জনাব মুজিবুল হকের সঙ্গে যখন আমার পরিচয় হয়, তখন তিনি  একজন অভিজ্ঞ সচিব, যদিও তার চাকরির বয়স মাত্র একুশ বছর। আমি সরকারের অন্যতম কনিষ্ঠ উপসচিব। সাবেক সিএসপি ক্যাডারের ব্যাচ হিসেবে তিনি আমার ১৫ ব্যাচ সিনিয়র: তিনি ১৯৫৪ ব্যাচের, আমি ১৯৬৯ ব্যাচের। বয়সের দিক থেকেও তিনি ১৫-১৬ বছরের বড় হবেন। আমার চাকরিস্থল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এ মন্ত্রণালয়ে এর আগে সচিব ছিলেন জনাব মোকাম্মেল হক। চাকরির মাত্র চৌদ্দ বছরের মাথায় তিনি শিক্ষা সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। চাল-চলনে কৈশোর এবং তারুণ্যের সংযোগ বিন্দুতে অবস্থান। কাজকর্মে উত্সাহ-উদ্দীপনার শেষ নেই। তবে কিছুটা আবেগতাড়িত। মাঝে মধ্যে অভিমান করতেন, রেগে যেতেন। আনন্দে উত্সাহে আমাদের সময় ভালোই কাটছিল। এর মধ্যে নতুন ক্যাবিনেট সেক্রেটারি হিসেবে যোগ দিলেন জনাব সফিউল আজম। মোকাম্মেল সাহেবসহ কয়েকজন সচিবকে জুনিয়র বিবেচনা করে অধিদপ্তর এবং সংস্থার প্রধান হিসেবে বদলি করা হলো। তাদের জায়গায় অভিজ্ঞ সচিবদেরকে মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ দেয়া হলো। যত দূর মনে পড়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জনাব মুজিবুল হককে বদলি করা হলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।

কোনো সঙ্গী সাথি ছাড়াই মুজিবুল হক সাহেব মন্ত্রণালয়ে এলেন। আমরা, মন্ত্রণালযের দু-তিনজন কর্মকর্তা তাকে সচিবের সঙ্গে নিয়ে এলাম। যোগদানের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তিনি আমাদের সঙ্গে কথা বললেন। ভারিক্কি চেহারার অতি ফরসা এক ভদ্রলোক। মাঝারি আকারের সুঠাম গোলগাল গড়ন। মাথায় চুল না থাকায় খুব সহজে চার্চিল বলে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে। শুনেছি তার সমবয়সীরা অনেকেই তাঁকে এ নামে ডাকে। আমাদেরকে তিনি বললেন, একটি প্রজ্ঞাপনের বলে তিনি মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, সরকার যত দিন তাকে এখানে রাখবে, তত দিন তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করবেন; এর বেশি কিছু নয়। বুঝলাম মুজিবুল হক সাহেব একজন ঝানু আমলা। ভেতরে যা-ই অনুভব করুন না কেন, বাইরে এর কোনো বাড়তি প্রকাশ নেই। পরিপাটি চালচলন, বিশুদ্ধ ভাষায় পরিশীলিত প্রকাশ। শুরুতে আমাদেরকে খুব কাছে না টানলেও একেবারে দূরে সরিয়ে দেন না, নানা কাজে বারবার রুমে আসতে যে একটা ভয় লাগে তা কিন্তু নয়, বরং দেখলাম তাঁর কথাবার্তা শুনতে ভালোই লাগে। রুমে এলে নানা বিষয়ে কথাবার্তায় সময় কীভাবে গড়িয়ে চলে বোঝা যায় না। আস্তে আস্তে তিনি আমাদের প্রিয় মুরব্বি হয়ে গেলেন।

মুজিবুল হক সাহেব মাঝে মাঝে চড়া স্বরে কথা বলতেন। এটা ছিল তার স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গির অংশবিশেষ। যারা এ স্বরে অভ্যস্ত নয়, তারা এ স্বরে কথা শুনলে কিছুটা ঘাবড়ে যেতেন। আমরা যারা তাঁর কাছে থেকে কাজ করেছি, তারা একে স্বাভাবিকভাবে নিতাম। আমার একটা বিরাট সুবিধা ছিল যে, আমি সার্ভিসে তার পনের বছরের জুনিয়র ছিলাম। ফলে হাবেভাবে আমাকে প্রবেশনার মনে করতেন। উপসচিব হলেও আমি তাঁর মতো একজন কর্মকর্তার বিপরীতে এ অবস্থান আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করতাম। তর্কবিতর্কে অবতীর্ণ হতাম। এটি প্রবেশনারের অধিকার। ‘এই যে পণ্ডিত’ বলে তাঁর দরাজ গলার সম্বোধনে যে স্নেহ ঝরে পড়ত, তা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। সরকারি রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, ১৯৩০ সালে বরিশাল জেলায় তাঁর জন্ম। সে হিসেবে ২০১৪ সনে ৮৪ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুকে অকাল প্রয়াণ বলা যায় না। তবু আমার মেনে নিতে কষ্ট হয় যে, আমি তার দরাজ গলার ডাক আর শুনতে পারব না। আমার মতো অবসরে যাওয়া লোককে স্নেহমাখা ভর্ত্সনায় বলবেন না, ‘তুমি বুঝতে পারছ না, বয়স হলে বুঝতে পারবে।’

