প্রখ্যাত প্রতিবাদী শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবু মাহমুদের (১৯২০-১৯৮৮) জন্ম নোয়াখালী জেলায় ১ অক্টোবর ১৯২০ সালে। এই অর্থনীতিবিদের পূর্ণ নাম আবু নসর মুহম্মদ মাহমুদ। পৈতৃক নিবাস আজিমপুর, রামগঞ্জ, বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলা। পুলিশ অফিসার গোলাম রহমান তার পিতা। পুরান ঢাকার কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আইএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে বিএ অনার্স ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক নিযুক্ত হন। ১৯৫৭-৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তার গবেষণার বিষয় ছিল: Planning Through Decentralized Decision Making। ১৯৬২ সালে এরই অভিসন্দর্ভের জন্য পিএইচডি লাভ করেন। নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ওয়াসিলি লিয়ন টিয়েফ ছিলেন তার পিএইচডি সুপারভাইজার। একই বছর আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে যোগ দিয়ে রিডার পদে উন্নীত হন। অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত। ১৯৬৭ সালে তদানীন্তন আইউব-মোনেম সরকারের নির্যাতনের মুখে তিনি দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তার পর তিনি কুয়েতের আসরার ইনস্টিটিউট, লিবিয়ার গাদ্দাফি সরকারের জেনারেল ইকোনমিস্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে আসার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট তাকে অধ্যাপক পদে বরণ করে নেয়। ১৯৮১ সালের ৩০ জুন অবসর গ্রহণ করেন। আইউব খানের শাসনামলে (১৯৫৮-৬৯) পূর্ব পাকিস্তানকে অর্থনৈতিকভাবে শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রদর্শনী করে এই শোষণের চিত্র দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন। শোষণ বন্ধ করার লক্ষ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সপক্ষে তিনি তাত্ত্বিক এবং একজন সক্রিয়বাদী হিসেবে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। তিনি ১৯৮৮ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে, মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষা, উন্নয়ন উচ্ছ্বাস ও তৃতীয় বিশ্ব, Essays on Political Economy এবং অন্যান্য গ্রন্থ। তিনি হার্ভার্ড থেকে পিএইচডি করার পর জাতীয় দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় অনেক রাজনৈতিক অর্থনীতি-বিষয়ক গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ লিখেছেন। তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক অর্থনীতিবিদ। ইংরেজি ভাষার ওপর তার দখল ছিল ঈর্ষণীয়। পাঠদানে পটুতা এবং সম্মোহনী প্রকাশভঙ্গির জন্য তিনি খুব সহজেই শিক্ষার্থীদের মনে গভীর ছাপ ফেলতে পারতেন। এমন দার্শনিক অর্থনীতিবিদদের অভাব বাংলাদেশে এখন খুবই প্রকট।
