‘তোমাদের উঠোনে কি বৃষ্টি নামে? রেলগাড়ি থামে?/মন-গড়া বৃষ্টি নিয়ে মন-গড়া ট্রেন/মন-গড়া রেললাইন ছেড়ে দিয়ে ঝিকঝিক খোয়ার বহর নিয়ে থামে এসে/তোমার ঘুমের মশারির কাছে? বালিশের পাহাড়ের কাছে?/ঘাসের কাছের কোনো এক ইস্টিশনে?/ঘাসের হাতের কাছে অচিরাৎ তুমিও বসে পড়ো/ঘাসের ফুলের মতো অতিসাধারণ কোনো প্যাসেঞ্জার হয়ে এককোণে/বসে থাকো কুয়াশায়? ধুলোর কাঁকরও/পায়ের চপ্পলসহ পায়চারি রেখে বসে পড়ে,/নিমের গাছের নিচে হাঁটুমুড়ে বসে থাকে শীত—/হাঁফ ছাড়ে গাড়ির মতন?’

না! কবি আবিদ আজাদের এ কবিতার মতো ‘মন-গড়া ট্রেন’ নয়! এখন আমাদের রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রের স্টপেজগুলোতে মেট্রোরেল থামবে। ‘হাঁটুমুড়ে বসে থাকা শীতে’র মধ্যেই মেট্রোরেলের হুইসেল বাজবে আজ। হবে আংশিক উদ্বোধন। কত রূপে কত শতবার চেহারা বদলেছে প্রিয় নগরী ঢাকার। ৪০০ বছরের পুরনো এ শহর ইতিহাসের পাতায় নানাভাবে ও ব্যঞ্জনায় স্থান পেয়েছে। ইতিহাস-ঐতিহ্য, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, উত্তাল সংগ্রাম কিংবা স্বৈরশাসনের নীরব সাক্ষী ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর থেকে ঢাকা, মীর জুমলার ঢাকা গেট, শায়েস্তা খাঁর ছোট কাটরা, শাহ সুজার বড় কাটরা থেকে হোসেনি দালান, লালবাগ দুর্গ, ঢাকা কলেজ, ঢাকা ক্লাব, কার্জন হল কিংবা গভর্নর হাউজ থেকে বঙ্গবভবন—নামগুলোই একেকটা স্বকীয় সত্তা। এসব অমর কীর্তির সঙ্গে আরো এক নতুন সংযোজন মেট্রোরেল! মসজিদের শহর কিংবা রিকশার শহর এখন মেট্রোরেলের শহর হিসেবেও খ্যাত হবে। যানজট কিংবা কর্মঘণ্টা নষ্টের শহরের বদনাম কিছুটা হয়তো ঘুচবে!

মানুষ স্বভাবজাতভাবেই পুরনোকে আঁকড়ে থাকতে চায়। নতুন কোনো কিছু গ্রহণে তার বড় অনীহা। ব্যতিক্রম যে নেই তাও নয়! বড় বড় পরিবর্তন ব্যতিক্রমের হাত ধরেই হয়। ইট-পাথরের নগরে মেট্রোরেলের মহাকর্মযজ্ঞ ২০১৬ সালের ২৬ জুন উদ্বোধন হয়। ২০১৭ সালে মেট্রোরেলের রুট ধরে নগরীর ব্যস্ততম প্রধান সড়কগুলোর ‘ওপেন হার্ট সার্জারি’ (খোঁড়াখুঁড়ি) শুরু হয়। রুট এগিয়ে নিতে কখনো ফুটপাত কিংবা পার্ক-উদ্যানের একাংশের ভেতরেও চলে ‘অস্ত্রোপচার’। সড়কের মাঝখানে নির্মাণকর্ম নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে গড়া হয় ব্যারিকেড। আয়তন কমে যাতায়াতের সড়ক হয়ে যায় সরু। হলুদ হেলমেট পরা কর্মকর্তা-নির্মাণ শ্রমিকের ব্যস্ততায় ধূলিধূসর রাজধানী যেন পরিত্যক্ত নগরীর তালিকায় চলে যায়! নির্মাণকাজের তোড়ে কোথাও কোথাও সর্বোচ্চ সতর্কতা না থাকায় নগরবাসীর নাভিশ্বাস ওঠে! বায়ুদূষণের তালিকায় ঢাকা অন্য নানা কারণেও বিভিন্ন সময়ে শীর্ষে উঠেছে। কিন্তু ২০১৭-২১ পর্যন্ত সময়ে যখনই দূষণ তালিকায় ঢাকার নাম উঠেছে, সব দোষ যেন নন্দ ঘোষের (মেট্রোরেলের খোঁড়াখুঁড়ি)! মেট্রোরেলের ধুলাবালির আধিপত্যে নগরবাসীর ত্রাহি দশার সেই সময়টা এখন শেষ হয়েছে।

