও আধুনিক করে তোলা সম্ভব হবে। এ উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্পন্ন এলপিজি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাবে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাশেদ এইচ চৌধুরী