প্রফেসর আবু মাহমুদ লোকান্তরিত—প্রতিবেশী দেশে থেকেও এ সংবাদটি আমি অনেক দেরিতে পেয়েছি। গত নভেম্বরের শেষ দিকে আফ্রো এশীয় গণসংহতি সম্মেলনে এসেছিলেন বাংলাদেশের বেশ কজন প্রতিনিধি। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সংবাদ সম্পাদক আহমেদুল কবির, ডা. সাইদুর রহমান, বাকশাল নেতা মোনায়েম সরকার, ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা হায়দার আকবর খান রনো এঁদের অন্যতম। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আমার বন্ধু ড. মুক্তাদার সঙ্গে টেলিফোন সংলাপে আমাকে স্মরণ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যেই আমি ২৮শে নভেম্বরে কণিস্ক হোটেলে যাই। তিনিই আমাকে জানালেন তাঁদের প্রতিনিধি দলে ওয়ার্কার্স পার্টি নেতা হায়দার আকবর খান রনোও রয়েছেন। রনো ভাই-এর সঙ্গে আমি যখন পেরোস্ত্রোইকা-গ্লাসনস্ট ও আমার বর্তমান গবেষণাসহ নানা প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করছিলাম, তারই প্রসঙ্গান্তরে এসে গেল বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ওয়াহিদুল হকের অর্থমন্ত্রী হিসেবে যোগদানের বিষয়টি। রনো ভাই জানতে চাইলেন, প্রফেসর ওয়াহিদুল হকের বিশ্ব ভাবনা কী? প্রত্যেক বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিত ব্যক্তির একটা বিশ্ব ভাবনা থাকবে— তা আশা করাটা অযৌক্তিক নয়। কথায় কথায় তিনি জানতে চাইলেন, ওয়াহিদুল হক সাহেবের চিন্তা-ভাবনা কি আবু মাহমুদের মতো? আলোচনা আর বেশি দূর না এগোতেই তিনি আমাকে বিনা মেঘে বজ্রাহত করে জানালেন, ‘জানো তো, ড. মাহমুদ মারা গেছেন।’ এই আমার প্রথম জানা আমাদের অনেকের প্রিয় শিক্ষক ড. আবু মাহমুদ আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন। এ যেন বড্ড অভিমান করে নিরুদ্দেশ হওয়া।
১৯৬৩ সনে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনার্স ক্লাসে ভর্তি হই। সে সময়টায় এই বিভাগটি উজ্জ্বল সব জ্যোতিষ্কের ছটায় জ্বল জ্বল করছিল। প্রফেসর নূরুল ইসলাম বিভাগীয় প্রধান ও প্রফেসর। তাছাড়া রয়েছেন ড. আবু মাহমুদ, আনিসুর রহমান, অধ্যাপক রেহমান সোবহান। কিছুদিনের মধ্যে আমেরিকা থেকে ফিরলেন ড. মুজাফফ্র আহমদ। এছাড়া আরো ছিলেন কতিপয় প্রতিভাবান তরুণ শিক্ষক। হাসনাত আব্দুল হাই, মহিউদ্দিন খান আলমগীর, মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ, মির্জা আজিজুল ইসলাম, সাদরুল আমিন লতিফুর রেজা ও মীর্জা মোজাম্মেল, ড. শাহজাহানসহ আরো অনেকে। এঁদের সকলেই ছিলেন নিজগুণে বিশিষ্ট।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম বর্ষে ড. আবু মাহমুদ আমাদের মাইক্রো ইকনোমিক থিওরি পড়াতেন। তাঁর লেকচারের কাঠামো কখনোই পাঠ্য-পুস্তকি ছকে আবদ্ধ থাকত না। থিওরি পড়াতে গিয়ে নিউক্লাসিকেল অর্থনীতির অসারত্ব ও এর এসামপশনগুলোর বাস্তবতা থেকে দূরত্ব সম্পর্কে আমাদের সচেতন করে তুলতে তিনি কখনো বিরত হতেন না। তিনি একটা কথা বারবার উচ্চারণ করতেন, তা হল, ‘You are to unlearn what you have learnt’ আমরা জানি প্রত্যেক শিক্ষা ব্যবস্থার মূলে থাকে একটি বিশ্বভাবনা। আমরা এককাল যা শিখেছি, তা যে নিছক বুর্জোয়া-সামন্ত মতাদর্শকে মগজে ও মনে গভীরভাবে প্রোথিত করবারই একটা প্রয়াস—একথাই তিনি বারবার আমাদের মনে করিয়ে দিতেন। জগত্ ও জীবনকে নতুন করে বুঝতে ও বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যে, জীর্ণ পুরাতন চিন্তা-ভাবনাগুলোকে মনের রাজ্য থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে হবে—সেটাই ছিল তাঁর মূল আবেদন। তাঁর ছাত্র হিসেবে আমরা তা কতটুকু করতে পেরেছি তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। তবে আমাদের মধ্যে তিনি যে একটি জিজ্ঞাসু মনের সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। তিনি প্রায়শই