আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের টাইলসের হিস্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন?
সিরামিক খাতে আন্তর্জাতিক বাজার দেশের টাইলসের জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমাদের টাইলস উৎপাদনের কাঁচামাল ৭০-৮০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। পাশাপাশি মেশিনারিজ আমদানি করতে হয়। টেকনিক্যাল হ্যান্ডস বাইরে থেকে নিয়ে আসতে হয়। এতে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। ফলে চীন ও ভারতের সঙ্গে এ জায়গায় আমরা পিছিয়ে যাই। তবে আশার কথা হচ্ছে, বিকল্প সোর্সিং হিসেবে ইউরোপের ক্রেতারা আমাদের কাছে আসছেন। তবে আমাদের সরকারের দিক থেকে কিছু নীতিমালার পরিবর্তন করা প্রয়োজন। অন্যথায় আমরা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারব না। এখন যেটি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আসছে সেটিও একেবারেই সামান্য। কিন্তু সম্ভাবনা অনেক বেশি। ফলে এ খাত নিয়ে ভালোভাবে কাজ করা প্রয়োজন। সরকার থেকে যদি প্রয়োজনীয় সাড়া পাওয়া যায়, তাহলে হয়তো এ খাতকে আন্তর্জাতিক বাজারে ভালোভাবে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
এবারের বাজেটে সরকারের কাছে এ খাতের জন্য আপনাদের প্রত্যাশা কী?
টাইলস খাতে এক বছর আগেও ১০ শতাংশ রফতানি প্রণোদনা ছিল। এটি দুই ধাপে কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। আমরা ১০ শতাংশ পুনর্বহাল চাই। এটিকে কাস্টমাইজ করে ডাইনামিক করতে পারলে ভালো হয়। কারণ প্রত্যেকটা পণ্যেরই নিজস্ব কিছু নীতি থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো একটি পণ্যের দাম নিয়ে যদি বেশি প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়তে না হয়, তাহলে তার বিক্রি সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে যাওয়া যায়। এখন কোনো পণ্য যদি দাম নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে হিমশিম খায়, তাহলে সেখানে প্রণোদনা দিয়ে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুললে দেশের মোট রফতানির জন্য ভালো হয়।
টাইলস খাতের বিশেষজ্ঞদের বিদেশ থেকে নিয়ে আসতে হয়। দেশেই বিশেষজ্ঞ গড়ে তোলার কোনো উদ্যোগ বেসরকারি খাত থেকে নেয়া হচ্ছে কিনা?
আমরা এ জায়গায় কাজ শুরু করেছি এরই মধ্যে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যারা সিরামিক নিয়ে পড়াশোনা করছেন, তাদের নিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছি। সেমিনার করছি। যাতে দেশেই আমরা এ খাতের বিশেষজ্ঞ ও টেকনিক্যাল হ্যান্ডস পেতে পারি। তাছাড়া ১৯৯৮ সালের দিকে দেশে সিরামিক পণ্যের উৎপাদন শুরু হয়। এ কয়েক বছরে কাজ করতে করতে অনেক টেকনিক্যাল হ্যান্ডস তৈরি হয়েছে। তারা এখন বিভিন্ন প্লান্ট হ্যান্ডস হিসেবে কাজ করছেন। আগে পুরোপুরি বিদেশীদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন প্রায় ৭০ শতাংশ টেকনিক্যালস দেশী। আশা করি, আগামীতে শতভাগ দেশী এক্সপার্ট দিয়ে এ খাত চালানো সম্ভব হবে।
টাইলস খাতে জ্বালানি সংকটের সমাধান কী?
গ্যাসের সংকট এখনো পুরোপুরি যায়নি। অনেক কোম্পানি উৎপাদন নিয়ে ভুগছে। এ খাত আসলে পুরোপুরি জ্বালানিনির্ভর। ফলে গ্যাসকে এ খাতের কাঁচামাল হিসেবেই গণ্য করা হয়। সরকার বিগত সময়ে গ্যাসের দাম ৩০০ শতাংশের মতো বাড়িয়েছে। তার পরও আমরা বলছি যে দাম বাড়লেও গ্যাসের সরবরাহ যেন ঠিক থাকে। কারণ একটা কারখানার কিন (চুল্লি) একবার গ্যাসের চাপ কম থাকা বা সংকটের কারণে বন্ধ করলে অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। পণ্যের গুণগত মান কমে যায় এবং পুনরায় কিন চালু করতে গেলে ৭২ ঘণ্টার মতো সময় লাগে।
টাইলসের অভ্যন্তরীণ বাজার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ কেমন, আন্তর্জাতিক বাজারে সুযোগ কতটা তৈরি করতে পেরেছে বাংলাদেশ?
