দেশের স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের আকার কত? এ খাতে বিনিয়োগ কতটা লাভজনক বলে মনে করেন?
স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বলতে বেসরকারি বিনিয়োগকেই বোঝায়। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ১২ মিলিয়ন ডলারের বেশি হবে। এ খাতে ছয় হাজারের বেশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান আছে। লাভের দিক থেকে যদি চিন্তা করা হয়, যেকোনো ব্যবসায় বিনিয়োগই লাভজনক। স্বাস্থ্য খাত অবশ্যই একটি লাভজনক খাত। তবে আমি লাভটাকে দেখব দুভাবে। একটি হলো উদ্যোক্তাদের দিক থেকে, আরেকটি রাষ্ট্রের অর্থনীতির দিক থেকে। এখানে বিভিন্ন পেশার প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, বিশাল অবকাঠামোর দরকার হয়, অনেক যন্ত্রপাতির দরকার হয়। আমাদের দেশ ১৮ কোটি জনসংখ্যার দেশ, এখানে স্বাস্থ্য খাতে সেবাগ্রহণকারীর সংখ্যাও অনেক। স্বাস্থ্য খাতের ওপর ওষুধ কোম্পানিগুলোও নির্ভরশীল। এ খাতে তাদেরও একটি বড় বিনিয়োগ আছে। সেদিক থেকে অবশ্যই এটি একটি লাভজনক বিনিয়োগ।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে প্রথম বাজেট এবার। দেশের স্বাস্থ্য খাতে এ বাজেটে আপনারা কী ধরনের ঘোষণা প্রত্যাশা করছেন?
সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। কারণ স্বাস্থ্য খাত একটি মানবিক সেবা খাত। অন্যান্য খাত যে সুবিধাগুলো পায়, স্বাস্থ্য খাত সেটি পায় না। অন্যান্য ব্যবসা যে হারে কর দিয়ে থাকে, আমরাও সে হারে কর দিয়ে থাকি। অন্যান্য সেক্টরে যেমন ট্যাক্স হলিডে আছে, হাসপাতাল সেক্টরে তেমন ট্যাক্স হলিডে নেই। তার ওপর এখানে যে ধরনের ইকুইপমেন্ট, ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার হয়, সেগুলো মানুষের জীবনের বাঁচাতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এসব যন্ত্রপাতির ডিউটিও উচ্চমাত্রার। যেকোনো চিকিৎসার জন্য ল্যাব ও প্যাথলজিক্যাল টেস্ট অপরিহার্য। এ টেস্টের জন্য যে রি-এজেন্ট আনা হয় তা ১০০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। এক্ষেত্রে আমাদের ডিউটি দিতে হয় ৩৪ শতাংশের বেশি। এটি একটি জীবন রক্ষাকারী উপাদান, কোনো বিলাসদ্রব্য নয়। এক্ষেত্রে যদি একটা সাশ্রয়ী ও যৌক্তিক পর্যায়ে ডিউটি নির্ধারণ করা যায় তাহলে রোগীরা অনেক সাশ্রয়ী মূল্যে সেবাটা নিতে পারে। আমরা সরকারের কাছে আশা করি, যেন এ বাজেটে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয়।
চিকিৎসাসেবার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হচ্ছে দক্ষ জনশক্তির অভাব। সংকট নিরসনে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে? এতে বাজেটের কী অবদান থাকতে পারে?
এ খাতে দক্ষ জনশক্তির অভাব আমাদের দেশে আছে। আমাদের দেশে অনেক মেডিকেল কলেজ আছে। সেখান থেকে ভালো চিকিৎসক বের হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসাসেবায় আরো অন্যান্য যেসব কর্মী প্রয়োজন, যেমন নার্স, ফিজিওথেরাপিস্ট, ডায়েটেশিয়ান, টেকনোলজিস্ট, টেকনিশিয়ান, ল্যাব সায়েন্টিস্ট, মাইক্রোবায়োলজিস্ট , বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এগুলোও এখানে প্রয়োজনীয়। এ সেবাগুলো দেয়ার জন্য উন্নত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এজন্য আমাদের দেশে তেমন কোনো ইনস্টিটিউট বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। এক্ষেত্রে সরকার বাজেটে একটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে, যেটা বিশেষ ও জরুরি প্রয়োজন।
দেশের বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে যায়, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে। বর্তমানে ভারতের ভিসা জটিলতার কারণে রোগীরা অন্যান্য দেশে যাচ্ছেন। এটি কমিয়ে আনতে দেশের স্বাস্থ্যসেবায় কোনো রোডম্যাপ করা যায় কিনা?
রোডম্যাপ তো অবশ্যই করা যায়। রোডম্যাপ হলো উন্নত দেশগুলো যে পদ্ধতিতে, যে প্রযুক্তিতে এবং যে মানে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে, সে পদ্ধতি, প্রযুক্তি বা মান যদি আমরা দেশে চালু করতে পারি তাহলে এটা সম্ভব। আমাদের দেশের স্বাস্থ্যসেবা এখন অনেক উন্নত। বিশেষায়িত চিকিৎসা যেমন হৃদরোগ, কিডনি, নিউরো, ক্যান্সার ইত্যাদির অনেক ভালো চিকিৎসা এখন আমাদের দেশে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে মানুষের বিদেশে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতে পারে। কারণ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের তো শেষ নেই। যে প্রযুক্তি আমাদের নেই সেগুলোর জন্য হয়তো বিদেশে যেতে হতে পারে। বাকিগুলোর জন্য প্রয়োজন নেই। আমাদের দেশেও এখন অনেক ভালো চিকিৎসা হয়। শুধু আমাদের পদ্ধতি ও মানের উন্নয়ন দরকার।
চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় (আউট অব পকেট পেমেন্ট) ৭০ শতাংশের বেশি। ব্যক্তির নিজস্ব এ ব্যয় কমাতে বাজেট কী ভূমিকা রাখতে পারে?
বাজেট এক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। চিকিৎসা এমন একটি ব্যয়, যার জন্য সবসময় মানুষের প্রস্তুতি থাকে না। আমি যদি বিনোদনের জন্য কোথাও যাই তাহলে তার একটি প্রস্তুতি থাকে, কিন্তু জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে মানুষের হাতে অর্থ থাকে না। ব্যয়টা বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্ষেত্রে। অনেক দেশেই স্বাস্থ্যবীমা একটি বড় ভূমিকা রাখে। আমাদের দেশে এ ব্যবস্থা নেই। এক্ষেত্রে সরকারকেই প্রথম উদ্যোগটি নিতে হবে। স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা করা গেলে এ সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে আসন্ন বাজেটে সরকার বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করবে।
বেসরকারিভাবে দেশে রোগ নির্ণয় কেন্দ্র, হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ, ইনস্টিটিউটের সংখ্যা বাড়ছে। তাতে কী স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় ও ভোগান্তি কমেছে বলে মনে করেন?
ভোগান্তি কমেছে, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে। কিছুদিন আগেও ডলারের মূল্য ছিল ৯০ টাকা, এখন তা ১২০ টাকা। এ খাতের বেশির ভাগ পণ্য আমদানিনির্ভর। সেক্ষেত্রে ব্যয় কমেছে বলা যাবে না, কিন্তু ভোগান্তি কমেছে। কারণ এখন সরকারি ও বেসরকারিভাবে উপজেলা পর্যায়েও ভালো স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায়। যেগুলোর জন্য আগে বড় শহরে আসতে হতো। এখন আর তা হয় না। সেক্ষেত্রে আমি বলব, ভোগান্তি কমেছে।
বিশেষায়িত চিকিৎসার দিক থেকে বাংলাদেশে এখনো পিছিয়ে। এর সংকট ও সীমাবদ্ধতা কোথায়? সুনির্দিষ্টভাবে জাতীয় বাজেটে এজন্য কী নীতি গ্রহণ করা উচিত?
আগেও আমি বলেছি আমরা কিন্তু খুব বেশি পিছিয়ে নেই। ক্যান্সার ও হৃদরোগের ভালো চিকিৎসা এখন বাংলাদেশেই হচ্ছে। কিডনি চিকিৎসা, কিডনি ডায়ালাইসিস এখন বাংলাদেশের উপজেলা পর্যায়েও হচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমরা খুব বেশি পিছিয়ে আছি তা কিন্তু না। কিন্তু প্রযুক্তির উন্নয়ন প্রতি মুহূর্তে হচ্ছে। সরকার এক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তিগুলো দেশে নিয়ে আসতে পারে। এগুলো সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে আনার জন্য ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেমটাকে আরো সহজ করতে পারে। উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য বাংলাদেশের জনবলকে বিদেশে পাঠানো, অথবা বিদেশ থেকে উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে আসা বা প্রশিক্ষিত ট্রেইনার নিয়ে এসে প্রশিক্ষণ দেয়া এ কাজগুলো যদি সরকার করে, তাহলে অবশ্যই আমরা এক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করব।