বলতেন, সন্দেহই হচ্ছে জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশের তথা সত্যানুসন্ধানের চাবিকাঠি। একথাটি তিনি বলতেন মনীষী ডেকার্টের বরাত দিয়ে। বস্তুত তাঁর প্রতিটি বক্তৃতাই ছিল দর্শন, অর্থনীতি শাস্ত্রের ইতিহাস ও ‘স্ট্যান্ডার্ড প্যারাডাইমে’র ক্রিটিকের একটি সমন্বয়। এ ধরনের লেকচার মাঝারি গোছের ছাত্রদের জন্য তেমন উপযোগী ছিল না—কারণ পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে এসব বক্তব্যের সমন্বয় সাধন দুরূহ হয়ে দাঁড়াত। ভালো ছাত্ররা লাইব্রেরিতে পড়াশুনা করে পাঠ্যপুস্তক থেকে যা কিছু জানবার তা জেনে নিত। ড. মাহমুদের বক্তৃতা ছিল তাদের জন্য উপরি পাওনা। তাই বলে তিনি যে পাঠ্য বিষয়গুলোর ওপর মোটেও নজর দিতেন না তা নয়। অর্থশাস্ত্রের বিষয়বস্তু, চাহিদা সূত্রের বিশ্লেষণ ও তার ব্যতিক্রম, স্থিতি-স্থাপকতার নানা সূচক স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যয় রেখার গঠন ও বৈশিষ্ট্য, পূর্ণ প্রতিযোগিতার বাজার, একচেটিয়া বাজার, প্রান্তিক উত্পাদিকা তত্ত্ব ও তার প্রয়োগ, খাজনা ও পুঁজির তত্ত্ব ইত্যাদি তিনি বিস্তারিতভাবেই পড়িয়েছিলেন। মার্ক্স, জোয়ান রবিনসন, কালেকি, মরিস ডব, মরিস কর্নকোর্থ, পল সুইজি, পল ব্যারান কিংবা রজনী দত্তের কথা সুযোগ পেলেই তিনি আলোচনা করতেন। পুঁজিবাদী বাজারের নৈরাজ্য ও ব্যর্থতার কথা আলোচনা করতে গিয়ে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির সাফল্যগুলোর কথা তুলে ধরতে ভুলতেন না তিনি। অনুন্নত বিশ্বের সমস্যা সমাধানে সমাজতন্ত্রের সার্থকতা সম্পর্কে আমাদের মনে যে প্রতীতি জন্মেছিল—তার অনেকাংশের জন্যই আমরা ড. মাহমুদের নিকট ঋণী। এ প্রসঙ্গে তিনি চীন ও ভারত সম্পর্কে তুলনামূলক আলোচনা করতেন। তত্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির পাঠ্যক্রম ছিল অত্যন্ত সেকেলে। রাজনৈতিক অর্থনীতি, মার্ক্সবাদী অর্থনীতি কিংবা তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নয়নের সমস্যার ওপর তেমন কিছুই পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। পাঠ্যক্রমের এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিষয়বস্তুর ওপর দখল থাকলে যে সবকিছুই শ্রেণীকক্ষের আলোচনার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক করে তোলা যায় ড. মাহমুদ তা অত্যন্ত সার্থকভাবে প্রমাণ করেছিলেন।
ড. মাহমুদ তাঁর চিন্তা-ভাবনাকে কেবলমাত্র শ্রেণীকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ রাখতে চাইতেন না। তিনি চাইতেন, বিশ্ববিদ্যালয় ও জনগণের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ রচনা হোক। প্রফেসর নুরুল ইসলাম পাকিস্তান ইন্সটিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট ইকনমিক্সের প্রধান হিসেবে করাচি চলে যাওয়ার পর ড. আবু মাহমুদ অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হন। বস্তুত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে আসার পর তিনি রিডার পদে উন্নীত হয়েছিলেন। বিভাগের দায়িত্ব হাতে নেবার পর কয়েক মাসের মধ্যে তিনি ও তার সুযোগ্য সহকর্মীরা বিভাগের উদ্যোগে একটি অর্থনৈতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। বিভাগের ছাত্ররা শত শত চার্ট ও ডায়াগ্রামের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির চিত্রটি জনগণের মধ্যে তুলে ধরেন। প্রদর্শনী চলাকালীন সময়ে প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শক ভিড় করতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনেক্স ভবনে। অর্থনীতি বিভাগ তখন এই সদ্যনির্মিত ভবনটিতেই ছিল। বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা নিষ্ঠার সঙ্গে নিজেরাই বিভিন্ন সরকারি সূত্র থেকে চার্ট ও ডায়াগ্রামের উপযোগী করে উপাত্ত প্রস্তুত করে নেন। অর্থনীতির মতো নিরস বিষয়ও যে জনমনে সাড়া জাগাতে পারে ও ব্যাপক জনগণকে কৌতূহলী করে তুলতে পারে ’৬৪ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগ আয়োজিত অর্থনৈতিক প্রদর্শনী তারই প্রমাণ।
প্রদর্শনীর পাশাপাশি সেমিনারেরও আয়োজন করা হয়েছিল। এই সেমিনারে ড. আবু মাহমুদ ও অধ্যাপক রেহমান সোবহানসহ আরো কয়েকজন পেপার পড়েছিলেন। পাকিস্তানের আঞ্চলিক বৈষম্যের আলোচনার পাশাপাশি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলার জন্য সমাজতন্ত্র যে অপরিহার্য—একথাই ছিল এসব প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। প্রদর্শনী ও সেমিনারে ব্যাপক দর্শক ও শ্রোতার সমাগম প্রমাণ করল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ এ দেশের জনচেতনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অপ্রিয় হলেও সত্য যে, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে অর্থনীতি বিভাগের এই ভূমিকা ক্রমান্বয়ে নিস্তেজ হয়ে আসে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রসেফর আনিসুর রহমানের উদ্যোগে সোস্যালিজম সেমিনার, গ্রাম উন্নয়ন উদ্যোগে ছাত্রদের অংশগ্রহণ ও ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের সময় ত্রাণ তত্পরতায় যোগদান করে নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় প্রভৃতি কর্মকাণ্ড বাদ দিলে দেশের ব্যাপক জনতার সংগে বিভাগের যোগসূত্র ক্রমান্বয়ে শিথিল হতে থাকে।
উল্লেখ্য যে, ড. আবু মাহমুদ অর্থনীতি বিভাগের প্রধান থাকাকালীন খ্যাতিমান ক্যামব্রিজ অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসন গণচীন সফর থেকে দেশে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। তিনি সেবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগে গণচীনের কমিউন ব্যবস্থার ওপর একটি বক্তৃতা দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল, চীনের কমিউন ব্যবস্থা সারা পৃথিবীর জন্য অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের সেরা দৃষ্টান্ত। জোয়ান রবিনসনের এই সফর আমার মতো অনেক ছাত্রকেই অনুপ্রাণিত করে। ড. আবু মাহমুদ আমাদের জোয়ান রবিনসনের লেখা ইকনমিক্স অব ইমপারফেক্ট কমপিটিশন, ইকনমিক ফিলসফি এবং এন ইনট্রোডাকশন টু মার্ক্সিয়ান ইকনমিক্স পড়তে অনুপ্রাণিত করেছিলেন। তাঁর মতে জোয়ান রবিনসনের ‘ইকনমিক্স অব ইমপারফেক্ট কমপিটিশন’ ও চেম্বারলেনের ‘মনোপলিসটিক কম্পিটিশন’ গ্রন্থ দুটো পশ্চিমা অর্থনীতি শাস্ত্রের জগতে এক বিরল ও ব্যতিক্রমী ধারা—সুতরাং অর্থনীতির সকল ছাত্রের জন্য গ্রন্থ দুটো অবশ্য পাঠ্য। বলতে গেলে আমাদের কালে অর্থনীতির ছাত্ররা এই বই দুটো অনেকটা আগাগোড়া পড়ে ফেলত। এগুলোর কতটা আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, পরিমাপ করা মুশকিল। কিন্তু মৌলিক গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত হতে ড. আবু মাহমুদের মতো শিক্ষকরা যথেষ্ট অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
