ড. মাহবুব হোসেন প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ হিসেবে শুধু নন, একজন উন্নয়ন ও কৃষি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ হিসেবেও দেশ-বিদেশে পরিচিত ছিলেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল দারিদ্র্য, ভূমি সংস্কার, গ্রামীণ শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তন, ক্ষুদ্রঋণ, কৃষি উন্নয়ন, বিশেষত কৃষিতে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের বিভিন্ন দিক। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রামীণ উন্নয়ন ও কৃষি-সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতি প্রণয়নে তাঁর ভূমিকা ও অবদান অতুলনীয়। এ দেশের কৃষিনীতি প্রণয়নে মাহবুব ভাইয়ের প্রভাবশীল সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তিনিই প্রথম ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ে বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনা উপস্থাপন করেন। ব্যক্তিগতভাবে সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত মাহবুব হোসেন ছিলেন নিভৃতচারী মানুষ, প্রচারবিমুখ। প্রয়োজনের অতিরিক্ত আড়ম্বর তাঁর ছিল না, না কথায়, না কাজে। পরিচিতজনদের কাছে অত্যন্ত বিনয়ী, সদালাপী ও অসম্ভব কর্মঠ। ড. মাহবুব হোসেন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ২ জানুয়ারি ভারতের নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত চাপড়া থানার বাঙ্গালজি গ্রামে।
দেশভাগের পর ১৯৪৯-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তাঁদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হলে বর্তমান চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা থানার বিষ্ণপুর গ্রামে এসে আশ্রয় নেয় তাঁর পরিবার। তাঁর পিতা ডা. কোবাদ আলি চিকিত্সাশাস্ত্রে প্রশিক্ষণ নিয়ে গ্রামীণ ডাক্তারি পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে পুনরায় এ গ্রাম থেকে বাস্তুহারা হয়ে একই উপজেলার কার্পাসডাঙ্গায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। ড. হোসেন ছিলেন ১১ ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয়। তাঁর শিক্ষাজীবন বিষ্ণপুরে শুরু হলেও পরিবারে আর্থিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হয় পশ্চিমবঙ্গের মাতুলালয়ে। ১৯৬৩ সালে চাপড়া কিং এডওয়ার্ড হাইস্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি ভর্তি হন কৃষ্ণনগর সরকারি মহাবিদ্যালয়ে। সেখানে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে অর্থনীতিতে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। অনার্স পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করায় তিনি ‘গিলক্রাইস্ট’ পদকে ভূষিত হন। ১৯৬৬ সালে অর্থনীতিতে এমএ করার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও কয়েক মাসের মধ্যে পরিবারের আর্থিক অবস্থার চাপে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে নিজ গ্রামে চলে আসেন। কার্পাসডাঙ্গা মাধ্যমিক স্কুলে তিনি প্রায় দুই বছর শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা পেশা নিয়ে জীবনের শুরু। পরবর্তীতে নিজের শিক্ষকতা ও প্রাইভেট টিউশনির জমানো আয় আর মা ফাতেমা জোহরার সোনার গহনা বিক্রির টাকায় ১৯৬৮ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে এমএ পাস করেন।
ড. হোসেনকে এমএ পরীক্ষার সময় মৌখিক পরীক্ষা নিতে এসে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসের (পিআইডিই) তত্কালীন পরিচালক অধ্যাপক নুরুল ইসলাম তাঁকে পিআইডিইতে যোগদানের প্রস্তাব দিলে ফল প্রকাশের আগেই তিনি করাচিতে স্টাফ ইকোনমিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সে সময়ের ফোর্ড ফাউন্ডেশনের স্কলারশিপ নিয়ে মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করার সুযোগ থাকলেও ড. হোসেন মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে তিনি আবার পাড়ি জমান বিদেশে। তার আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন সহধর্মিণী পারভীন হোসেনের সঙ্গে। ১৯৭৩ সালে কেমব্রিজে তৃতীয় বিশ্বের শিক্ষার্থীদের জন্য ডিপ্লোমা ইন ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস পরীক্ষায় প্রথম হয়ে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য গবেষণা শুরু করেন। ১৯৭৭ সালে মাহবুব হোসেন Agrarian Structure and Land Productivity বিষয়ে থিসিসের জন্য কেমব্রিজ থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন এবং দেশে প্রত্যাবর্তন করে বিআইডিএসে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। বড়, মাঝারি ও ছোট আয়তনের খামারগুলোয় উত্পাদনে কোন খামার আকৃতি উত্পাদনশীলতায় বেশি দক্ষ, তা তিনি পিএইচডি গবেষণায় বিশ্লেষণ করেন। তুলনামূলকভাবে ছোট খামারিরাই বেশি নিবেদিত এবং দক্ষ এ প্রতিপাদ্য তিনি প্রমাণ করেছেন। কৃষি অর্থনীতিতে জ্ঞানের পরিপূর্ণতার এ ভিত্তি সারা জীবন তাঁকে আবিষ্ট রেখেছে। বিআইডিএসে গবেষণা পরিচালক থাকা অবস্থায় ড. হোসেন আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (ইরি) জন্য গ্রামীণ উন্নয়নে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির অবদানের ওপর একটি গবেষণার কাজে যুক্ত হন। এ গবেষণার তথ্য সংগ্রহের জন্য নমুনা জরিপের মাধ্যমে নির্বাচন করা হয় বাংলাদেশের ৫৭টি জেলার ৬২টি গ্রামকে। বাংলাদেশে এত বড় নমুনা জরিপের মাধ্যমে ব্যক্তিগত পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের এটিই ছিল প্রথম উদ্যোগ। ১৯৮৫ সালে তিনি ওয়াশিংটনের আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (IFPRI) সম্মানজনক Visiting Scientist হিসেবে যোগ দেন। এখানে দুই বছরের কর্মজীবনে তিনি দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রামীণ ব্যাংকের অবদান, বাংলাদেশে সবুজ বিপ্লবের প্রকৃতি ও প্রভাব এবং পল্লী উন্নয়নে গ্রামের রাস্তাঘাট ও ভৌতিক অবকাঠামোর অবদান-বিষয়ক তিনটি উচ্চমানের রিসার্চ মনোগ্রাফ (একক বিষয়ে বই) প্রকাশ করেন, যা পৃথিবীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের উন্নয়নের তথ্যভিত্তি হিসেবে এখনো ব্যবহার
করা হয়।
১৯৮৮ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে তিনি বিআইডিএস প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালকের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এ সময় গ্রামীণ রূপান্তর, কৃষিতে বিবর্তন, বর্গাচাষের অর্থনীতি, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণায় বিআইডিএসে ব্যাপক গতিশীলতা আসে। বিআইডিএসের মহাপরিচালক পদে যোগ দিয়ে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অবদান রাখেন। মেয়াদ শেষে ১৯৯২ সালের মার্চে তিনি ফিলিপিন্সে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯২ থেকে ২০০৭ এই দীর্ঘ ১৫ বছর ড. হোসেন ইরিতে সমাজবিজ্ঞান গবেষণায় সুনামের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ দায়িত্ব পালনকালে তিনি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ভারত, চীন ও বাংলাদেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয়ের ওপর। এর মধ্যে ধান-অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের পথে প্রতিবন্ধকতা, আয়বৈষম্য ও দারিদ্র্য নিরসনে কৃষি প্রযুক্তির ভূমিকা, কৃষি গবেষণার প্রাধিকার ও পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয় উল্লেখযোগ্য। তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন ইরির ত্রিবার্ষিক গবেষণা পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা কৌশল পরিপত্র তৈরিতে। ১৯৯৯ সালে এক বছরের জন্য তিনি ইরির উপমহাপরিচালকের সাময়িক দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ২০০০ সাল থেকে এ প্রতিষ্ঠানে তিনি প্রতিকূল পরিবেশে