দেশে টাইলসের বাজার সাইজ সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। তার মধ্যে ৮৫ শতাংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হচ্ছে, বাকি ১৫ শতাংশ আমদানি হয়। পণ্যের যে বৈচিত্র্য তৈরি হয়েছে এতে আমরা আশা করছি, আমাদের উৎপাদন চলমান রাখতে পারলে দেশের বাজারে স্থানীয় টাইলসের দখল আরো বাড়বে। একটা সময় ছিল আমরা কমোডিটি প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করতাম। এখন এ দৃশ্য নেই। এ খাতের উৎপাদন থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে এখন আমরা বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তিগুলো গ্রহণ করেছি। আমরা এখন মিটার বাই মিটার টাইলস করছি, ৬০/১২০ করছি, ওয়ালে আমরা বড় সাইজে গিয়েছি ৪০/৮০, ৩০/৯০ সাইজ তৈরি করছি। যেটি আন্তর্জাতিক বাজারেও বেশ ভালোভাবে পাঠাতে পারছি। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যদি তুলনা করি, তাহলে বলব প্রতিযোগী অনেক দেশ থেকে কিছু ক্ষেত্রে আমরা অনেক এগিয়ে আছি। আমাদের মোট সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিতে টেবিলওয়্যার, স্যানিটারিওয়্যার ও টাইলস মিলিয়ে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। শুধু টাইলসেই রয়েছে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার। আবার নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে আরো ৮-১০টি কোম্পানি। বর্তমানে আমাদের সরাসরি কর্মসংস্থান প্রায় ৫২ হাজার। পরোক্ষভাবে যারা কাজ করছেন তাদের নিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ কাজ করছে।
ভোক্তাদের মধ্যে দেশী ব্র্যান্ডের টাইলস নিয়ে আস্থার কোনো সংকট দেখেন কিনা।
আসলে প্রতিটি ব্র্যান্ডই নতুন নতুন ইনোভেশনের দিকে যাচ্ছে। গুণগত মানের উন্নতি করার চেষ্টা করছে। আমি এটা বিশ্বাস করি, খুবই সাশ্রয়ী মূল্যে ক্রেতারা ভালো মানের টাইস পাচ্ছেন। গত ১৫ বছরে টাইলসের কোনো মূল্যবৃদ্ধি হয়নি। এ সময়ে সব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। এর বড় কারণ হচ্ছে দেশে উৎপাদন অনেক বেশি বেড়েছে। চাহিদার চেয়ে জোগান অনেক বেশি। আমাদের উৎপাদন হচ্ছে প্রতি মাসে ২২-২৩ কোটি বর্গফুট। কিন্তু চাহিদা আছে ১৫-১৬ কোটি বর্গফুট। কিন্তু এ খাতে বিনিয়োগ যে ভুল ছিল বিষয়টা তাও না। আমরা ভেবেছিলাম করোনা-পরবর্তী সময়ে ভালোভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য ফিরবে। কিন্তু সেটি হয়নি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে। কারণ কাঁচামালের দাম বাড়াসহ অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। ফলে অন্য অনেক ইন্ডাস্ট্রির মতো টাইলস ইন্ডাস্ট্রিও কিছুটা পিছিয়ে পড়ে।
আকিজবশির গ্রুপ টাইলস খাতে আগামীতে নিজেদের কোন জায়গায় দেখতে চায়?
আমরা প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছি টাইলস খাতে। এ বিনিয়োগ চলমান রয়েছে। চাইছি ভোক্তারা নতুন নতুন ইনোভেশন তাদের হাতের নাগালে পেয়ে যাক। আন্তর্জাতিক বাজারে যে ধরনের ইনোভেশন করে, স্থানীয় বাজারে সেটা নিয়ে আসার চেষ্টা আমরা অব্যাহত রেখেছি। আমরা কিছুদিনের মধ্যেই যেসব ইনোভেশন নিয়ে আসব, আমাদের প্রতিযোগীরা সেটি আরো এক বছর পরে হয়তো চিন্তা করবে। আমাদের মাইন্ডসেট ইতিবাচক। ফলে আমরা আমাদের অংশীজন, ক্রেতা, শ্রমিকসহ সবাইকে নিয়ে কাজ করতে চাই। আমাদের টাইলস খাতে দুই ধরনের পণ্য উৎপাদন করি। একটি হচ্ছে ফ্লোর টাইলস, আরেকটি ওয়াল টাইলস। ফ্লোর টাইলসে আবার বিভিন্ন ধরন আছে। আমরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল টাইলস নতুন করে যুক্ত করেছি। ওয়াল টাইলসে বিশেষ করে গ্লেজ টাইলসের অনেক ধরনের সাইজ রয়েছে। ৪০/৮০ টাইলস বাংলাদেশে আর কেউ তৈরি করে না, আমরাই করছি। ভোক্তাদের ডিমান্ড মাথায় রেখে আমরা কাজ করছি। কারণ গ্রাহকের চাহিদা ছয় মাস পর পরই পরিবর্তন হয়।