হার্ভার্ড থেকে দেশে ফেরার পর ড. আবু মাহমুদ অর্থনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লিখতে শুরু করেন। বাংলা ভাষার ওপর দখল ছিল না বলে তাঁকে ইংরেজি মাধ্যম ব্যবহার করতে হত। তাঁর ইংরেজি ছিল অত্যন্ত কাব্যিক ও আলঙ্কারিক। ছিল একটা নিজস্ব প্রকাশভঙ্গি। পড়লেই বোঝা যেত এটা ড. আবু মাহমুদের লেখা। ষাটের দশকের শুরুতে সালাহ উদ্দীন মোহাম্মদ সম্পাদিত ঢাকা টাইমস পত্রিকায় অর্থনীতির নানা প্রসঙ্গে ড. আবু মাহমুদ নিয়মিত লিখতেন। সেকালে সাপ্তাহিক হলিডে আমাদের সাংবাদিকতায় এক ব্যতিক্রমী ধারার সৃষ্টি করে। ড. মাহমুদ সাপ্তাহিক হলিডের জন্য একাধিক শক্তিশালী প্রতিবেদন রচনা করেছেন। পাকিস্তানি অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা ও সাম্রাজ্যবাদী বিশেষ করে মার্কিন সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতার বিপদ সম্পর্কে তিনি পাঠকদের বারবার হুঁশিয়ার করেছেন। মানের দিক থেকে লেখাগুলো নিছক জনপ্রিয় কলাম রচনা ছিল না—যুক্তি ও তথ্যের ঋজুতা ও দৃঢ়তা ঐসব প্রতিবেদনগুলোকে সুগভীর একাডেমিক মান দান করেছিল। তত্কালীন পাকিস্তান অবজার্ভার পত্রিকায় ‘পলিটিক্যাল ইকনমি অব প্যাট্রোনেজেস’, ‘ম্যালথাস স্টেজেস এ কামব্যাক’ এবং ‘বাজেট অ্যান্ড দি পিপল’ শিরোনামে সিরিজ আকারে তিনি প্রবন্ধাবলি প্রকাশ করেছিলেন। আমার ধারণা এ প্রবন্ধগুলি আমাদের অর্থনীতি শাস্ত্রের গবেষণায় মৌলিক অবদান হিসেবে বিবেচিত হবার দাবি রাখে।
একজন বিদ্রোহী বুদ্ধিজীবী হিসেবে ড. আবু মাহমুদের ভূমিকা শাসকগোষ্ঠীকে ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর মান ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করার জন্য এক সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেয়া হয়। তত্কালীন প্রাদেশিক গভর্নর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর জনাব আব্দুল মোনায়েম খানের এ ব্যাপারে হাত ছিল বলে অনেকেই মনে করেন। এক পর্যায়ে উপাচার্য ড. এম ও গণির নেতৃত্বাধীন প্রশাসন ড. কে টি হোসেনকে ড. আবু মাহমুদের চাইতেও বেশি বেতন দিয়ে বিভাগের রিডার পদে নিয়োগ করেন। এতে ড. আবু মাহমুদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। তিনি এই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মুনসেফের আদালতে মামলা দায়ের করেন। বিচারপতি মুর্শেদের নেতৃত্বে গঠিত হাইকোর্টের এক বেঞ্চ ড. এম ও গণিসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ও ট্রেজারারকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন। রায়ে এদের ওপর বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড ও জরিমানা ধার্য করা হয়। অবশ্য এদেরকে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করার সুযোগ প্রদান করা হয়। রায়ের দিন ড. আবু মাহমুদ তার ফিয়াট গাড়িটি নিয়ে হাইকোর্টে আসেন। হাইকোর্টের রায় ঘোষণার অব্যবহিত পরেই ড. আবু মাহমুদ নিজে গাড়ি চালিয়ে ফুলার রোডের বাস ভবনের দিকে রওয়ানা হন। গন্তব্যস্থলে পৌঁছে গাড়ি গ্যারেজে রাখার সময় তিনি কুখ্যাত এনএসএফ গুণ্ডা পাচপাত্তু, খোকা আলতাফ, জাহাঙ্গীর ফয়েজ ও অন্যান্যের আক্রমণের শিকার হন। গুণ্ডারা তাকে মশারির স্ট্যান্ড ও