২০১৯ সাল থেকে এলপি গ্যাস সরবরাহ করে আসছে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি। প্রায় অর্ধদশকের এ জার্নি নিয়ে জানতে চাই।

মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি জ্বালানি খাতের আস্থার প্রতীক হয়ে যাত্রা শুরু করে ২০১৯ সালে। আমাদের কার্যক্রম শুধু এলপিজি সিলিন্ডারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; গৃহস্থালিতে, কলকারখানায়, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, অটোগ্যাসসহ যতগুলো সেক্টর রয়েছে যেখানে এলপিজি ব্যবহার করা হয়। সব সেক্টরেই মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি তাদের কার্যক্রম প্রসারিত করেছে। ২০১৯ সালে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি একটি প্লান্টে ছয় হাজার টন ধারণক্ষমতা নিয়ে যাত্রা শুরু করে মেঘনা ঘাটে। বর্তমানে আমাদের স্টোরেজ ক্যাপাসিটি আট হাজার টনের বেশি। একই সঙ্গে একটি থেকে সারা দেশে চারটি ফিলিং প্লান্ট এবং আটটি রিজিওনাল ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারের (আরডিসি) মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে নিরবচ্ছিন্নভাবে পণ্য সরবরাহ করে চলেছে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি। আমাদের ব্যবসা প্রসারের যে পরিকল্পনা রয়েছে তাতে দুই বছরের মধ্যে স্টোরেজ ক্যাপাসিটি দাঁড়াবে ২০ হাজার টন। বর্তমানে বাজারে আমাদের সিলিন্ডার সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি। এলপিজিতে বর্তমানে মার্কেট শেয়ারের ১৭ শতাংশের মতো আমাদের দখলে। গত পাঁচ বছরে এলপিজিতে মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির যে অগ্রগতি সেটাকে ঈর্ষণীয় বলতেই হবে। কেননা এত অল্প সময়ে বাজারের বৃহৎ অংশ দখল করার মতো নজির কোনো কোম্পানি করতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই।

বাজারে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু একটি অভিযোগ থেকেই যায়, নির্ধারিত দামে এলপিজি পাওয়া যায় না। তবে বড় কোম্পানিগুলো সেটি কিছুটা মেনে চলে। আপনারা এটি কতটা মেনে চলেন?

দেখুন, বাংলাদেশে এলপি গ্যাসের দাম নির্ধারণ হয় বিইআরসির মাধ্যমে। প্রতি মাসের শুরুতে বিইআরসি দাম নির্ধারণ করে, এটি সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য। অর্থাৎ একজন ভোক্তার ওই দামের বেশি দিয়ে প্রোডাক্ট কেনার কথা না। বাংলাদেশে বর্তমানে ২৩টি এলপিজি কোম্পানি চলমান আছে, যারা মূলত সিলিন্ডার বাজারজাত করছে। প্রতিটি কোম্পানিই সর্বোচ্চ চেষ্টা করে বিইআরসির নির্ধারণ করে দেয়া দামে প্রোডাক্ট সরবরাহ করার জন্য। সিলিন্ডার ক্রয়ের কয়েকটি ধাপ আছে। আমরা হলাম এলপিজির আমদানিকারক, বোতলজাতকারক ও বাজারজাতকারী। আমরা প্রথমে যার কাছে বিক্রি করি তারা হলো ডিস্ট্রিবিউটর। তারা মূলত তাদের রিটেইলারের কাছে পণ্য সরবরাহ করে, আর রিটেইলারের কাছ থেকে এসব পণ্য কিনে একজন গ্রাহক। তার মানে কোম্পানি পণ্য উৎপাদনের পর ভোক্তার হাতে যাওয়ার মাঝখানে দুজন মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে। বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য বাস্তবায়নে কোম্পানিগুলো সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। বর্তমানে মূল্য নির্ধারণের ফর্মুলায় কিছু বৈসাদৃশ্য রয়েছে। বিইআরসির মূল্য নির্ধারণের ফর্মুলায় একজন ডিস্ট্রিবিউটরকে সর্বোচ্চ মুনাফা দেয়া আছে ৫০ টাকা ও রিটেইলারকে সর্বোচ্চ মুনাফা দেয়া আছে ৪৫ টাকা। রিটেইলার হলেন তারা, ক্রেতা যাদের ফোন করলে বা তাদের দোকানে গিয়ে টাকা দিলে তারা বাসায় সিলিন্ডার পৌঁছে দেয়। এখন বলে রাখা ভালো, একজন রিটেইলার মাসে সর্বোচ্চ ৩০০ কিংবা কিছু বেশি সিলিন্ডার বিক্রি করে। তাহলে বিইআরসির মূল্য অনুযায়ী তার মাসে আয় হয় ১৫ হাজারের মতো। এ টাকা দিয়ে তার ঘর বা দোকান ভাড়া এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্বাহ কীভাবে সম্ভব? এরপর রয়েছে তার মুনাফা। ফলে তারা অতিরিক্ত মুনাফার জন্য ‍ভোক্তার কাছে বেশি দামে বিক্রি করে থাকে।

