বর্তমানে বাংলাদেশের ক্যাপসুল শেলের মার্কেটের সার্বিক চিত্র কেমন?
বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা বর্তমানে দেশের ৯৮ শতাংশ ওষুধের চাহিদা পূরণ করছে। ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার মান ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের ফলেই এ চাহিদা দিন দিন বাড়ছে যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
মার্কেট সম্পর্কে বলার আগে অবশ্যই জানিয়ে রাখতে চাই, ফার্মাসিউটিক্যালসে এক্সসিপেন্ট হলো এমন একটি উপাদান যা ওষুধের কার্যকরী উপাদানের (এপিআই) সঙ্গে ব্যবহার হয়। ক্যাপসুল শেল ফার্মাসিউটিক্যালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এক্সসিপিয়েন্ট যা অ্যাক্টিভ ইনগ্রিডেন্ট অব ড্রাগ বহন করে। এটি আমাদের বায়োলজিক্যাল সিস্টেমে প্রবেশ করে এবং ওষুধের কার্যকারিতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১০ বিলিয়ন ইউনিট ক্যাপসুল শেলের মার্কেট রয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
এত বড় একটি শিল্প খাত হওয়া সত্ত্বেও কী কারণে আমাদের দেশে এখনো এপিআই বা ফার্মাসিউটিক্যাল এক্সিসিপেন্ট উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে?
এপিআই (অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডেন্ট) শিল্প বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যালের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এখনো প্রায় ৯২ শতাংশ এপিআই ও ৮৫ শতাংশ এক্সসিপেন্ট আমদানি করতে হয়। সরকার এপিআই শিল্পে কিছু প্রণোদনা দিয়েছে এবং এপিআই পার্ক গড়ে উঠছে, কিন্তু এক্সসিপেন্ট খাতে এখনো তেমন কোনো সুবিধা নেই। অথচ এক্সসিপেন্ট ছাড়া ওষুধ উৎপাদন কল্পনাই করা যায় না। এ ঘাটতি পূরণে আমাদের নিজেদের উদ্যোগেই এগিয়ে আসতে হবে, যেমনটা আমরা এরেবা ক্যাপসুল লিমিটেডে করছি।
ক্যাপসুল শেল তৈরির এ প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।
এটি একটি অত্যাধুনিক হার্ড জেলেটিন ক্যাপসুল শেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো বিশ্বমানের প্রযুক্তিতে ক্যাপসুল শেল তৈরি করছে। ক্যাপসুল শেলের ব্যবহারের প্রায় ৮৫ শতাংশ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। যেমন ACG Capsules, Suheung Capsules, Capsugel, Erawat Capsules, Lonza ইত্যাদি। শুধু গ্লোবাল হাই কোয়ালিটি বিবেচনার কারণে বাংলাদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো এই ক্যাপসুল শেল আমদানি করে। বাংলাদেশ ফার্মাসিউটিক্যাল মার্কেটের ক্যাপসুল শেলের আমদানিনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে আমরা ভালো মানের ক্যাপসুল শেল তৈরি করছি। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে।
এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানে দেশীয় শিল্পের প্রসারে এরেবা ক্যাপসুল লিমিটেড বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমি মনে করি। এছাড়া এরেবা ক্যাপসুল আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় শিল্পের প্রসার বিস্তৃত করবে। এ লক্ষ্যেই এরেবা ক্যাপসুল বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বর্তমানে আমাদের মাসিক উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫ কোটি ক্যাপসুল, যা বছরে ৩৭০ কোটি পর্যন্ত পৌঁছবে। আমাদের কারখানায় বর্তমানে ছয়টি উৎপাদন লাইন রয়েছে এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে এ সংখ্যা ২০-এ উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৬০ জন দক্ষ কর্মী আমাদের কারখানায় কাজ করছেন, যা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে।
এরেবা ক্যাপসুলের মান নিয়ে কী বলবেন?