অন্যান্য মারাত্মক অস্ত্র দিয়ে বেদমভাবে প্রহার ও জখম করে। মশারির স্ট্যান্ডে গাঁথা পেরেক ঠুকে তাঁর সর্বাঙ্গ জর্জরিত করা হয়। তিনি তাঁর গরম কোটটি দিয়ে কোনোক্রমে মাথাকে আঘাত থেকে বাঁচান। চিত্কার শুনে পার্শ্ববর্তী সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্র ও অন্য শিক্ষকরা ছুটে আসেন। দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী প্রচণ্ড উত্তেজনা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। ড. ওসমান গণির পদত্যাগের দাবিতে ছাত্রসমাজ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সরকারপন্থী ছাত্র সংগঠন এনএসএফের সঙ্গে ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে উত্তেজিত ছাত্ররা ড. এম ও গণির বাসভবনে হামলা চালায়। ড. আবু মাহমুদ চিকিত্সার জন্য বিশ দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে থাকেন। বিশ দিনের মাথায় তাকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ করা হয়। কারণ কোনো জখম ও আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে ২১ দিন চিকিত্সা করানো হলে তা আইনের দৃষ্টিতে হত্যাপ্রচেষ্টার শামিল বলে গণ্য হয়। উপরের মহলের চাপে অপরাধীদের অপরাধ লঘু প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে বিশ দিনের মাথায় হাসপাতাল থেকে রিলিজ করে দেন।
ড. মাহমুদের ওপর হামলাকারীদের বিচার হয়নি। বিচার তো হবার কথাও নয়। যারা হামলা করেছিল তাদের পেছনে ছিল সর্বোচ্চ মহলের উসকানি ও আশীর্বাদ। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম, সে নিজস্ব রীতিতে তার বিচার করেছে। পাচপাত্তু ১৯৬৮ সালে নিহত হয়। আর ১৯৭০ এর কেনো এক সময়ে মাহবুব সাত্তার খোকার লাশ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পড়ে থাকতে দেখা যায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় গভর্নর মোনায়েম খান মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত হন।
ড. আবু মাহমুদ বনাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এই মামলা পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ালেও শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ড. ওসমান গণি ও অন্যরা দণ্ড থেকে মওকুফ পান। তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট আইউব খানের সরাসরি হস্তক্ষেপে সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায় খারিজ করে দেয়। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলির ঢাকা অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টো ঢাকায় আসেন। সে সময় বুড়িগঙ্গায় এক নৌবিহারে ভুট্টো ড. আবু মাহমুদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। নৌবিহারে আলাপের সময় ভুট্টো ড. আবু মাহমুদকে আইউব খানের এই হস্তক্ষেপের কথা জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকা দুঃসহ হবে মনে করে ড. আবু মাহমুদ ১৯৬৬-এর শেষ দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রিডার পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি ব্যাংককে ইকাফের এক চাকরিতে যোগদান করেন। বেশ ক’বছর ইকাফেতে কাজ করার পর তিনি কুয়েতের আরব ইনস্টিটিউটে কিছু কাল কাজ করেন। সেখান থেকে তিনি লিবিয়ার গাদ্দাফি সরকারের জেনারেল ইকনমিস্ট পদে যোগদান করেন। সেখানে কয়েক বছর কাজ করার পর ১৯৭৬ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন। একটানা দশ বছর প্রবাস জীবন যাপনের পর তার দেশে প্রত্যাবর্তন।
দেশের প্রত্যাবর্তনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট তাঁকে এক সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে প্রফেসরের বিশেষ পদ প্রদান করেন। অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি এই পদেই বহাল থাকেন। দেশে ফেরার পর তিনি বামতত্ত্বের ওপর গবেষণায় হাত দেন। এন এপ্রোচ টু সোস্যাল রিয়ালিটি শিরোনামে একটি বিশাল প্রবন্ধ রচনা করেন। এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেন্টার ফর সোস্যাল স্টাডিজ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। এ সময়টা তিনি গভীর অধ্যয়ন ও গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার ও বি আই ডি এস গ্রন্থাগারে প্রতি দিনই তিনি দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা করতেন। তাঁর এই গবেষণাধর্মী অধ্যয়নের উদ্দেশ্য ছিল মার্ক্সবাদের ওপর একটি বিশাল গ্রন্থ রচনা। তিনি জেদ ধরে ছিলেন, কাজটা তিনি বাংলা ভাষাতেই করবেন। তাই পাশাপাশি বাংলা ভাষার চর্চাও চলল। দীর্ঘ কয়েক বছরের সাধনায় তিনি রচনা করলেন মার্ক্সীয় বিশ্ববীক্ষা (৫ খণ্ডে)। রচনা করলেন আরো একটি গ্রন্থ, যার শিরোনাম ‘উন্নয়ন উচ্ছ্বাস ও তৃতীয় বিশ্ব’। এ ছাড়া তিনি ধর্মের ওপরও একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। একই সময়ে তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ, বাংলাদেশে অর্থনীতি সমিতির সেমিনার, বিআইডিএস-এর বিভিন্ন সেমিনার ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগ থেকে প্রকাশিত জার্নালের জন্য বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন। পাকিস্তান আমলে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধাবলির একটি সংকলন ‘এসেজ অন্য পলিটিক্যাল ইকনমি’ শিরোনামে তাঁরই সুযোগ্য ছাত্র এস জীশান হোসেন গ্রন্থনা করেছিলেন। এই পাণ্ডুলিপিটি ছাপা হয়ে যখন বাঁধাইর অপেক্ষা করছিল, তখনই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের জনগণের ওপর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করতে শুরু করে। এই গ্রন্থটির ১০/১২ কপি বাঁধাই অবস্থায় কারো কারো হাতে যায়। আমার জানামতে বিআইডিএস গ্রন্থাগারে এর একটি কপি রয়েছে।
জার্মানির জনগণের মুক্তি সংগ্রাম প্রসঙ্গে মাক্স লিখেছিলেন,
&dquote;We must make the actual opperssion even more opperssive by making people consious of it, and the insult even more insulting by publicizing it... we must force these petrified relationships by playing its own tune to them. To Give people courage we must teach them to be alarmed by themselves.&dquote;
ড. আবু মাহমুদ আজীবন আমাদের একথাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, আমাদের ওপর তথা বাংলাদেশের জনগণের ওপর কী ভয়ানক নিপীড়ন চলছে। নিপীড়নের এই বোধই তো নিপীড়নকে আরো অসহনীয় করে তোলে। অবমাননার এই অনুভূতিই তো অপমানকে বিদ্রোহে রূপান্তরিত করে। ড. আবু মাহমুদ অমর হবেন তাঁর এই নীতিনিষ্ঠ ভূমিকার জন্যই।
লেখক: সাবেক অধ্যাপক, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়