অন্যদিকে ডিস্ট্রিবিউটরের জন্য মুনাফা নির্ধারণ করা আছে ৫০ টাকা। ডিস্ট্রিবিউটরকে ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স, বিস্ফোরক লাইসেন্স, বিইআরসির লাইসেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স নিতে হয়। এরপর সেগুলো পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রয়োজন গাড়ি, কর্মী, সংরক্ষণের জন্য ওয়্যারহাউজ, আর সবশেষে আছে তার জীবিকা নির্বাহ। এতগুলো খরচ বহন করে সিলিন্ডারপ্রতি মাত্র ৫০ টাকা মুনাফায় তাদের টিকে থাকা অসম্ভব ব্যাপার। সেজন্য স্বভাবতই নির্ধারিত ৫০ টাকার চেয়ে তাকে বেশি প্রফিট করতে হয়। এসব কারণে কোম্পানির কাছ থেকে ডিস্ট্রিবিউটর, রিটেইলার ও ক্রেতার দামের মধ্যে একটি ফারাক তৈরি হয়। ফলে বিইআরসির নির্ধারিত দামে কোম্পানি পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও ভোক্তাদের কাছে সে দামে পৌঁছাচ্ছে না। সেজন্য বিইআরসির মূল্য নির্ধারণের ফর্মুলায় পরিবর্তন আনতে হবে।

গ্রাহকের অভিযোগ, বাজারে এলপিজির দাম অনেক বেশি। এ দাম কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কী করার আছে?

অনেকেই জানেন না বাংলাদেশ এলপিজিতে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। প্রয়োজনের ৯৮ শতাংশ এলপিজিই আমদানি করা হয়, আর মাত্র ২ শতাংশ দেশীয় খাত থেকে আসে। মূল্য নির্ধারণ করা হয় আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী। আমরা যারা আমদানি করে বাজারজাত করি, তাদের আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গেই সামঞ্জস্য রেখে বাজারজাত করতে হয়। বাংলাদেশে যে পণ্যটি আসে সেটি সৌদি আরামকো কন্ট্রাক্ট প্রাইস বা সিপি অনুযায়ী নির্ধারণ হয়। প্রতি মাসে একবার করে সিপি নির্ধারণ করা হয় এবং প্রতি মাসের শেষ দিনে এটি প্রকাশ করা হয়। এর ওপর ভিত্তি করে আমরা পরবর্তী মাসের মূল্য বাস্তবায়ন করি। এলপিজির মূল্য যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে মিল রেখে করা হয়, কাজেই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে এখানেও বাড়বে। কোম্পানিগুলো মাসের শেষ দিনের দামকে টার্গেট করে পণ্য কেনে এবং সে দামে পরবর্তী মাসে বিক্রি করে। বিইআরসিও সেই সিপি অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করে।