আমি এখানে এই উপমহাদেশে আইসিএসসি এসপি এবং আইএএস ‘কালচার’ সম্পর্কে দু-একটি কথা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। অনুজ (জুনিয়র) সহকর্মীদের প্রতি এই তিন ক্যাডারের সিনিয়র সহকর্মীদের স্নেহশীল আচরণ রূপকথার মতো। আমার সৌভাগ্য যে, আমি সচিব হওয়ার আগ-পর্যন্ত যাদের নিয়ন্ত্রণাধীনে কাজ করেছি, এদের মধ্যে জেলা পর্যায়ের একজন ছাড়া বাকি সবাই ছিলেন সিএসপি অফিসার। সচিব পদে ভাগ্যক্রমে সাবেক সিএসপি জনাব সাদেককে মন্ত্রী হিসেবে পেয়েছিলাম। অন্যান্য মন্ত্রী অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই সার্ভিসের বাইরের ব্যক্তি। আমার ক্যাডারের সব অগ্রজ কর্মকর্তাকে আমি অতীব স্নেহশীল পেয়েছি। এমনকি যে দু-একজন সিনিয়র আইএএস কর্মকর্তার সান্নিধ্যে আসার সুযোগ হয়েছে, তারাও সবাই অকৃপণ স্নেহ বর্ষণে আমাকে কৃতার্থ করেছেন। মনে হয়েছে অবাস্তব আবেগবশত এ তিন ক্যাডারের কর্মকর্তারা একে অপরকে একই পরিবারের এবং সংস্কৃতির লোক মনে করেন। মুজিবুল হক সাহেবের কাছেও এরূপ গল্প শুনেছি।

একজন শিক্ষিত অথবা অর্ধশিক্ষিত বাঙালির মনে সাবেক আইসিএসসিএসপি এবং আইএএস কর্মকর্তা সম্পর্কে বাস্তব সত্য এবং পরাবাস্তব কল্পনা মিশ্রিত যে মোহনীয় অবয়ব তথা ভাবমূর্তি রয়েছে, জনাব মুজিবুল হক ছিলেন তার মূর্ত প্রতীক। তাঁর চেহারা, ব্যক্তিত্ব এবং প্রকাশশৈলী মুহূর্তেই তাকে অনন্য সাধারণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত করত। সিভিল সার্ভিসের সর্বোচ্চ পদে (ক্যাবিনেট সেক্রেটারি) অধিষ্ঠান সত্ত্বেও তিনি সরকার থেকে কোনো বাড়তি সুবিধা গ্রহণ করেন নেই। তাঁর আশপাশের কর্মকর্তারা এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতারা শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ তাঁকে বিভিন্ন সুবিধা (অনৈতিক নয়) দিতে চেয়েছেন। তিনি বিনম্র ভদ্রতায় তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। শেষ বয়সে তিনি প্রায়ই বলতেন, অপ্রত্যাশিতভাবে ঢাকায় জমির দাম বেড়ে যাওয়ায় তিনি আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পদশালী হয়ে গেছেন। এখন তাঁর নতুন করে সম্পদ আহরণের প্রয়োজন নেই।

   প্রদীপ্তি মুজিবুল হককে ঋদ্ধ করেছিল। এটি ছিল তার বড় সম্পদ। সচিবালয়ের কার্যক্রমকে তিনি ব্যবস্থাপনার যৌক্তিক কাঠামোতে রূপ দিতে প্রয়াস পেয়েছিলেন। সচিব কামালউদ্দিন চৌধুরী আমাকে নোট লেখার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি হাতে-কলমে শিখিয়েছিলেন। জনাব হক নথি প্রস্তুতকরণ, নথি সংরক্ষণ, নথি ব্যবস্থাপনার পেছনে যুক্তিবিদ্যার যে তত্ত্ব এবং শক্তি কাজ করে, তার বিশদ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে ছিলেন। এই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যুক্তিবিদ্যার প্রয়োগ আমার আত্মপ্রত্যয় এবং কর্মোদ্যোগ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছিল। মুজিবুল হক সাহেব ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, আমরা যে কাজ করি না কেন, তার পেছনের প্রক্রিয়া-পদ্ধতি যুক্তিগ্রাহ্য হতে হবে। যুক্তিতর্ক থেকে দূরে থেকে চিন্তাভাবনাকে বিসর্জন দিয়ে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে কোনো কাজ করা শিক্ষিত লোকের পক্ষে সমীচীন হবে না। শিক্ষিত লোক কাজ শুরু করার আগেই বুদ্ধিবলে, যুক্তিবলে সে কাজের ফল দেখতে পায়। বারবার ঠেকে শেখা তার পক্ষে শোভনীয় হয় না।

