সমগ্র বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুপঠিত কবিদের একজন জসীমউদ্দীন। তাঁর ‘কবর’ নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’র পরে সবচেয়ে বেশি পঠিত কবিতা। পূর্ব বাংলার গ্রামীণ জীবনের রূপকার হিসেবে তিনি ‘পল্লীকবি’ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন, যদিও ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন একজন উচ্চশিক্ষিত আধুনিক মানুষ।

রবীন্দ্রযুগের কবি হয়েও জসীমউদ্দীন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য এবং তা পেরেছিলেন অত্যন্ত সার্থকভাবে। জসীমউদ্দীন হতে পারতেন বাংলা সাহিত্যের আর একজন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত, মোহিতলাল মজুমদার বা যতীন্দ্রমোহন বাগচী। কুড়ি বছর বয়সে বাংলা ভাষার সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন সাহিত্যপত্র প্রবাসীর মার্চ ১৯২২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর যে কবিতাটি, তার প্রথম পঙিক্ত ছিল এ রকম: দিক হারারে এমন করে/ যে জন কাঁদায় বারে বারে,

সেকালের অতি প্রচলিত ধারার পদ্য। কার লেখা তা বোঝার উপায় নেই। হতে পারে রবীন্দ্রনাথ বা নজরুলেরই কোনো গানের বা কবিতার পঙিক্ত। এই ধরনের প্রথাগত কবিতা লিখে জসীমউদ্দীনের কোনো তৃপ্তি ছিল না। লোকে হয়তো প্রশংসা করত। সে প্রশংসায় তিনি খুশি হতেন না। অবিলম্বে তিনি বুঝতে পারেন এ কবিতা তাঁর ‘নিজের’ কবিতা নয়, এ ভাষাও তাঁর নিজের ভাষা নয়— এ কবিতা রবীন্দ্রযুগের বাংলা গীতিকবিতা। এ কবিতায় জসীমউদ্দীন কোথায়? প্রবল আত্মবিশ্বাস থেকে তাই তিনি অবিলম্বে হয়ে ওঠেন জসীমউদ্দীন।

জসীমউদ্দীনের সমসাময়িক কল্লোল-যুগের কবি ও কথাশিল্পী অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর স্মৃতিচারণে লিখেছেন:

“একেবারে সাদামাটা আত্মভোলা ছেলে এই জসীমউদ্দীন। চুলে চিরুনি নেই, জামায় বোতাম নেই, বেশবাসে বিন্যাস নেই। হয়তো বা অভাবের চেয়েও ঔদাসীন্যই বেশি। সরল শ্যামলের প্রতিমূর্তি যে গ্রাম, তারই পরিবেশ তার ব্যক্তিত্বে, তার উপস্থিতিতে। কবিতায় জসীমউদ্দীনই প্রথম গ্রামের দিকে সংকেত, তার চাষাভুষো, তার খেত-খামার, তার নদী-নালার দিকে। তার অসাধারণ সাধারণতার দিকে। যে দুঃখ সর্বহারার হয়েও সর্বময়। যে দৃশ্য অপজাতের হয়েও উঁচু জাতের। কোনো কারুকলার কৃত্রিমতা নেই, নেই কোনো প্রসাধনের পারিপাট্য। একেবারে সোজাসুজি মর্মস্পর্শ করবার আকুলতা। কোনো ‘ইজমের’ ছাঁচে ঢালাই করা নয় বলে তার কবিতা হয়তো জনতোষিণী নয়, কিন্তু মনোতোষিণী।”

যে যুগে, সেই ঊনিশ শ বিশের দশকে, বাংলা ভাষার সব হয় রবীন্দ্রনাথ অথবা নজরুলের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, সেই সময় এই দুই ধারার বাইরে জসীমউদ্দীন তাঁর নিজের পথ নিজের নিজেই বেছে নেন। তাঁর ‘কবর’ কল্লোল পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বাংলা কবিতার পাঠকসমাজ তাঁকে তত্ক্ষণাৎ অভিনন্দিত করে। শুধু সাধারণ পাঠকসমাজ নয়, সুধী ও বিদ্বত্সমাজও। ‘কবর’ সম্পর্কে অচিন্ত্য সেনগুপ্ত লিখেছেন, “বাংলা কবিতার নতুন দিকদর্শন। ‘কল্লোলের’ পৃষ্ঠা থেকে সেই কবিতা কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষার বাংলা পাঠ-সংগ্রহে উদ্ধৃত হলো।” কবিতাটি যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্য করে, তখন তিনি বিএ পাস করেননি। কবিতাটি পাঠ করে দীনেশচন্দ্র সেন জসীমউদ্দীনকে লিখেছিলেন, ‘দূরাগত রাখালের বংশী ধ্বনির মত তোমার কবিতা পড়ে আমি কেঁদেছি।’

জসীমউদ্দীনের জন্ম ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১ জানুয়ারি ১৯০৩। তাঁর পৈতৃক নিবাস ফরিদপুর শহরের পার্শ্ববর্তী অম্বিকাপুর গ্রামে। তাঁর বাবার নাম আনসার উদ্দীন মোল্লা। তিনি ছিলেন একজন অবস্থাপন্ন মানুষ। কবির মায়ের নাম মোসাম্মৎ আমেনা খাতুন।

১৯২১ সালে জসীমউদ্দীন ফরিদপুর জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। তখন মহাত্মা গান্ধী ও মওলানা মোহাম্মদ আলী, মওলানা শওকত আলীর অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলন তুঙ্গে। সে আন্দোলনে তিনিও ঝাঁপিয়ে পড়েন। গান্ধীর আদর্শে হাতে বোনা সুতায় তৈরি খদ্দরের কাপড় পরতেন, স্বদেশী রাজনৈতিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে তাঁর পড়াশোনার ক্ষতি হয়। ১৯২৪ সালে রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএ পাস করেন।

কাব্যচর্চা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জসীম উদ্দীনের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখার ক্ষতি হয় এবং ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে তিনি বিএ পাস করেন ১৯২৯ সালে। তখন তিনি বাংলা সাহিত্যের একজন প্রতিষ্ঠিত কবি। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ রাখালী প্রকাশিত হয় ১৯২৭-এ।

তত দিনে জসীমউদ্দীন স্নেহের পাত্রে পরিণত হন রবীন্দ্রনাথ, দীনেশচন্দ্র সেন, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নজরুল ইসলামের। নজরুল ছিলেন পরম গুণগ্রাহী। প্রথম থেকেই জসীমউদ্দীন তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। নিজে ছিলেন বিদ্রোহী, জসীমউদ্দীন ছিলেন তাঁর বিপরীত। তা সত্ত্বেও নজরুল জসীমউদ্দীনের কবি-প্রতিভার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন। সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন: ‘সে সময়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম সওগাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। নজরুল ইসলাম জসীমউদদ্ীনের পল্লীগাথাগুলি খুব পছন্দ করতেন এবং তাঁর ভেতর যে যথেষ্ট প্রতিভা আছে, তা বলে বেড়াতেন।’

১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় জসীমউদ্দীনের নকশী কাঁথার মাঠ— দু’টি গ্রাম্য তরুণ-তরুণীর জীবনের কাহিনী অবলম্বনে এক ‘সাহিত্যিক গীতিকা’। বাংলা সাহিত্যে এটি ছিল এক অভিনব সংযোজন। ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন: ‘জসীম উদ্দীনের কবিতার ভাব-ভাষা ও রস সম্পূর্ণ নূতন ধরনের। প্রকৃত কবির হূদয় এই লেখকের আছে। অতি সহজে যাঁদের লিখবার ক্ষমতা নেই, এমনতর খাঁটি জিনিস তাঁরা কখনই লিখতে পারেন না। ’

জসীমউদ্দীন ছিলেন বহুমুখী প্রতিভা। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় রয়েছে তাঁর কাজ। তাঁর সাহিত্যকর্মকে কয়েকটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। ব্যালাড বা কাহিনীকাব্যের মধ্যে নকশী কাঁথার মাঠ এবং সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৩) ছাড়া রয়েছে সকিনা (১৯৫৯), মা যে জননী কান্দে (১৯৬৩) প্রভৃতি। খণ্ড কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে রাখালী, বালুচর (১৯৩০), ধানখেত (১৯৩৩), হাসু (১৯৩৩), রূপবতী (১৯৪৬), এক পয়সার বাঁশি (১৯৪৯), মাটির কান্না (১৯৫১), হলুদ বরণী (১৯৬৬), জলের লেখন (১৯৬৯), ভয়াবহ সেই দিনগুলিতে (১৯৭২) প্রভৃতি।

জসীমউদ্দীন ছিলেন একজন জনপ্রিয় গীতিকার। তাঁর গানও নিজস্বচিহ্নিত, রবীন্দ্রসংগীত ও নজরুল সংগীতের চেয়ে একেবারেই আলাদা— ভাব, ভাষা ও সুরে। তাঁর গীতিসংকলনের মধ্যে রয়েছে রঙিন নায়ের মাঝি (১৯৩৫), পদ্মাপার (১৯৫০), গাঙের পার (১৯৫৪) প্রভৃতি। কর্মজীবনে জসীমউদ্দীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ সহকারী’ হিসেবে কাজ করেছেন তিরিশের দশকে। তিরিশের শেষের দিকে এবং চল্লিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রচার বিভাগেও কাজ করেন।

জসীমউদ্দীনের কাব্যনাটকগুলোও ছিল একসময় খুবই জনপ্রিয়। কাব্যনাট্যের মধ্যে রয়েছে— বেদের মেয়ে (১৯৫১), মধুমালা (১৯৫১), পল্লীবধূ (১৯৫৬), গ্রামের মায়া (১৯৫৯) প্রভৃতি। জসীমউদ্দীনের গদ্যও অসামান্য। তাঁর ভ্রমণকাহিনী চলে মুসাফির (১৯৫৭), জার্মানীর শহরে বন্দরে (১৯৭৬) এবং উপন্যাস বোবা কাহিনী (১৯৬৪), আত্মজীবনী জীবন কথা (১৯৬৪) প্রভৃতি বাংলা সাহিত্যের স্থায়ী সম্পদ।

জসীমউদ্দীন সামাজিক-রাজনৈতিক দায়িত্বও পালন করেছেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বাংলা ভাষার পক্ষে তাঁর ভূমিকা ছিল বলিষ্ঠ। ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তিনি ছিলেন অবিচল সমর্থক। রবীন্দ্রনাথের গান ও বেতার-টেলিভিশনে প্রচারের নিষেধাজ্ঞার যাঁরা প্রতিবাদ করেন, তিনি ছিলেন তাঁদের প্রথম সারিতে। মুক্তিযুদ্ধের সময় বেনামে কবিতা লিখে দেশের বাইরে পাঠান। তাঁর বহু কাব্যগ্রন্থ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে তিনি বাঙালির লোকসংস্কৃতি সম্পর্কে বক্তৃতা দেন। ১৯৬৮তে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘ডক্টর অব লিটারেচার’ উপাধি দেয়। জীবনের শেষ দিকে তিনি ক্রমাগত স’রে গিয়েছিলেন নগরবাসীর আধুনিক পাঠকদের কাছ থেকে। এসব পাঠকের সঙ্গে তাঁর এই দূরত্ব তাঁর নিজের মতো আর কেউ উপলব্ধি করেননি। তরুণ কবিদের তাঁর সম্পর্কে কোনো আগ্রহ ছিল না, তাঁরা মনে করতেন তাঁর কাছে থেকে তাঁদের পাঠ নেয়ার বা শেখার কিছুই নেই; পক্ষান্তরে তরুণদের লেখা সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ভালো ছিল না। বস্তুত তিনি তাঁদের সম্পর্কে হতাশই ছিলেন। এভাবে উত্তর পুরুষদের সঙ্গে কবির যে অনাত্মীয়তা সৃষ্টি হয়, তাতে তরুণ কবিরা অন্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাঁরা অন্তত নিঃসঙ্গ বোধ করেননি, কিন্তু নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন জসীমউদ্দীন।

তবে সাধারণ মানুষের দরদি এ কবি আক্ষরিক অর্থে কখনই নিঃসঙ্গ ছিলেন না, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নানা ধরনের মানুষ এবং পল্লীগায়ক ও লোকশিল্পীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন, তিনি তাঁদের পরম আদরে গ্রহণ করতেন, বিদেশী গুণীজনদের সঙ্গেও তাঁর চিঠিপত্রে ও ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ অক্ষুণ্ন ছিল। শেষ দিকে মাঝে মাঝেই তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অনেক দিন থাকতেন, সেখানে তাঁর কক্ষে নানা ধরনের লোকের ছিল বিরতিহীন আনোগোনা, কিন্তু দু-একজন বাদে এ কালের কবি-সাহিত্যিকদের কেউ তাঁর খোঁজখবর রাখার প্রয়োজন বোধ করেননি।

এজন্য এক ধরনের অভিমানের কাঁটা যে তাঁর বুকে বিঁধত না তা নয়। আধুনিক বাংলা কবিতা সম্পর্কে তিনি একেবারেই সহানুভূতিশীল ছিলেন না। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে কলকাতার সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় এক সাক্ষাত্কারে জসীমউদ্দীন বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে কবিতার চেয়ে গদ্য সাহিত্যের উন্নতি হয়েছে।’—এ বক্তব্যের গভীর তাত্পর্য রয়েছে।

১৯৭৬ সালের ১৪ মার্চ সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এ কালজয়ী কবির জীবনাবসান ঘটে।

 

লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও কলামিস্ট