বাংলাদেশের সংস্কৃতির নির্মাণে সেলিম আল দীনের অবদান কী?—এ প্রশ্নের জবাব লিখতে গিয়ে সংস্কৃতির নির্মাণ, সেলিম আল দীন ও অবদান বিষয়ে আমার বোঝাপড়ার একটি প্রাথমিক ফর্দ হাজির করতে চাই। প্রথমত. কারো অবদান আলোচনা করার মানে এই নয় যে, ব্যক্তির মহিমাকীর্তনের লক্ষ্যে নির্জলা প্রশংসার ঝুড়ি বহন করা। সে অর্থে সেলিম আল দীনের অবদানকে আমি দেখতে চাইব সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা কীভাবে বিকশিত হলো এবং এর সঙ্গে অন্যান্য ব্যক্তি ও সংগঠনের চিন্তা ও চর্চার সংশ্লেষ কীভাবে ঘটল। এ লেখায় এ দেশের রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরতায় অত্যধিক ফাঁকা আওয়াজে উচ্চারিত ‘অবদান’ শব্দটি এর বিকল্প চিহ্ন খুঁজবে ভূমিকা শব্দের মধ্যে। বাংলাদেশের সংস্কৃতি বলতে বুঝতে চাইব থিয়েটার বা নাট্যশিল্পের মাধ্যমে শিল্পের একটি ভাষা কীভাবে জনগণকে সে ভাষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঞ্চালিত করেছে। সেলিম আল দীন মানে আমার কাছে প্রথমত. একজন নাট্যকার। দ্বিতীয়ত. সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মকাণ্ড কেমন হতে পারে, সেসব বিষয়ে নতুন আইডিয়া দান ও তত্ত্বায়নের একজন বুদ্ধিজীবী। নাটকের শিক্ষক হিসেবে সেলিম আল দীন কেমন, তা আমার জানার কথা নয়। কারণ আমি তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র নই। কিন্তু তাঁর নাটকের একজন সামান্য ও সতর্ক পাঠকমাত্র। তবে মরণোত্তর সেলিমের প্রতি তাঁর ছাত্রদের অকুণ্ঠ ভক্তিবাদিতা চাক্ষুস করে আমার মনে হয়েছে, তিনি ছাত্রদের মনোজগত্ গঠনে অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা রেখেছেন। পাশাপাশি তিনি তাঁর বিদ্যার্থীদের শিখিয়েছেন কী করে বিনা তর্কে ও প্রশ্নহীন কায়দায় গুরুজনকে ভক্তি করে দেবতায় পরিণত করতে হয়।

উত্তর-ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রকল্প

বাংলাদেশের সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে সেলিম আল দীনের স্থান কোথায়? তিনি কী করেছিলেন যার তাত্পর্য অনেক? সেলিম আল দীন নাটক রচনা ও এই বিষয়ে ভাবুকতার মাধ্যমে বাঙালির উত্তর-ঔপনিবেশিক আত্মপরিচয় নির্মাণকে প্রধান প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এটি হলো মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে নাট্যসংস্কৃতির একটি প্রধান অভিমুখ। এই অভিমুখ তিনি তৈরি করতে পেরেছিলেন বাংলাদেশের জনসংস্কৃতির ভুবন থেকে আখ্যান রচনা ও পরিবেশনার জ্ঞানকে রপ্ত করার মাধ্যমে। এর ফলে দেখা যায়, শহুরে সংস্কৃতির চর্চায় গ্রামীণ নাট্যকৌশলের আধুনিক সংশ্লেষ। এর মাধ্যমে সেলিম আল দীনের প্রধান দাবিটি একটি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক-তাত্ত্বিক আলামত হয়ে উঠেছে। সেই আলামতের নাম বর্ণনাত্মক নাটক ও নাট্য। ইউরোপীয় দ্বন্দ্বভিত্তিক নাট্যকৌশল পরিহার করে মধ্যযুগীয় আখ্যান-কথনের বর্ণনাত্মক রীতি, শহুরে কেন্দ্রে পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে সেলিম আল দীনের প্রধান পরিচয়টি নির্মিত হয়ে যায় উত্তর ঔপনিবেশিক নাট্যকার ও তাত্ত্বিক হিসেবে। কারণ ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়নের প্রক্রিয়ায় প্রাক-উপনিবেশিক নাট্যসংস্কৃতি, ঢাকা শহরে আধুনিক সংস্কৃতির চর্চায় স্থান করে নিতে না পারার ঐতিহাসিক এই বিচ্ছেদকে সেলিম আল দীন আমলে এনেছিলেন। এবং তার পরিপক্ব নাট্যচর্চায় নিজের সমস্ত সৃষ্টিশক্তি—বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক জনজীবন—প্রাক-ঔপনিবেশিক নাট্যকৌশলে রূপায়িত করতে ব্যয় করেছেন।