আমরা শুরু থেকেই গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলছি। এরেবা ক্যাপসুল তৈরিতে কাঁচামাল হিসেবে সিইপি গ্রেড জেলেটিন ব্যবহার করা হয় যা সরাসরি ইউরোপ থেকে আমদানীকৃত এবং আমাদের নিজস্ব ফ্যাসিলিটিতে সর্বোচ্চ গুণগত মান বজায় রেখে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি করা হয়। আমাদের ক্যাপসুল শেল US-FDA গ্রেড অ্যাক্রেডিটেড যা ক্যাপসুল শেলের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড এবং কোয়ালিটি নিশ্চিত করে।
এছাড়া ক্যাপসুলের গুণগত মান বজায় রাখতে এবং যেকোনো ধরনের কনটামিনেশন ফ্রি রাখতে এরেবা ক্যাপসুল আন্তর্জাতিক মানের জিএমপি কমপ্লিয়েন্ট ফ্যাসিলিটিতে Grade-D Clean Room/ISO 8 Standard এবং ২৪ ঘণ্টাব্যাপী ইউটিলিটি ব্যবহার করে অত্যাধুনিক এইচভিএসি সিস্টেম অপারেট করে যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং যা অধিকাংশ উৎপাদনকারী করে থাকে না।
স্থানীয় পর্যায়ে দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে ইরেবা ক্যাপসুলস কী সুবিধা দিয়ে থাকবে?
এরেবা ক্যাপসুলের ক্যাপসুল শেল গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড কোয়ালিটি হওয়ার কারণে এর পারফরম্যান্স ভালো, অর্থাৎ রিজেকশন রেট খুবই কম, অপ্টিমাল ডিটি ছাড়াও ওয়েট ভেরিয়েশন ও মাইক্রোবিয়াল লিমিট খুবই কম, যা পণ্যের স্ট্যাবিলিটি এবং শেলফ লাইফ অক্ষুণ্ন রাখে। ফলে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোর প্রসেস লস এবং প্রডাকশন কস্ট উভয়ই কমে যায়, যা অর্থনৈতিকভাবে কোম্পানিগুলোর জন্য সাশ্রয়ী।
এরেবা ক্যাপসুলসের একটি বড় সুবিধা হলো, কোনো কোম্পানিরই লিড টাইম ফেস করতে হচ্ছে না। কারণ বিদেশ থেকে আনতে গেলে অন্তত ছয় মাসের একটি লিড টাইম চিন্তা করে আনতে হয়। দেশের ভেতর থেকে কেনার ক্ষেত্রে লিড টাইম ছয় মাসের জায়গায় এক মাস রাখলেই যথেষ্ট, যা অর্থনৈতিকভাবেও কোম্পানিগুলোর জন্য সাশ্রয়ী।
এছাড়া অধিকাংশ ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিকে একসঙ্গে অনেক বেশি পরিমাণে ক্যাপসুল শেল আমদানি করতে হয়। ফলে ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট ও স্টোরেজ কন্ডিশন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অনেক বেশি পরিমাণে জ্বালানি খরচ করতে হয়। এর ফলে জ্বালানি মূল্যও বৃদ্ধি পায়। যেখানে এরেবা ক্যাপসুলসের ক্যাপসুল শেলের ব্যবহার করলে কোনো ধরনের ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্টের প্রয়োজন হবে না। এর মাধ্যমে ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। সর্বোপরি স্থানীয় বাজারে আন্তর্জাতিক মুদ্রার চাহিদা কম হবে, ফলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে।
সরকারের কাছে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
সরকার যদি সত্যিই চায় দেশের ফার্মা খাত আরো শক্তিশালী হোক এবং আমদানিনির্ভরতা কমে আসুক, তাহলে স্থানীয় এক্সসিপেন্ট শিল্পকে সহায়তা করতে হবে। বিশেষ করে আমদানীকৃত ক্যাপসুল শেলের ওপর শুল্কবৃদ্ধি এবং কাঁচামাল (যেমন জেলেটিন) আমদানির ওপর ভ্যাট কমিয়ে আনলে স্থানীয় শিল্পের জন্য তা হবে বড় প্রণোদনা। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এমনটি করা হয়। এরই মধ্যে যেহেতু তিনটি ক্যাপসুল শেল প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মার্কেটে চলে এসেছে, তাই সরকারের উচিত এ খাতকে আরো সাপোর্ট করা। আমদানি করা ক্যাপসুল শেলের ট্যাক্স বাড়িয়ে দেয়া হলে দেশের কোম্পানিগুলোর ওপর গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়বে। আমদানি করা ক্যাপসুল শেলের তুলনায় আমাদের ক্যাপসুল শেলে দাম কম পড়বে। উপরন্তু গুণগত মানও ঠিক থাকবে।
এরেবা ক্যাপসুলস লিমিটেডের ভবিষ্যতের লক্ষ্য কী?
আমরা শুধু দেশীয় চাহিদা পূরণের লক্ষ্য নিয়ে শুরু করলেও আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে রফতানি।










