অ্যাসোসিয়েশন থেকে আপনারা ফার্নিচার রফতানি সহায়ক নীতিমালা প্রণয়নে জোর তাগিদ দিচ্ছেন। বাংলাদেশ থেকে আসবাবপত্র রফতানিতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা কতটুকু?
বাংলাদেশের ফার্নিচার রফতানি খাতের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা অনেক উজ্জ্বল। ২০২১-২২ অর্থবছরে রফতানি আয় ছিল ১১০ দশমিক ৩৬ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২০-২১ অর্থবছরের ৭৯ মিলিয়নের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। এ প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রতিকূল নিয়ামকগুলোকে সঙ্গে নিয়েই। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, স্পেন ও কানাডা বাংলাদেশের প্রধান রফতানি বাজার, যেখানে আরো সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। কারণ বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী ৬০০ বিলিয়ন ডলারের ফার্নিচার বাণিজ্যের মাত্র দশমিক শূন্য ১ শতাংশ অংশীদার। ২০৩০ নাগাদ এ বাণিজ্য ৯০০ বিলিয়ন ডলার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পোশাক শিল্পের বাংলাদেশের সফলতার সব নিয়ামকই ফার্নিচার সম্প্রসারণের জন্য প্রাসঙ্গিক হওয়া সত্ত্বেও কেন রফতানিতে এ সেক্টর উজ্জ্বল সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করবে না?
তবে চ্যালেঞ্জ আছে, যেমন কাঁচামালের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক (বিক্রয়মূল্যের প্রায় ৭০ শতাংশেরই অবদান কাঁচামালের, যার অধিকাংশই আমদানিনির্ভর), দেশীয় কাঠ প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনশক্তির অভাব এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা। তা সত্ত্বেও নীতিগত সংস্কার যেমন শুল্ক হ্রাস, দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খাতটি তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে দেশের জন্য। লক্ষ্যভিত্তিক কৌশলের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ও সাশ্রয়ী, মানসম্পন্ন ফার্নিচারের বৈশ্বিক চাহিদা কাজে লাগিয়ে রফতানি বহুগুণে বাড়াতে পারে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রায় সব দেশের ওপর রফতানির পাল্টা শুল্ক আরোপের প্রেক্ষাপটে আপনি কি মনে করেন এতে বাংলাদেশের আসবাবপত্র রফতানিতে কোনো সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে?
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ পাল্টা অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করেছে, যা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের ফার্নিচার রফতানিতে প্রবৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে দুভাবে। এক, চীনের ওপর অস্বাভাবিক পাল্টা শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশসহ সব প্রতিযোগী দেশের জন্য তাৎক্ষণিক সুযোগ করে দেবে। মার্কিন বাজারে চীনের ফার্নিচার রফতানি প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার থেকে শুল্ক বাধায় গত দুই বছরে অর্ধেকে উপনীত হয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকার কারণ দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। বাংলাদেশের জন্য এটা সহায়ক যদি পণ্যের কাঙ্ক্ষিত মান, প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেশন স্ট্যান্ডার্ডসহ প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে বিক্রির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। দুই. তৈরি পোশাক খাত (যা মোট রফতানির ৮০ শতাংশ) যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা সরকারকে রফতানি বৈচিত্র্য আনার জন্য ফার্নিচার সেক্টরকে অগ্রাধিকার দেবে এটাই যৌক্তিক আশা। যুক্তরাষ্ট্র বছরে ৮১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলারের ফার্নিচার আমদানি করে, যার মাত্র দশমিক শূন্য ১ শতাংশ আসে বাংলাদেশ থেকে। এখানে প্রবৃদ্ধির বড় সুযোগ রয়েছে। স্বল্প শ্রমব্যয় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে আরো শক্তিশালী করতে পারে, বিশেষ করে চীন (১২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক) ও ভিয়েতনাম (৪৬ শতাংশ পাল্টা অতিরিক্ত শুল্ক) এর বিকল্প যদি মার্কিন ক্রেতারা খুঁজতে থাকেন, বাংলাদেশের জন্য তা সহায়ক হতেই পারে।
যদি ধরে নেয়া হয় যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশসহ প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর শুল্ক হ্রাস করবে, আবার চীনের ক্ষেত্রে পাল্টা শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে বেশিই থাকবে, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের আসবাবপত্র রফতানির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে কি?
যুক্তরাষ্ট্রে চীনের পণ্যের শুল্ক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২৫ শতাংশ। যদি বাংলাদেশ ও তার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো যেমন ভিয়েতনাম ও ভারত ৫-১৫ শতাংশ হারে ছাড় পায় এবং চীনের জন্য তা ১২৫ শতাংশে বা কমে ৫০ অথবা ৬০ শতাংশ ধার্য হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের ফার্নিচার রফতানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক প্রায় ৮২ বিলিয়ন ডলারের ফার্নিচার বাজারে চীনের বিকল্প খোঁজার প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ সৃষ্টি করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর পূর্বশর্তগুলোর সমাধান নিশ্চিত করতেই হবে। প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণে সক্ষমতা অর্জনে সরকারকে আংশিক রফতানিমুখী যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহজ প্রক্রিয়ায় রফতানি পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল শুল্কমুক্ত আমদানির সুযোগ সৃষ্টির চলমান প্রক্রিয়াকে দ্রুততার সঙ্গে শেষ করে প্রয়োগ নিশ্চিত করতেই হবে। নতুবা সুযোগের ট্রেন মিস করা অবশ্যম্ভাবী। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সম্ভাব্য ফার্নিচার সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত করার কাজে সরকারকে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার জন্য এগিয়ে আসতে হবে দ্রুত। দক্ষ শ্রমশক্তি নির্মাণ ও কারিগরি জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে সরকারকে প্রাইভেট সেক্টরকে সম্পৃক্ত করে ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠায় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এখনই। রফতানিবান্ধব কাঁচামালের শুল্কনীতি বাস্তবায়ন মাত্রই অর্থনৈতিক ও কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে, এমন উৎপাদনকারীদের স্ব-উদ্যোগে মার্কিন বাজারে নিজেদের সম্ভাবনাকে খোঁজার প্রক্রিয়ায় ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।
সম্ভাবনা প্রবল, তবে তা অর্জননির্ভর করছে দ্রুত ও কৌশলী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর; অন্যথায় প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগিয়ে যাবে, আর সুযোগ হাতছাড়া হবে।
বাংলাদেশের সস্তা শ্রমের প্রাপ্যতাকে বিবেচনায় নিয়ে আসবাবপত্রের কোন ধরনের পণ্য রফতানির জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময়?
আপহোস্টারি ফ্যাব্রিক (কাপড়) আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলে (বর্তমান আমদানি শুল্ক ৮৯ শতাংশ), বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে সোফা রফতানির ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে পৌঁছতে পারে। প্রতি সোফা তৈরিতে ২০-৩০ ঘণ্টা শ্রম লাগে, যা বাংলাদেশের স্বল্প মজুরি ব্যবস্থার মাধ্যমে ভিয়েতনাম ও চীনের তুলনায় বড় সুবিধার আভাস দেয়। ফ্যাব্রিক ও ফোম, যা সোফার মোট খরচের প্রায় ৬০ শতাংশ—এর ওপর শুল্ক মওকুফ করলে উৎপাদন ব্যয় ১৫-২০ শতাংশ কমে আসবে, ফলে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি হবে, চীনের ১২৫ শতাংশ শুল্কের বা উচ্চ শুল্ক বিবেচনায়। যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ দশমিক ৩ বিলিয়নের সোফা বাজার (২০২৩) মূলত সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্যের দিকেই ঝুঁকে আছে। বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে অর্জিত দক্ষতা বিশেষ করে সেলাই ও কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে সোফা উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
এর পরই সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পণ্য হিসেবে চেয়ারকে বিবেচনা করা যেতে পারে। চেয়ার তৈরিতে শ্রমঘন অ্যাসেম্বলি ও ফিনিশিং প্রক্রিয়া যুক্ত থাকায় বাংলাদেশের কম মজুরি সুবিধা সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়। এতে তুলনামূলকভাবে কম আমদানীকৃত কাঠ লাগে, যা বাংলাদেশের কাঠের ফার্নিচার প্রস্তুতিতে অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলা যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ২০২৩ সালে ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মূল্যের সিটিং ফার্নিচার (চেয়ার) আমদানি করেছে, যেখানে কম দামি পণ্যের চাহিদা বেশি। চীনের উচ্চ শুল্কের তুলনায় কম শুল্কের সুবিধাকে কাজে লাগাতে পারে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের জন্য ফার্নিচার ডিজাইনে সক্ষমতা তৈরি করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের ফার্নিচার ডিজাইন সক্ষমতা উন্নয়ন রফতানি প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি মার্কিন বাজারে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগীদের থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়াতে সাহায্য করবে এবং ৬০০ বিলিয়ন মূল্যের বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের দশমিক শূন্য ১ শতাংশ অংশীদারত্ব বাড়াতে সহায়ক হবে ডিজাইন উৎকর্ষে প্রস্তুতকৃত আধুনিক ও উচ্চ মূল্যের পণ্যের বাজারকরণের মাধ্যমে।
বাংলাদেশের স্বল্প শ্রমব্যয় যদি দক্ষ ডিজাইন ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে ৭০ শতাংশ আমদানিনির্ভর কাঁচামালের উচ্চ ব্যয়ও ক্ষেত্র বিশেষে পুষিয়ে নেয়া সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের ৮১ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ফার্নিচার বাজার আধুনিক ডিজাইনের প্রতি আগ্রহী; ডিজাইন দক্ষতা ছাড়া শুল্ক সুবিধা থাকার পরেও বাংলাদেশ প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়বে।
বাংলাদেশে ফার্নিচার ডিজাইন সক্ষমতা উন্নয়নে করণীয় কী?
ফার্নিচার সেক্টরের ডিজাইন সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আবশ্যক। ডিজাইন সক্ষমতা তৈরির মতোই তার প্রায়োগিক সক্ষমতা তৈরিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণেই সিএডি ও সিএনসি মেশিন সফটওয়্যার, প্রোটোটাইপিংসহ পেশাগত প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে একটি বড় জনশক্তি তৈরি করতে হবে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গবেষণা ও প্রোটোটাইপ তৈরির জন্য একটি জাতীয় ডিজাইন কেন্দ্র বা হাব প্রতিষ্ঠা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এবং এ কেন্দ্র থেকেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো সম্ভব হবে।
ডিজাইনার তৈরিতে একাডেমিয়ার সংযোগ প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় ও রফতানিকারকদের মধ্যে অংশীদারত্ব তৈরি করে ডিজাইন ইনোভেশনকে উৎসাহ দেয়া সম্ভব। রফতানি বাজারের সক্রিয় ও কার্যকরী ডিজাইনারদের মাধ্যমে কর্মশালা ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের আয়োজন করা হবে এ কেন্দ্রের আরেকটি দায়িত্ব।