সেলিম আল দীনের নাট্যকর্ম বাঙালির শিকড়সন্ধানী সাংস্কৃতিক চর্চা হিসেবেই আখ্যা লাভ করেছে। শিকড়সন্ধানী নাট্যচর্চার পটভূমি ও প্রতিবেশ এ দেশের রাজধানী ঢাকায় কীভাবে গড়ে উঠেছিল, সেটি যদি আমরা তালাশ না করি তবে সেলিম আল দীনের ভূমিকাও বোঝা সম্ভব হবে না। সেলিম আল দীন নাট্যরচনার মাধ্যমে যদি বাংলাদেশের জাতীয় নাট্য আঙ্গিক তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করে থাকেন, তবে নাট্যনির্মাণের মাধ্যমে সৈয়দ জামিল আহমেদ জাতীয় নাট্য আঙ্গিক মঞ্চে প্রয়োগ করে বাস্তব রূপ দিয়েছেন। ফলে জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের প্রশ্নে সেলিম আল দীন আংশিকভাবে জবাব খুঁজতে পেরেছিলেন। বাকি অংশের যথার্থ উত্তর সন্ধান করেছেন তাঁরই কথিত ‘সহোদর’ জামিল আহমেদ। নিচের বিবিধ বাক্যে আমরা এ প্রস্তাবকে আরো ভেঙে ভেঙে দেখব।

মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নান, গ্রুপ থিয়েটার, জাতীয় সংস্কৃতি ও দেশজ পরিবেশনার ক্ষেত্র সমীক্ষা

মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নানের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর মুক্তিকামী চেতনায় অবগাহন করে মুক্তিযোদ্ধাদের সাংস্কৃতিক ভিশনের শ্রেষ্ঠ রূপায়ণ গ্রুপভিত্তিক থিয়েটারের চর্চা। গ্রুপ থিয়েটারের উত্থান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সুনীল আকাশ স্পর্শ করেছিল নতুন স্বপ্নের খোঁজে। গ্রুপভিত্তিক থিয়েটার চর্চায় অচিরেই উন্মেষ ঘটে জাতীয় সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের রাজনীতির। এ সাংস্কৃতিক রাজনীতির প্রক্রিয়ায় ঐতিহ্যের অন্বেষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ হয়ে ওঠে। এ প্রপঞ্চ যদি আমরা ব্যবচ্ছেদ করি, তাহলে দেখতে পেতে সক্ষম হব বাংলাদেশের মৃত্তিকার অপূর্ব সাংস্কৃতিক শস্যের খোঁজ দুভাবে হয়েছে। প্রথমত. গবেষণার মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত. গবেষণাজাত ফলাফল অর্থাত্ সাহিত্য ও পরিবেশনা বা পারফরম্যান্স-সংক্রান্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে নব্য চর্চার মাধ্যমে। মধ্যযুগের বাংলা নাট্য নামের সেলিম আল দীনের যে বইটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অকুতোভয় অধ্যাপক আহমদ শরীফের তত্ত্বাবধানে পিএচডি অভিসন্দর্ভ হিসেবে লেখা হয়েছিল, সেটি মূলত সাহিত্যিক উত্স থেকে বাংলার প্রাক-ঔপনিবেশিক নাট্যের বর্ণনাত্মক বা ঐতিহ্যবাহী রীতির অনুসন্ধান করেছে। কিন্তু অন্যদিকে সৈয়দ জামিল আহমেদ বরং বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা জীবন্ত পরিবেশনা/পারফরম্যান্সগুলোর বিবরণ ও বিশ্লেষণ এথনোগ্রাফিক গবেষণার পদ্ধতিতে তুলে ধরেছেন তাঁর অচিন পাখি ইনফিনিটি: ইনডিজেনাস থিয়েটার অব বাংলাদেশ নামের বইতে। এর মাধ্যমে সেলিম আল দীন বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাটলিপির কৌশল ও নন্দনসূত্র আত্মস্থ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর নাট্যসাহিত্যে নতুন ইডিয়ম বা বাগিবধি প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু তা থিয়েটারের ভাষায় উপস্থাপিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। স্পেস, টেক্সট ও অভিনেতার চরিত্রাভিনয় ও কথনের দ্বৈত ও অদ্বৈত নন্দনসূত্রের প্রয়োগ ঘটিয়ে সেলিমের বর্ণনাত্মক নাটকের সার্থক নাট্যরূপায়ণ ঘটিয়ে তোলেন জামিল আহমেদ। এর ফলে নান্দনিকতার রাজনৈতিক তাত্পর্যের হিসেবে বাংলাদেশের নাট্যসংস্কৃতি নতুন যুগে প্রবেশ করে।

জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের দুই স্রোত: সেলিম ও জামিল এবং ঢাকা থিয়েটার ও চাকা প্রযোজনা

অতএব, জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের দুটো স্রোত আছে। একটি নদী বইয়ে দিয়েছেন সেলিম আল দীন। অন্য নদীটি বইয়ে দিয়েছেন সৈয়দ জামিল আহমেদ। আর এই দুই নদী একই মোহনায় মিলেছে, যার নাম জাতীয় নাট্য আঙ্গিক। সেলিম আল দীনের নদীটি সাহিত্যের এবং সাহিত্যনির্ভর গবেষণার। জামিল আহমেদের নদীটি সাহিত্যের নয়, নাট্যের বা থিয়েটারের, ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা-বিষয়ক ক্ষেত্র সমীক্ষার আর মঞ্চে তা রূপায়ণের। এই দুই স্রোতের বলিষ্ঠ ধারক ঢাকা থিয়েটার। এবং ঢাকা থিয়েটারের অনন্য সংগঠক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ।

সেলিম আল দীনের কাজের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-নান্দনিক মূল্য তালাশের লক্ষ্যে এ লেখার অবকাশে আমরা প্রয়োজনীয় দুটো বিষয় খোলাশা করতে পারি। প্রথমত. মুক্তিযুদ্ধের আত্মপরিচয়ের রাজনীতি সেলিম আল দীন এবং ঢাকা থিয়েটারের জাতীয় সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের রাজনীতিতে পরিণত হলেও শিল্পের নতুন আঙ্গিকের অন্বেষাও এতে বিশেষ প্রভাবকের ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে সত্তরের দশকের শেষ দিকে দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় (এনএসডি) পড়ার শেষ পর্যায়ে বিভি করন্থ এবং বংশী কোলের ভারতীয় ট্র্যাডিশনাল ও ইনডিজেনাস উপাদান প্রয়োগের মাধ্যমে নব্য নাট্যসংস্কৃতি সম্পর্কে জামিল আহমেদের নিবিড় তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক পরিচয় ঘটেছিল। এর ভেতর দিয়ে জামিল আহমেদও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন উত্তর-ঔপনিবেশিক আত্মপরিচয়ের সাংস্কৃতিক প্রকল্প গড়ে তুলতে।