সরকার একটি বৃহৎ এবং জটিল সংগঠন। এই সংগঠনের পদস্থ ব্যক্তিদেরকে সুচারুরূপে কর্ম সম্পাদন করতে হলে অনেক পড়াশোনা করতে হয়, প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলোর খবর এবং তথ্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে, তথ্যাদি বিশ্লেষণ করার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়। সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় দর্শনের সঙ্গে শাসক দলের নীতি-আদর্শের সামঞ্জস্য ও অসঙ্গতি হূদয়াঙ্গম করে একটি গ্রহণযোগ্য কর্মকৌশল উদ্ভাবন করতে হয়, যার ভিত্তিতে সরকারি কাজকর্ম সম্পাদিত হয়। মুজিবুল হক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এ কাজটি করতে পারতেন। বাংলা ইংরেজি উভয় ভাষার ওপর তাঁর চমত্কার দখল ছিল। তিনি বাংলায় অনেক নতুন শব্দ উদ্ভাবন ও ব্যবহার করতেন। সাংগঠনিকভাবে রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও রাজনৈতিক ঘটনার বিশ্লেষণে তার পারদর্শিতা ছিল লক্ষণীয়। ছাত্রজীবনে তিনি সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সর্বোচ্চ পদে (ভিপি) নির্বাচিত হয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার কারণে কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। এসব কারণে সচিব হিসেবে বিষয়টির আদ্যোপান্ত বুঝে নিয়ে সম্ভ্যাব্য সব দিক বিবেচনা করে, বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতেন।

প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা এবং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সফল নির্বাহী সচিব হিসেবে যেমন জনাব মুজিবুল হক একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব বলে প্রতিভাসিত ছিলেন, তেমনি পরিকল্পনা কমিশনের সিনিয়র সদস্য, প্রোগ্রামিং হিসেবে তিনি বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং উপস্থাপনাশৈলীর অমেয় সামর্থ্যের অবিস্মরণীয় স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর সময়ে পরিকল্পনা কমিশন বলতে জনাব মুজিবুল হককেই বোঝানো হতো। যে পদে তিনি কাজ করেছেন, ধারে-ভারে সে পদটিকে তিনি অসাধারণ কার্যকর এবং আকর্ষণীয় করে তুলেছেন। এখানেই জনাব হকের স্বাতন্ত্র্য।

অবসর গ্রহণের পর জনাব মুজিবুল হক দুটি পে-কমিশন এবং একটি সম্প্রচার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনটি কমিশনের কাজই তিনি সুচারুরূপে সম্পাদন করেছেন। এ সময় তাকে ছোটখাটো বাড়তি সুবিধা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। তিনি গ্রহণ করেননি। যথাসময়ে কাজ শেষ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। এ কাজকে তিনি জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এর জন্য কোনো কৃতিত্ব দাবি করেননি।  

যে দুটি অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য জনাব মুজিবুল হককে সিভিল সার্ভিসের ‘রোল মডেল’ হিসেবে তৈরি করেছিল তার একটি হচ্ছে নীতি-নৈতিকতার পক্ষে তার সুদৃঢ় অবস্থান এবং অন্যটি হচ্ছে তার বিদ্যুত্স্পর্শী উপস্থিতি। তাঁর উপস্থিতি যেকোনো সভা, সম্মেলন, এমনকি অনানুষ্ঠানিক আড্ডাকেও আলোকিত করে তুলত। সবাই একনিবিষ্ট হয়ে তাঁর কথা শুনতেন। কথা না বললেও তাঁর মনের কথা স্পষ্ট হয়ে তাদের কানে বাজত। সিভিল সার্ভিসের আপামর সদস্য, তাঁর পরিচিত রাজনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষ জানতেন মুজিবুল হক সাহেব যা বলছেন, তার পেছনে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির কোনো প্রচেষ্টা বা মতলববাজি নেই। ন্যায়-নৈতিকতার নিরিখে তিনি যা ভালো মনে করতেন, তাই করতেন। সিভিল সার্ভিসে অনেকেই উচ্চপদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। কিন্তু অতি নগণ্য সংখ্যক কয়েকজন মাত্র সমান উঁচুতে উঠতে পেরেছেন। দুর্লভ এক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জন্য বাংলাদেশের সিভিল সার্ভিসের ইতিহাসে জনাব মুজিবুল হকের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

লেখক: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব