অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের বাজেট প্রস্তাব করা হয়, একই সঙ্গে সরকার ২০২৭ সালের মধ্যে ১১০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয়ের উচ্চাভিলাষী নতুন রফতানি রাজস্ব প্রাক্কলন নির্ধারণ করে। তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) দেশের রফতানি আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে এ লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে রফতানি হ্রাস এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি হুমকির মুখে পড়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সম্প্রতি মার্কিন বাণিজ্যনীতি ও শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন বাংলাদেশের রফতানি গতিশীলতাকে প্রভাবিত করবে। একই সঙ্গে ইইউর কঠোর পরিবেশসংক্রান্ত বিধিনিষেধ বাংলাদেশের রফতানি প্রতিযোগিতার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ইইউতে রফতানি ৯.৮৫% (ইউরোস্ট্যাট, ইইউ) কমেছে, যেখানে একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি ১৪% (ওটেক্সা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) কমেছে।
আরএমজি শিল্প কৃত্তিম তুলাভিত্তিক পোশাক উৎপাদনে ক্রমেই পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম আরএমজি রফতানিকারক হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখার জন্য পোশাক প্রস্তুতকারকদের জন্য কৃত্তিম তুলাভিত্তিক পোশাক, বিশেষ করে ম্যান মেড ফাইবার (এমএমএফ) ব্যবহারে বৈচিত্র্য আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাপী টেকসই ফ্যাশনের ধারা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পরিবেশবান্ধব আইনের (যেমন গ্রিন ডিল ও ইকো-ডিজাইন ফর সাসটেইনেবল প্রডাক্টস রেগুলেশন) কারণে পোশাক ব্র্যান্ডগুলো এখন পরিবেশবান্ধব, পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামালকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ফলে তুলাভিত্তিক পোশাক থেকে সরে এসে ম্যান-মেড ফাইবারের দিকে ঝুঁকতে দেখা যাচ্ছে, যা পরিবেশগত ও উৎপাদন উভয় দিক থেকেই সুবিধাজনক। এমএমএফের পুনর্ব্যবহারযোগ্যতা, তুলার তুলনায় কম পানি ও শক্তি ব্যবহার এবং কম কার্বন নিঃসরণ এ তন্তুকে টেকসই ফ্যাশনের ভবিষ্যৎ করে তুলেছে। পিইটি বোতল থেকে তৈরি পুনর্ব্যবহৃত পলিয়েস্টার ফ্যাশন শিল্পে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় এমএমএফ। প্রায় ৯৯% পুনর্ব্যবহৃত পলিয়েস্টার পিইটি প্লাস্টিক বোতল থেকেই তৈরি হয়। এ উদ্যোগ শুধু কার্বন হ্রাস করে না, বরং একটি বৃত্তাকার অর্থনীতির পথও প্রশস্ত করে।
প্রাইস ওয়াটারহাউজ কুপার্সের (পিডব্লিউসি) গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাকের অর্ধেকই মানবসৃষ্ট ফাইবার দিয়ে তৈরি হয়েছিল। ২০৩০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ৬০%-এর বেশি বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানিতে বর্তমানে ৩০%-এরও কম মানবসৃষ্ট ফাইবার রয়েছে। যেখানে চীনে তা ৬২%, ভিয়েতনামে ৫৬%, তুরস্কে ৪৮% ও ইতালিতে ৪৪%।
তবে বাংলাদেশ এরই মধ্যে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এমএমএফ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বৃদ্ধির জন্য, বাংলাদেশ স্থানীয়ভাবে পিইটি চিপ ও পিএসএফ তৈরির জন্য চীনসহ অন্যান্য দেশের প্রকৌশল সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে সরকার স্থানীয় কার্পেট উৎপাদন শিল্পকে সহায়তা করার জন্য এমএমএফ কাঁচামাল পলিপ্রোপাইলিন সুতার ওপর আমদানি শুল্ক ১০% থেকে কমিয়ে ৫% করেছে, যা স্থানীয় স্পোর্টসওয়্যার, অন্তর্বাস, মেডিকেল গাউন উৎপাদনে টেক্সটাইল ও আরএমজি নির্মাতাদের সহায়তা করবে।
বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডগুলোও এ রূপান্তরে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। অ্যাডিডাস, এইচঅ্যান্ডএম, নাইকি এরই মধ্যে পুনর্ব্যবহৃত পলিয়েস্টার থেকে পোশাক তৈরিতে বিনিয়োগ করছে। ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের জার্সি পুনর্ব্যবহৃত পলিয়েস্টার থেকে তৈরি হওয়াই এর বাস্তব উদাহরণ।
২০২১ সালে মানবনির্মিত ও মিশ্র পোশাকের বিশ্বব্যাপী রফতানি ২৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তুলা রফতানিকে ছাড়িয়ে গেছে। গত দশকে তুলা পোশাকের আপেক্ষিক তাৎপর্য হ্রাস পেয়েছে, যেখানে ম্যান-মেড ফাইবার থেকে তৈরি পোশাক দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।
এমএমএফ অন্তর্ভুক্ত করে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে বৈচিত্র্য আনার পাশাপাশি এর সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবেশগত উদ্বেগগুলো স্বীকৃতি দেয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও পলিয়েস্টার ও ভিসকসের মতো এমএমএফ উপকরণগুলো তাদের স্থায়িত্বের কারণে কার্বন পদচিহ্ন হ্রাস করে এবং দ্রুত ফ্যাশনের সমস্যা সমাধান করে। তবে এগুলো মূলত অ-নবায়নযোগ্য সম্পদ থেকে তৈরি। এ উপকরণগুলো টেকসই হলেও জৈব-পচনশীলও নয়। একক ধরনের কাঁচামালের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে উৎপাদন মিশ্রণে উল ও সিল্কের মতো অন্যান্য তুলা-বহির্ভূত উপকরণগুলোকে একীভূত করা অপরিহার্য।
২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী বৈশ্বিক পলিয়েস্টার ফাইবারের ব্যবহার ১২৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩৪ সালের মধ্যে ২০৭ দশমিক ৪ বিলিয়নে পৌঁছাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। যার মানে হচ্ছে বৈশ্বিকভাবে প্রতি বছর ৬% হারে এর চাহিদা বাড়ছে। পলিয়েস্টার ফাইবার একটি পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য যার স্থায়িত্ব, কম দাম এবং স্থিতিস্থাপকতার জন্য প্রসিদ্ধ। এটা শুধু টেক্সটাইলে ব্যবহৃত হয় না বরং অটোমোবাইল এবং শিল্প খাতেও ব্যবহৃত হয়। শুধু তা-ই নয়, দিন দিন এর প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, চাহিদা বাড়ছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। প্রতি বছর নতুন নতুন উদ্ভাবনের ফলে পোশাক শিল্পে যেমন বৈচিত্র্য আসছে, তেমনি নতুন নতুন সেক্টরে এর ব্যবহার নিশ্চিতভাবেই ভবিষ্যতে আরো বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশে পলিয়েস্টার স্টেপল ফাইবার বা পিএসএফ শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে ইতোমধ্যে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশেষত মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে অবস্থিত মডার্ন সিনটেক্স লিমিটেড (এমএসএল) দেশের একমাত্র পিএসএফ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই খাতের ভবিষ্যতের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে বৈষম্যমূলক শুল্ক কাঠামোর কারণে দেশীয় শিল্পটি বর্তমানে টিকে থাকার জন্য লড়াই করছে।
পিএসএফ উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত মূল কাঁচামাল পিটিএ ও এমইজি আমদানিতে ১% হারে শুল্ক থাকলেও পিএসএফ উৎপাদনের সহযোগী উপকরণ—যেমন ক্যামিকেল, প্যাকিং সামগ্রী ইত্যাদির উপর ৩১%-৪৩% হারে শুল্ক আরোপিত, যা উৎপাদন খরচে টনপ্রতি প্রায় ৩%-৪% অতিরিক্ত ব্যয় যোগ করে। অপরদিকে, আমদানিকৃত পিএসএফ-এর ওপর শুল্ক হার শূন্য হওয়ায় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্যের তুলনায় আমদানিকৃত পণ্যের দাম কম পড়ে, ফলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এই বৈষম্যের ফলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি হচ্ছে না। স্থানীয় ক্রেতারা দেশীয় পণ্য না কিনে আমদানিকৃত পণ্যের প্রতি ঝুঁকছেন, যার ফলে দেশীয় শিল্প ক্ষতির মুখে পড়ছে।
গত ৯ মাসে দেশে ৭৫ হাজার ৮২৫ টন পিএসএফ আমদানি করা হয়েছে যার মূল্য প্রায় ৭৮.৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রতি কেজি ১২৩ টাকা)। একই সময়ে এমএসএল ৫৬ হাজার ৫৮০ টন পিএসএফ উৎপাদন করেছে যার মূল্য প্রায় ৫৯.৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রতি কেজি ১২৭ টাকা)। এ পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায় যে, দেশীয় উৎপাদন উচ্চমানের হলেও উচ্চ খরচের কারণে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টন পিএসএফ-এর চাহিদা রয়েছে, যার পুরোটাই আমদানি নির্ভর। অথচ মডার্ন সিনটেক্স লিমিটেডের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা ৮০ হাজার টন, যা স্থানীয়ভাবে চাহিদার অর্ধেকের বেশি পূরণ করতে পারে। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
এই পরিস্থিতিতে কর অবকাশপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও আয়কর আইন ২০২৩-এর ৯৭ ধারা অনুসারে ১% অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স কর্তনের কারণে প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া, পিএসএফ উৎপাদনের কাঁচামালের উপর বিদ্যমান শুল্ক প্রত্যাহার এবং আমদানিকৃত পিএসএফ-এর উপর যুক্তিযুক্ত হারে শুল্ক আরোপ করাই পারে একটি সুষম ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি করতে। একইসঙ্গে কাঁচামালের ক্ষেত্রে আমদানির বিশেষ সুবিধা বহাল রাখাও জরুরি।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতি টন পিএসএফ উৎপাদনে বিভিন্ন খাতে প্রায় ২১৮ মার্কিন ডলার মূল্য সংযোজন হয়, সে প্রেক্ষিতে বার্ষিক বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয় প্রায় ১৮.০৫ মিলিয়ন মাকিন ডলার যা টাকার অংকে ২২২ কোটি টাকা।
বিশ্বে ম্যান মেড ফাইবারের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে, তাতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য দেশীয় পিএসএফ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো ও টিকিয়ে রাখার বিষয়ে এখনই কার্যকর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পকে এখনই ম্যান-মেড ফাইবার ও অন্যান্য তুলা-বহির্ভূত উপকরণের দিকে কৌশলগতভাবে এগোতে হবে। নয়তো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি আরো বাড়বে।