মধ্য আশির দশকে সেলিম আল দীন, আফসার আহমেদ ও জামিল আহমেদ ‘গাজীর গান’ নিয়ে একটি কর্মশালার মাধ্যমে জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের যে প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন, তা ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সেলিম আল দীনের চাকা নাটকের প্রযোজনার মাধম্যে সে প্রচেষ্টা সফলতার আলো সৃজন করেছিল। এ বিষয়ে সৈয়দ জামিল আহমেদের সঙ্গে আমার আলাপচারিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের ইতিহাস ট্রেস করা যায়। যেমন— নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সেলিম আল দীন সৈয়দ জামিল আহমেদের হাতে চাকা নাটকটি তুলে দিয়ে বলেন, ‘দেখিস এটাকে নিয়ে কিছু করতে পারিস কিনা।’ পরবর্তী দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে, জামিল আহমেদ নব্বইয়ের দশকে সেলিম আল দীনের চাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ঢাকা থিয়েটারে নির্দেশনা দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণের একজন অন্যতম প্রবক্তা ও কারিগর হয়ে ওঠেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাপ্রসূত চেতনাকে জামিল আহমেদ সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী ও উত্তর-ঔপনিবেশিক আত্মপরিচয়বাহী নাট্যচর্চায় অত্যন্ত সৃজনশীলতায় সে সময় বাস্তব রূপ দিতে সক্ষম হন। ফলে বাংলাদেশে জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নির্মাণ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক আত্মপরিচয়ের সাংস্কৃতিক প্রকল্পের মধ্যে সেলিমের নাটক লেখা এবং জামিলের নাট্য নির্মাণ ও ক্ষেত্র সমীক্ষা এর পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটিয়েছে। পরবর্তীতে নাসির উদ্দীন ইউসুফ ও ঢাকা থিয়েটার সে প্রকল্প জোরদার করেছে। এখানে, বিশেষভাবে উল্লেখ করার বিষয় হলো, বাংলাদেশের জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে থাকা সেলিম আল দীনের চাকা নাটকটির যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টিয়ক কলেজে নির্দেশনায় জামিল আহমেদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছিলেন ড্যানিয়েল প্যাট্রিজ। জামিল আহমেদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, প্যাট্রিজ চাকা অভিনয়ের ক্ষেত্রে আমেরিকার স্থানীয় গল্প বলার কৌশল প্রয়োগ করেছিলেন। এর ফলে আমরা দেখছি যে, যে জাতীয় নাট্য আঙ্গিক নিয়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক আত্মপরিচয়ের গৌরব ও রাজনীতির একমাত্র ভাগীদার কেবল সেলিম আল দীন, জামিল আহমেদ বা ঢাকা থিয়েটার নয়। পাশ্চাত্যের একজন নাট্যনির্দেশক আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের ইতিহাসের একজন সরাসরি নির্মাতা। অতএব পরিচয়ের রাজনীতির সরলরৈখিক বয়ান এককেন্দ্রিক পরিচয়ের অসারতাই তুলে ধরে।

ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনবাদিতা, সৃষ্টিশক্তি ও বিভ্রান্তি

আমরা এখানে কয়েকটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি। প্রথমত. বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি সেলিম আল দীনের একলার উদ্ভাবিত নয়। এটি সেলিম-জামিলের দ্বারা শহুরে সংস্কৃতিতে দেশজ নাট্য-ঐতিহ্যের একটি বলিষ্ঠ পুনরুজ্জীবন মাত্র। এর মাধ্যমে তাঁরা সংস্কৃতির কেন্দ্রে অর্থাত্ শহুরে সংস্কৃতির মধ্যে প্রান্তিক সংস্কৃতি আত্মস্থ করে আত্মপরিচয়ের একটি শ্লাঘা তৈরি করে দিতে সক্ষম হয়েছেন। কিন্তু এও মনে রাখা প্রয়োজন যে, বর্ণনাত্মক নাট্যরীতি কেবল বাঙালির নিজস্ব নয়। এটি এশিয়া আফ্রিকা আমেরিকার গল্প বলা ও পরিবেশনের একটি আবহমান যৌথ ঐতিহ্য। এমনকি ইউরোপীয় পোস্টড্রামাটিক বা আধুনিকোত্তর নাট্যচর্চারও এটি একটি শক্তিশালী আলামত।

অতএব জাতীয় নাট্য আঙ্গিকের নির্মাণ সেলিম আল দীন-সৈয়দ জামিল আহমেদ বা ঢাকা থিয়েটারের অভিনব কিছু নয়, এটি বরং মধ্যযুগের এক ধরনের পুনরুজ্জীবন। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ঐতিহ্যচর্চার নামে ঐতিহ্য-পৌত্তলিকতাও (কার্ল মার্ক্স কথিত কমোডিটি ফেটিশাইজেশনের অনুসরণে) এ জাতীয় বয়ানে প্রশ্রয় পেয়েছে। একদিকে শহুরে নাট্যচর্চায় ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে তাঁরা একটি শক্তিশালী তরঙ্গ তথা সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের প্রকল্প যেমন প্রবর্তন করতে পেরেছিলেন, তেমনি এর অভ্যন্তরেই লুকিয়ে ছিল অনুকরণ ও সৃষ্টিশক্তির বন্ধ্যত্ব এবং নাট্যচর্চার একটিমাত্র মডেলের প্রতি ফ্যাসিবাদী আনুগত্যেরও রূপরেখা। এক্ষেত্রে সেলিম আল দীন ও তাঁর লড়াকু বন্ধু সৈয়দ জামিল আহমেদ (যদ্দিন পর্যন্ত জাতীয়তাবাদী নাট্যচর্চা করেছেন) হলো একই সঙ্গে সৃজনশক্তি ও বিভ্রান্তির নাম।

লোককথার জাদুকরী বাস্তবতা, মিথের দূরতিক্রম্য রহস্যময় জগত্ ও আধুনিক কাব্যবোধ প্রভৃতির মিশেলে ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনবাদী নাট্যকৌশলকে আধ্যাত্মিক নিষ্ঠা ও ব্যক্তিগত সৃজনকুশলতায় সেলিম তাঁর নাট্যসম্ভারকে সমৃদ্ধ করেছেন। অন্যদিকে, গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শন থেকে গৃহীত ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ আখ্যা দিয়ে বিশেষায়িত বর্ণনাত্মক নাট্যরীতির মাধ্যমে বাঙালির শিকড়-অন্বেষার নাট্যচর্চাকে একটি হেজিমনির রূপ দেয়া হয়েছে, যা ঢাকার সংস্কৃতিতে অলঙ্ঘনীয় বলে মান্য হয়ে চলেছে বহুদিন ধরে। যদিও ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ বর্ণনাত্মক নাট্যরীতির এ ঐতিহ্য কেবল বাঙালির নিজস্ব নয়, এটি প্রায় সার্বজনীন। এবং ঐতিহ্যের এ পুনরুজ্জীবনবাদিতা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সংস্কৃতির প্রবাহকে প্রগতিশীল/সৃজনশীল না করে বরং প্রতিক্রিয়াশীল, পশ্চাত্গামী ও সমকালীন জীবনের নির্যাস রহিত এক আর্কাইভাল কালচারে পরিণত করে। এভাবে আত্মপরিচয়ের জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকল্পে বিভ্রান্তির কুয়াশা ডেকে আনার রূপকারও একদা হয়ে উঠেছিলেন সেলিম আল দীন, সৈয়দ জামিল আহমেদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ তথা ঢাকা থিয়েটার। এবং বর্তমানে সেই ঘরানার অন্ধ অনুকরণজাত নাট্যচর্চাও একই পশ্চাত্পদতার ফ্যারে পড়ে আছে।

সেলিম আল দীন, গ্রাম থিয়েটার এবং ‘লঘু নৃগোষ্ঠী নাট্য’ ও অধিপতিশীল অবচেতন

ঢাকা থিয়েটারের নেতৃত্বে বাংলাদেশজুড়ে গ্রাম থিয়েটার সাংগঠনিকভাবে পত্তন করার ক্ষেত্রে সেলিম আল দীন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। স্থানীয় লোকজ ঐতিহ্যের অনুসন্ধান, উন্মোচন, প্রকাশ ও সাংস্কৃতিক মেলার মাধ্যমে গ্রামীণ পরিসরে দেশজ সংস্কৃতির প্রবাহকে শুধু জীবন্ত নয়, ক্ষেত্রবিশেষে পুনরুজ্জীবিত ও বেগবান করার কাজটি প্রায় দুই দশকজুড়ে দেশব্যাপী গ্রাম থিয়েটারের অগণিত সংগঠন করে গেছে। যদিও বর্তমানে গ্রাম থিয়েটার সাংগঠনিকভাবে নিস্তেজ হয়ে চলেছে। তবু এর সাংস্কৃতিক তত্পরতার ঐতিহাসিক মূল্য অনেক। গ্রাম থিয়েটার একটি ধারণা থেকে সংগঠনের সজীবতায় দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে নিউক্লিয়াসের ভূমিকায় থেকেছেন সেলিম আল দীন। সেলিম ও তাঁর সমমনা ঢাকা থিয়েটারের নাট্যকর্মীরা গত শতকের আশির দশকের শুরুতেই বিশ্বাস করেছিলেন—‘জনগণের সংস্কৃতির সমাজরূপ ও শিল্পরূপ সৃষ্টি করাই গ্রাম থিয়েটার চর্চার মূল কথা’ হবে।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের পাঠক্রমে ‘লঘু নৃগোষ্ঠীর নাট্য’ অন্তর্ভুক্ত করা এবং গবেষণাগার নাট্যরূপে একটি মারমা রূপকথা এবং পরবর্তী পর্যায়ে বনপাংশুল রচনার মাধ্যমে এ দেশের বিদ্যায়তনিক পরিসরে ও নাগরিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এথনিক থিয়েটারের চর্চার ক্ষেত্রে সেলিম আল দীন পথিকৃতের ভূমিকা রেখেছেন। বাঙালি জতায়তাবাদী সাংস্কৃতিক চর্চার একজন যুগন্ধর ব্যক্তিত্ব হয়েও সেলিম আবার একরৈখিক জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক চর্চার অধিপতিশীলতার ধারণার বিপরীতে নিজেকে বাংলাদেশের বহুজাতিসত্তাগত সংস্কৃতির একজন নিবিড় পর্যবেক্ষকে পরিণত করেছিলেন। পাশাপাশি, প্রান্তিকায়িত পৌরাণিকতালগ্ন কৌম জীবনধারা-সংবলিত বিভিন্ন জাতিসত্তার শিল্প-নির্যাসকে একাডেমির বিদ্যাচর্চায় আত্মস্থ করেছেন ও ঢাকার অধিপতিশীল সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গেও সবলে সমীকৃত করেছেন। বাংলাদেশের সংস্কৃতির অধ্যয়ন ও ইতিহাসে সেলিম আল দীনের এ সংবেদনশীলতা অক্ষয় হয়ে থাকবে।

কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, আদিবাসীদের নাট্যের পরিভাষা নির্মাণে সেলিমের আনকনশাস অধিপতিশীল মনোভাবের প্রসঙ্গটি কোনোভাবেই উপেক্ষণীয় নয়। যেমন— তিনি আদিবাসীদের নাট্যের পরিভাষা করেছেন ‘লঘু নৃগোষ্ঠী নাট্য’ হিসেবে। এখানে আমাদের প্রথমেই বিবেচনা করতে হচ্ছে, সেলিম কেন মারমা চাকমা বা মান্দিদের জাতি না বলে, গোষ্ঠী বলেছেন? রাষ্ট্রবৈজ্ঞানিক চিন্তা অনুযায়ী গোষ্ঠী এবং জাতির পার্থক্য আমাদের অজানা নয়। বাঙালিকে জাতি মানতে যখন কোনো অসুবিধা নেই, তখন সেলিম মান্দি বা মারমাকে জাতি মানতে অবচেতন মনেই অসুবিধা বোধ করেছেন। এবং প্রচলিত অধিপতিশীল ভাবধারা অনুযায়ী জনমিতির তুলনামূলক সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে জাতির সংজ্ঞা নির্ণয় করেছেন। ফলে বিভিন্ন আদিবাসী জাতিসত্তাকে তিনি ‘গোষ্ঠী’ আখ্যা দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি গোষ্ঠীর আগে বিশেষণ যুক্ত করেছেন ‘লঘু’ হিসেবে। ফলে এ দেশে আদিবাসী সংস্কৃতির বিদ্যায়তনিক ও নাগরিক চর্চায় যেই সেলিম আল দীন সংবেদনশীলতার পথিকৃত্, সেই সেলিম আল দীন কী নিদারুণভাবেই না ‘লঘু নৃগোষ্ঠী’ আখ্যা দিয়ে একই সঙ্গে কলঙ্ক-তিলকও নিজের কপালে পরেছেন। এখন আমাদের সময় এসেছে, অবচেতনজাত অধিপতিশীল রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব ও বাগাড়ম্বরমূলক ভাষার খপ্পরে থেকে সেলিম আল দীন সমস্যাজনকভাবে হলেও যে ভালো কাজটি শুরু করেছিলেন, ভাষা ব্যবহারের রাজনীতি ও শ্রেয়বোধের নিরিখে আমাদের নির্ভুল হয়ে বলতেই হবে যে, শ্রদ্ধেয় সেলিম আল দীন আমরা আর ‘লঘু নৃগোষ্ঠী’ বলব না। বলব, হে মান্দি! হে মারমা! তোমরা সম্পূর্ণ আমাদের (বাঙালিদের) মতোই, তোমরা পূর্ণ আমাদের মতোই। তোমরা একেকটি ঋদ্ধ জাতি। বাংলাদেশ কেবল বাঙালি জাতি অধ্যুষিত নয়, আরো প্রায় অর্ধশত জাতির অধিবাস আমাদের এ প্রিয় বাংলাদেশ বহু জাতিতাত্ত্বিক এক রাষ্ট্র। লালন ফকিরের চিন্তার নির্যাসে আলোকিত হয়ে বলতে চাই, একত্ব ক্ষুদ্রতারই চিহ্ন আর বহুত্ব বিশ্বসংসারের বিশালত্বের উত্তরাধিকার সর্বমানবপ্রাণকে করে অভিন্ন।

 

লেখক: নাট্যকার, নির্দেশক ও প্রাবন্ধিক। সহকারী অধ্যাপক, থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়