প্রযুক্তি উদ্ভাবন কর্মসূচির পরিচালক এবং এ বিষয়ে এশিয়ার নয়টি দেশের রিসার্চ কনসোর্টিয়ামের আহ্বায়কের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেন। ড. হোসেন ওই সময় এসব দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান এবং বর্ষানির্ভর পরিবেশ উপযোগী ধানের আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ইরিতে তাঁর চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি ২০০৭ সালে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং নির্বাহী পরিচালক হিসেবে ব্র্যাকে যোগদান করেন। চলে আসেন কর্মময় জীবনের নতুন ধারায়। ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তিনি এখানে অত্যন্ত দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে এ প্রতিষ্ঠানের অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাহী পরিচালকের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিকভাবে জড়িত ছিলেন। ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে। কিছুদিন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের গভর্নিং বডির সদস্য হিসেবে এবং আমৃত্যু সাধারণ পরিষদ সদস্য ছিলেন। ‘খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ’ প্লাটফরম গঠন ও পরিচালনার ব্যাপারে পরামর্শক হিসেবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইরিতে থাকাকালীন তিনি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আবারো শিক্ষকতায় যুক্ত হন। কেবল গবেষকই নন, ড. মাহবুব হোসেন একজন সফল শিক্ষকও ছিলেন। তিনি ১৯৯৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব ফিলিপিন্স অ্যাট লস ব্যানসে (UPLB) কৃষি অর্থনীতি বিভাগে সংযুক্ত প্রফেসর হিসেবে শিক্ষকতা করেন এবং ডক্টরেট ও মাস্টার ডিগ্রির জন্য থিসিস গবেষণা কমিটির চেয়ারম্যান এবং ডক্টরেট ও মাস্টার ডিগ্রির সুপারভাইজারের দায়িত্ব পালন করেন। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ১৬ জন শিক্ষার্থী তাঁর অধীনে ডক্টরেট ও মাস্টার ডিগ্রি সমাপ্ত করেছেন এবং বেশ কয়েকজন Post doctored fellow হিসেবে কাজ করেছেন। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এশিয়ান সোসাইটি ফর এগ্রিকালচার ইকোনমিস্টের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ড. মাহবুব হোসেন।
এছাড়া তিনি বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল নলেজ অ্যাডভাইজরি কমিশনের সদস্য, বাংলাদেশ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং খাদ্যনিরাপত্তা-বিষয়ক বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেছেন। ১৯৯১ সালে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বাংলাদেশের উন্নয়ন-বিষয়ক টাস্কফোর্সের দারিদ্র্য বিমোচন-বিষয়ক কমিটির সভাপতি ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারে দায়িত্ব গ্রহণের পর পুনরায় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা পদ্ধতিতে ফিরে এলে, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার কৃষি অধ্যায় রচনায় তিনি সহায়তা প্রদান করেন। তিনি ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তাকারী প্যানেল অব ইকোনমিস্টসের সদস্য ছিলেন।
খাদ্যনীতি-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইফপ্রি, ইরি, এফএও থেকে তাঁর ডজনের অধিক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে তাঁর একক ও যৌথভাবে মোট ১২টি বই এবং ২০০-এর অধিক গবেষণা প্রবন্ধ দেশে ও আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। ড. মাহবুব হোসেনের উল্লেখযোগ্য বই হলো: গরিব দেশে গরিব মানুষ, বাংলাদেশ; গ্রামের মানুষ গ্রামীণ অর্থনীতি জীবন জীবিকার পর্যালোচনা; বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়ন: সমস্যা ও সম্ভাবনা; তিন বিঘা জমি; গল্পে গল্পে অর্থনীতি; Asian Rice Bowls; A Returning Crisis; Rice Research in Asia: Progress and Prospects; Impact of Rice Research in Asia; Strategy of Development in Bangladesh; ইত্যাদি। সর্বশেষ ২০১৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে Leading Issues in Rural Development: Bangladesh Perspective ও বিশ গ্রামের গল্প। গ্রামে জন্মে, গ্রামের অর্থনীতিকে এমন বিশালভাবে আর কেইবা ধারণ করেছে?