মিরপুরের পল্লবী থেকে আগারগাঁও হয়ে উড়ালপথে আরেকটু এগোলে জাতীয় সংসদ ভবনের চৌহদ্দিতে খেজুর বাগান—একরাশ সবুজের হাতছানি! এ সবুজের বুক চিরে সগর্বে মেট্রোরেলের ধূসর বাঁক দিনে দিনে চোখে সয়ে যাচ্ছে নগরবাসীর! পাখির চোখে এখন দৃষ্টিনন্দন ফার্মগেটের আনোয়ারা উদ্যানের মেট্রো স্টেশন। আগে এখানে শীতের সকালে ব্যায়ামের জন্য হাঁটাহাঁটি করত মানুষ, এখন এ মেট্রো স্টেশন থেকে ঢাকার নানা প্রান্তে স্বল্প সময়ের গন্তব্যে ছুটবে মানুষ। কারওয়ান বাজারের যানজট আর রাজ্যের ব্যস্ততাকে পাশ কাটিয়ে সোজা বাংলামোটর-শাহবাগ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিকে ছুঁয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে যাওয়া উড়ালপথটা জাতীয় স্থাপনার স্মারকে রূপ নিয়েছে। আশপাশের সুউচ্চ ভবন থেকে চোখ মেললেই ভিন্নরূপে মুগ্ধতা ছড়ায় এঁকেবেঁকে যাওয়া মেট্রোরেল! এমনিভাবে রাজধানীর নানা প্রান্তের বুক চিরে বয়ে যাওয়া মেট্রোরেলের শুরুর দিকের যে অশান্তি, কিছুটা নাগরিক যন্ত্রণা, তা এখন অনেকটাই প্রশান্তিতে রূপ নিয়েছে। মেট্রোরেলকেন্দ্রিক খোঁড়াখুঁড়ি কিংবা ধুলার রাজত্বে এখন ফিরেছে শৃঙ্খলা, ফিরছে সবুজ। মেট্রোরেলের নিচের অংশে এক পিয়ার থেকে আরেক পিয়ার পর্যন্ত কিংবা পরিস্থিতি বুঝে নিরাপত্তা রেলিং দেয়া হয়েছে, যেগুলোর মাঝে লাগানো হচ্ছে সৌন্দর্যবর্ধক গাছ। তাই দিন যত যাচ্ছে নগরবাসীর কাছে আপন হয়ে উঠছে মেট্রোরেলের প্রতিটি পিয়ার কিংবা তার প্রলম্বিত ছায়া। উত্তরা-আগারগাঁও-মতিঝিলের ব্যস্ততাকে আরেকটু বাড়িয়ে দেবে এ ট্রেনের হুইসেল!

একসময় রাজধানীর প্রধান গণপরিবহন ছিল ‘মুড়ির টিন ৬ নম্বর বাস’। এ বাসের হাতলে ঝুলে গন্তব্যে পৌঁছা কিংবা পকেটমারের দৌরাত্ম্যে সব হারানোর কষ্টকথা ভুলতে বসেছে নগরবাসী। ৬ নম্বর বাস ও এর রুট কমতে কমতে এখন কোমায় যাওয়ার উপক্রম। যদিও সময়ের পরিক্রমায় এসেছে নতুন নতুন রুট ও নামের বাহারি যানবাহন। বিআরটিসির দ্বিতল বাসও গণপরিবহন সংকট দূর করতে সে রকম ভূমিকা রাখতে পারেনি, এখনো পারছে না। ‘গেটলক’; ‘সিটিং’ কিংবা ‘লোকাল’ সার্ভিসের পর ‘ওয়েবিল’ এসে জীবনযাত্রায় গতি বাড়িয়েছে, কিন্তু কমেনি দুর্গতি। জনসংখ্যার তুলনায় যানবাহন না বাড়ার কারণে পিক আওয়ারে এখনো পরিবহন সংকটে ভোগেন কর্মজীবীরা। আবার সড়ক অব্যবস্থাপনা, যেখানে সেখানে পার্কিং, সিটি করপোরেশন-ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থার অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ির মধ্যে অসহনীয় যানজটের কারণে দৈনিক ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক ক্ষতি বছরে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। আরো প্রায় দুই বছর আগে ‘দ্য ফিউচার প্ল্যানিং আরবান ট্রান্সপোর্টেশন ইন ঢাকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে এ গবেষণা তথ্য প্রকাশ করা হয় (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০)। বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর্মঘণ্টা নষ্টের হার কমেছে এমন দাবি করার সময় এখনো আসেনি। কারণ ট্রাফিক আইন না মানা, স্থান-কাল-পাত্র না ভেবে রাস্তা পারাপার, যেখানে সেখানে গাড়ি পার্কিং, নির্ধারিত গতিতে গাড়ি না চালানো যেমন কমেনি, তেমনি রাজধানীমুখী মানুষের চাপ প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এর কারণ আইন-আদালত, সরকারি-বেসরকারি অফিস, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, করপোরেশন, ব্যাংক-বীমার কেন্দ্রীয় অফিস, উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প কল-কারখানার অধিকাংশই রাজধানীতে। বিভিন্ন ধরনের এসব সেবা ঢাকায় কেন্দ্রীভূত হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়েই এ মহানগরে আসছে। এসব সেবার বিকেন্দ্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি চলবে। যদিও পথেঘাটেই হারিয়ে যাচ্ছে নগরবাসীর গুরুত্বপূর্ণ অনেক অনেক সময়।

রাজধানীতে চলাচলে সময় বাঁচানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে মেট্রোরেল। ঢাকায় এক যুগ আগে যানবাহনের ঘণ্টায় গতিবেগ ছিল ২১ কিলোমিটার। যানজটসহ নানা কারণে বর্তমানে মানুষের হাঁটার গতির কাছাকাছি অবস্থান করছে যানবাহনের গতি, যা ঘণ্টায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। মেট্রোরেল যাত্রায় নগরবাসী কয়েক মিনিটে কয়েক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে পারবে। উত্তরা থেকে মতিঝিল যেতে সময় লাগবে মাত্র ৩৮ মিনিট। এর পরও সমস্যার সমাধান মেট্রোরেলে সম্ভব নয়—এমনটাই মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকদেরও কেউ কেউ। ২৪ ডিসেম্বর এক অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেছেন, যোগাযোগের ক্ষেত্রে যখন নতুন কোনো সুযোগের সৃষ্টি হয়, আমাদের যে বর্তমান অবস্থা তার থেকে একটু উত্তরণ ঘটে। সমাধান নাও হতে পারে। কারণ সুযোগ বাড়ায় নতুন আরো অনেক লোক আসবে, ট্রাফিক বাড়বে। এটা চিরন্তন, নতুন কিছু নয়। এ মেট্রোরেলই সমস্যার সমাধান করে দেবে এটা আশা করা ঠিক নয়। আপাতত একটু স্বস্তির সুযোগ হবে।

হ্যাঁ স্বস্তিটা নগরজীবনে বড় জরুরি। মেট্রোরেল এ স্বস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে। মেট্রো প্লাটফর্ম ও ট্রেনে টয়লেট, লিফট ও অগ্রাধিকার আসন যাত্রীরা সহজেই বুঝতে পারবে। এজন্য শনাক্তকারী চিহ্ন থাকবে। মেট্রোরেলের ভেতরে ও স্টেশন এলাকায় থাকবে অডিও-ভিজুয়াল তথ্যের ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে সাধারণ যাত্রী ছাড়াও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যাত্রী সহজে যাতায়াত করতে পারবে। সহজে মেট্রোরেলে ওঠানামার জন্য কোচের বাইরের অংশ ও প্লাটফর্মের মধ্যে যথেষ্ট ফাঁকা জায়গা রাখা হয়েছে। এছাড়া হুইল চেয়ার ব্যবহারকারী ও খাটো যাত্রীদের জন্য রয়েছে অপেক্ষাকৃত কম উচ্চতার টিকেট বুথ। লিফটে ওঠানামার ক্ষেত্রে সাধারণ যাত্রী ছাড়াও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের সুবিধা দিতে হাতল, নিম্ন উচ্চতার কন্ট্রোল প্যানেলসহ নানা সুযোগ রাখা হয়েছে। এমনকি অন্ধ যাত্রীরা ব্রেইল পদ্ধতিতে নির্দেশনা মেনে ব্লাইন্ড স্টিক ব্যবহার করে সহজে যাতায়াত করতে পারবে। বিশেষ পরিস্থিতিতে মেট্রোরেলের বাইরে বের হওয়ার জন্য জরুরি বহির্গমন দরজাও রয়েছে। এসব সুযোগ-সুবিধা ঠিকঠাক চললে এবং যত্নসহকারে ব্যবহারে নগরবাসী স্বস্তি যেমন পাবে, তেমনি সময়ও বাঁচাতে পারবে।

‘জননী-জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী’—জননী ও জন্মভূমি স্বর্গের চেয়ে দামি। ঢাকা তার সব নাগরিকের জন্মভূমি না হলেও লালন-পালন ও ধারণে জন্মভূমির চেয়ে কম নয়। ভালো-মন্দ সব সন্তানই যেমন ঠাঁই পায় মায়ের বুকে তেমনি ঢাকাও তার কোনো সন্তানকে ফেলে না। সন্তানদেরও উচিত ‘জননী ঢাকা’-কে স্বর্গের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া। এ নগরের অনেক কিছুই অযত্ন-অবহেলা-অব্যবস্থাপনায় নষ্ট হয়। মেট্রোরেল তেমন পরিস্থিতিতে না পড়লেই নগরবাসী সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। প্রিয় ঢাকার পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষা হলেই এর নাগরিকরা সবচেয়ে বেশি ভালো থাকবে।

কবির সৃষ্টি যেকোনো কবিতাই তার কাছে সন্তানের মতো। একেকটা কবিতা লেখার পেছনে কবির পরিশ্রম-মেধা ও চিন্তা-মন্থনের ব্যাপারে পাঠক কখনো ভাবেন না কিংবা অনেক সময় এ বিষয়ে জানতেও চান না। বরং হুট করেই কোনো একটা কবিতা পাঠকের পছন্দ হয়ে যায়; আবার পছন্দ নাও হতে পারে। পাঠকের কাছে কোনো কবিতার চার লাইন; দুই লাইন কিংবা এক লাইন অথবা কোনো একটা শব্দ অসম্ভব প্রিয় হয়ে উঠতে পারে। পুরো কবিতা বোধগম্য না হলেও ওই লাইনগুলো কিংবা একটি শব্দ মগজে গেঁথে যায়, আন্দোলিত করে তার মন! পাঠকের এ ভালো লাগাই কবিতাকে অমরত্ব দেয়। কবির শ্রম-মেধা ও নিষ্ঠা সার্থক হয়। উত্তরা-আগারগাঁও-মতিঝিল মেট্রোরেলের দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের পেছনের কারিগরদের শ্রম-মেধা ও কষ্টের পরিসংখ্যান সেভাবে হয়তো কখনো আলোচিত হবে না। কিন্তু রাজধানীর কোনো এক স্থানে দাঁড়িয়ে পুরো মেট্রোরেল দেখা সম্ভব না হলেও যেটুকু চোখে পড়বে তাতেই মন কাড়বে নগরবাসীর, মন কাড়ছে নগরবাসীর! ইচ্ছে করবে দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখতে! অনেকেই দ্বিতীয়বার তাকিয়ে দেখছে! নতুন যুগে ঢাকার প্রবেশ; ঢাকার তথা বাংলাদেশের উড়ালপথে মেট্রোরেল যুগের সূচনা কবিতার মতো সুন্দর হোক!