দুই-তিন বছর থেকে এলপিজি সংকটের ক্ষেত্রে ডলারের প্রসঙ্গটি আসে। বৃহৎ কোম্পানি হিসেবে আপনারা এ বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

আমাদের যে ব্যবসায়িক কানেক্টিভিটি ও ডলার সোর্সিং আছে, সেগুলোর কারণে আমরা শুরু থেকেই ডলার সংকট অনুভব করিনি এবং মার্কেটে সংকট থাকার পরও নিরবচ্ছিন্ন পণ্য আমদানি করেছি, যেখানে অনেক এলপিজি কোম্পানিই আমদানির ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, তবে আমাদের সাপ্লাই চেইনে কখনই সমস্যা হয়নি। এ কারণেই ফ্রেশ এলপিজি ব্যবসায়ীদের কাছে এক আস্থার নাম।

বর্তমানে এলপিজি আমদানি ও বাজারজাতে যেসব ভ্যাট ও ট্যাক্স দিচ্ছে এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

যেকোনো কোম্পানিকে আমদানির ক্ষেত্রে দুটি ট্যাক্স দিতে হয়। একটি অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স, যেটি দিতে হয় ২ শতাংশ। আর অ্যাডভান্স ট্যাক্স দিতে হয় আরো ৩ শতাংশ। এরপর এলপিজি বাজারজাতের সময় আরো সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। ফলে ১২ কেজি সিলিন্ডার গ্রাহক পর্যায়ে তুলে দেয়ার জন্য বিইআরসির মূল্যে প্রায় ১০০ টাকা ভ্যাটের জন্য ধরা হয়। অর্থাৎ বিইআরসি যে সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করে দেয়, সেখানে ভ্যাট বাবদ প্রায় ১০০ টাকা ধরা আছে। দিন শেষে একজন গ্রাহককে প্রতি ১২ কেজি এলপিজির জন্য প্রায় ১০০ টাকা ভ্যাট গুনতে হচ্ছে।

দেশের মাত্র ৪০ লাখ গ্রাহক প্রাকৃতিক গ্যাস পাচ্ছে। তাদের গ্যাস দিতে পারছি না। তার ওপর যারা এলপিজি দিয়ে গ্যাসের চাহিদা মেটাচ্ছে তাদের ঘাড়ে ১০০ টাকার ভ্যাট চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কাজেই সরকার এলপিজিকে ভ্যাট মুক্ত করলে ভোক্তাদের কাছে এর দাম ১০০ টাকা পর্যন্ত কমানো সম্ভব। সরকার এলপিজি নিয়ে বেশ কনসার্ন। আশা করছি, এ বিষয়ে তারা কিছু ভাবছে। আমাদের প্রস্তাব এ ভ্যাট প্রত্যাহার করে নিলে ১০০ টাকা কমে গ্রাহক এলপিজি পাবে। আরেকটি প্রস্তাব আছে আমাদের, তা হলো এলপিজির ক্ষেত্রে তিনটি ভ্যাট-ট্যাক্স রয়েছে। ইমপোর্ট স্টেজে অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স ও অ্যাডভান্স ট্যাক্স, এরপর বোতলজাতে আবার ভ্যাট। আমাদের প্রস্তাব হলো, এ ভ্যাট-ট্যাক্স শুধু একটি করা হোক। সেটি ইমপোর্ট স্টেজে। সেক্ষেত্রে ভ্যাট-ট্যাক্স আদায় থেকে শুরু করে যে সমস্যাগুলো হয় সেগুলো দূরীভূত করা সম্ভব। সরকার যদি সবার কাছ থেকে ইমপোর্ট স্টেজ থেকেই ভ্যাট-ট্যাক্সটা নিয়ে নেয় তাহলে একটা ভালো কাজ হবে। সরকারের জন্যও রেভিনিউ সংগ্রহে একটি বড় উদ্যোগ হবে। এমনটি করলে এলপিজি খাতেও একটি শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। এখন খাতটি অনেকটাই বিশৃঙ্খল।