মাহবুব হোসেনের বেশির ভাগ গবেষণা নমুনা জরিপের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্যের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে পরিচালিত। ফলে পল্লী উন্নয়নের সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং গ্রামীণ জনগণের অগ্রসরসূচক চিন্তাভাবনা ও প্রচেষ্টা তাঁর গবেষণা থেকে উঠে এসেছে, যা দীর্ঘ সময় দেশের নাগরিক সমাজের গতানুগতিক চিন্তাধারাকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিতে সমর্থ হয়। সর্বশেষ কর্মজীবনে তার প্রাথমিক গবেষণার বিষয় ছিল বাংলাদেশের ভূমিস্বত্ব ব্যবস্থা ও ভূমি সংস্কার, গ্রামীণ শিল্প, অ-কৃষিজ খাতের উন্নয়ন, কৃষিতে ভর্তুকি ও মূল্যনীতি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও ভৌতিক অবকাঠামো, ক্ষুদ্রঋণসহ দারিদ্র্য বিমোচন-সংশ্লিষ্ট বহুবিধ বিষয়। তাঁর গবেষণালব্ধ ফলাফল ১৯৮৪ সালে বাইদুল্লা খানের নেতৃত্বে ভূমি সংস্কার কমিশন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানস্বরূপ বাংলাদেশ কৃষি অর্থনীতি সমিতি ১৯৮৪ সালে ড. হোসেনকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। অবদানের তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক সম্মাননা মাহবুব হোসেন কমই পেয়েছেন। ড. হোসেন বাংলাদেশের শুধু একজন কৃতী সন্তানই নন, ২০১৩ সালের ২ মে প্রকাশিত তালিকায় ফরেন পলিসি গ্লোবাল ম্যাগাজিন অব পলিটিকস অ্যান্ড ইকোনমিকস তাঁকে বিশ্বের সেরা ৫০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেন এবং তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম কোনো ব্যক্তি, যিনি এই প্রশংসনীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। গবেষণায় তাঁর জীবন পুরো উত্সর্গীকৃত হলেও ব্র্যাকে থেকে গণমানুষ ও গ্রামীণ দুস্থদের বন্ধুবত্সল এত সরল জীবনাচারী মানুষ কম দেখা যায়।
ড. হোসেন হূদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর ২০১৩ সালে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে তার বাইপাস সার্জারি করানো হলেও সেটি পুরোপুরি সফল হয়নি। ফলে পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে তাকে হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে বেশ কয়েকবার। শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও নিরলস কাজ করে গেছেন তিনি। ২০১৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকে ভাল্ব প্রতিস্থাপন ও বাইপাস অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিয়েও মানসিক প্রস্তুতি না থাকায় ছয় মাস পর অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশে ফিরে আসেন তিনি। ফিরে এসেও বারবার অসুস্থ হওয়ার প্রেক্ষিতে পুনরায় ১৫ ডিসেম্বর ২০১৫তে তাঁকে ক্লিভল্যান্ডে নেয়া হয়। ২১ ডিসেম্বর তার রিডো বাইপাস সার্জারি ও ভাল্ব প্রতিস্থাপন হয়। অপারেশন সফল হলেও পরে জটিলতা দেখা দেয়। এভাবে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ১৩ দিন কাটিয়ে ৩ জানুয়ারি ২০১৬ বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে। সমাপ্তি ঘটল দ্যূতি ছড়ানো এক বর্ণাঢ্য জীবনের, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অর্থনীতি ও কৃষির জন্য সোনালি ভবিষ্যতের পথদ্রষ্টা এক অদম্য স্বপ্নযাত্রীর। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরি তিন সন্তান— শাওন হোসেন, শারমিন হোসেন ও তানভির হোসেন এখন পিতার স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবেন এ কামনাই থাকবে আমাদের। তাঁকে স্মরণ করা এবং তাঁর অসমাপ্ত কাজ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার এ দায় আসলে আমাদেরও, যারা তাঁর কাজের সুফল ভোগ করছি। আলোকসামান্য সজ্জন ব্যক্তি মাহবুব হোসেনের যারা সংস্পর্শে এসেছেন, আমৃত্যু অনেকেই তাঁকে ভুলতে পারবেন না। না আমি নিজেও।
লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বর্তমানে সদস্য
(সিনিয়র সচিব), বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশন






