দেশের প্রথম মেট্রোরেলের প্রথম অংশ চলবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বুক চিরে। মেগা প্রকল্পটির বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন ডিএনসিসির মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম। মেট্রোরেল ও নগরজীবনের নানা বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে
মেট্রোরেল উদ্বোধন হচ্ছে, আপনার
অনুভূতি কী?
কোনো সন্দেহ নেই এ এক অন্য রকম ভালো লাগা। বিশেষ করে দেশের প্রথম মেট্রোরেল যেহেতু আমাদের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকা উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত শুরু হতে যাচ্ছে, অবশ্যই আমরা খুবই এক্সাইটেড। সিটি করপোরেশনের সব কাউন্সিলর ও নাগরিকের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। মেট্রোরেল উদ্বোধনের পর বিশেষ করে যারা উত্তরা, মিরপুর ও শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আছে, তাদের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তনের ছোঁয়া আসবে। আগে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত যাওয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। যারা উত্তরা থেকে মতিঝিল যাচ্ছে এবং মতিঝিল থেকে উত্তরা যাচ্ছে, তারা মানসিকভাবে খুব উদ্বিগ্ন থাকত—এত যানজট ঠেলে এত পথ কীভাবে যাব। বিশেষ করে নারীদের জন্য খুব কষ্টের ছিল, তাদের নিরাপত্তা, টয়লেট ইত্যাদি ভোগান্তির শেষ ছিল না। যারা নিয়মিত এ পথে যাতায়াত করত তাদের প্রায় ২-৩ ঘণ্টার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে তবেই ঘর বা কর্মক্ষেত্র থেকে বের হতে হতো। অফিসে যাওয়ার আগে এবং বের হওয়ার আগে মানুষ এক ধরনের মানসিক দুশ্চিন্তায় থাকত। এটা বাস্তব সত্য কথা। কারণ আমাদের এ মেগাসিটি ঢাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৯ হাজার মানুষের বসবাস। দেশের যত বড় প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা কেন্দ্র, অফিস-আদালত থেকে শুরু করে হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় সবকিছুই ঢাকায়। যদি আমরা ডিসেন্ট্রালাইজড করতে পারতাম তাহলে কিন্তু ঢাকায় এত চাপ পড়ত না। শুধু ঢাকা শহর নয়, এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালে বিশ্বের যত বড় বড় শহর আছে সব শহরেই ৭০ শতাংশ মানুষ বাস করবে। ঢাকা অলরেডি মেগাসিটি। ২০৩৫ সালে এর জনসংখ্যা দাঁড়াবে তিন কোটিতে। এত বিশাল জনসংখ্যার নগরীর যোগাযোগ ব্যবস্থা কীভাবে সহজ করা যায়, তার একটি বড় চাহিদা হলো মেট্রোরেল। মেগাসিটির জন্য মেট্রোরল থামরোলের মতো। অর্থাৎ মেট্রোরেল থাকতেই হবে। গণপরিবহন থাকতেই হবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে থাকতেই হবে। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হচ্ছে। এটিও এখন স্বপ্ন নয়। আমরা দুই সিটির মেয়র মিলে নগর পরিবহন সেবা চালু করেছি।
মেট্রোরেলের মাধ্যমে নগরবাসী কীভাবে উপকৃত হবে
বলে মনে
করেন?
প্রথমত,
মেট্রোর মাধ্যমে
তো পুরো
নগরবাসী একটি
উন্নত ও
আধুনিক যোগাযোগ
ব্যবস্থার আওতায়
চলে আসবে।
এতে পুরো
নগরবাসীই উপকৃত
হচ্ছে। সবচেয়ে
বেশি উপকৃত
হবে মেট্রো
ঘেঁষা এলাকার
বাসিন্দারা। এটা
কিন্তু তাদের
জন্য শাপে
বর হয়ে
গেল। আগে
মানুষ ভাবত
মিরপুর, শেওরাপড়া
ইত্যাদি এলাকায়
থাকা মানে
অনুন্নত এলাকায়
থাকা। কিন্তু
না, মিরপুর
আর আগের
মিরপুর নেই।
মিরপুরের চেহারা
বদলে গেছে।
মেট্রোরেলের কল্যাণে
এখানের সৌন্দর্য
বেড়েছে। মিরপুরের
আশপাশে যত
বাড়িঘর আছে
সবগুলোর দাম
বেড়ে যাবে।
শেওড়াপাড়া থেকে
উত্তরা দিয়াবাড়ী
সব এলাকার
বাড়িরঘরের দাম
বেড়ে যাবে।
উত্তরা দিয়াবাড়ী
এলাকার কেউ
যদি বলত,
আমি দিয়াবাড়ী
থাকি, তাকে
বলা হতো,
তুমি এত
দূরে থাকো!
অথচ তাদের
জন্যই আশীর্বাদ
হয়ে গেছে
মেট্রোরেল। উত্তরা
থেকে মতিঝিল
মাত্র ৪০
মিনিট। আর
মেট্রোরেলের যে
ক্ষমতা, ঘণ্টায়
৬০ হাজার
যাত্রী বহন
করতে পারবে।
অর্থাৎ ঢাকার
এক প্রান্তের
৬০ হাজার
বাসিন্দাকে অন্য
প্রান্তে নামিয়ে
দিয়ে আসতে
সময় লাগবে
মাত্র কয়েক
মিনিট। স্বপ্নেও
ভাবতে পারিনি
আমরা। অবিশ্বাস্য
স্বপ্নগুলোই বাস্তবায়ন
করছেন প্রধানমন্ত্রী
শেখ হাসিনা।
এখন
আমাদের কী
করতে হবে?
আমরা নিজেরা
ঠিক হতে
হবে। যখন
মেট্রোরেল থেকে
নামব, তখন
যেন ফুটপাত
ধরে হাঁটি,
রাস্তায় যেন
নেমে না
যাই। ফুটপাতগুলোকে
ঠিক করার
জন্য আমাদের
ঢাকা উত্তর
সিটি করপোরেশনের
সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের
একটি এমও
সই হয়েছে।
আমরা একটি
আইসিও প্রজেক্ট
নিয়েছি। প্রজেক্টের
নাম ‘ইনডোর
করিডোর ম্যানেজমেন্ট’।
অর্থাৎ মেট্রোরেল
থেকে যাত্রীরা
নামার পর
যেন সুন্দর
ফুটপাত পায়
সে কাজ
করব আমরা।
ফুটপাত সুন্দর
হলে কেউ
কিন্তু রাস্তায়
বেরিয়ে যাবে
না। আমরা
যখন বিদেশে
যাই তখন
নিজেদের ট্রলি-ব্যাগ
দুই হাতে
নিজেরাই বয়ে
বেড়াই। এক
অফিস থেকে
আরেক অফিসে
হেঁটেই চলে
যাই। সুন্দর
ফুটপাত পেলে
এখানেও মানুষ
সেটাই করবে।
এজন্য আমরা
ফুটপাত চওড়া
করব, ড্রেন
ঠিক করব,
বর্ষায় যেন
পানি না
জমে সে
ব্যবস্থা করব।
সংযুক্ত যে
সড়কগুলো আছে
সেগুলো ঠিক
করার জন্য
একটা মাস্টারপ্ল্যান
করেছি। আগামী
বছরেই আমাদের
কাজ শুরু
হবে বলে
আশা করছি।
কেউ যখন
মতিঝিলে নামবে
সে কিন্তু
স্বাচ্ছন্দ্যে হেঁটেই
বাংলাদেশ ব্যাংকে
যেতে পারবে।
এতে কী
হবে? একসঙ্গে
দুটি সেবা
জনগণ পাবে।
একে তো
মেট্রেরেলের সহজ
যোগাযোগ। অন্যদিকে
হাঁটার সুযোগ।
হাঁটার ফলে
তার ব্যায়ামও
হয়ে গেল।
শরীর সুস্থ
থাকবে। মনও
ভালো থাকবে।
কয়েকটি স্টেশনে এখনো ফুটপাত ব্যবহারের জটিলতা রয়ে গেছে।
অবশ্যই এটা একটা সমাধানে আসতে হবে। ফুটপাতের মধ্যে যারা ল্যান্ডিং স্টেশন করেছে আমি মেট্রো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি, ল্যান্ডিংয়ের আশপাশের জায়গাগুলো অধিগ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছি। মানুষ যখন মেট্রো থেকে নামবে তখন কিন্তু একটা বড় পরিসর লাগবে। গুলশান ১০ নম্বরে আমরা দেখেছি মেট্রো ৫ ও ৬ যাচ্ছে। মেট্রো-৬ এখন হচ্ছে। ৫ যখন হবে এটি হেমায়েতপুর থেকে গুলশানে আসবে। এ ক্রসিংয়ের মধ্যে আমরা একটি টিওডি করতে যাচ্ছি। এটা হবে মিরপুর ১০ নম্বরে। আপনি হয়তো বাইরের দেশে দেখেছেন, কোনো একটা স্টেশনে নামার পর আমরা একটু রেস্ট নিয়ে দেখি কানেক্টিভিটি কোথায় পাওয়া যায়। এ ধরনের কানেক্টিভিটি পাওয়ার জন্য আমরা টিওডি করছি। এটা আন্ডারগ্রাউন্ডে হবে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হচ্ছে, এ আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল দিয়ে বিভিন্ন মেট্রোর সঙ্গে যাত্রীরা কানেক্ট করতে পারবে। আজ মেট্রোরেল হয়েছে দেখেই কিন্তু আমরা এ প্ল্যানগুলো করতে পেরেছি। মেট্রোরেল না হলে আমরা এ প্ল্যান করতে পারতাম না। আমার মনে হয়, মেট্রোরেলের মাধ্যমে আমরা নগরবাসীকে যানজটমুক্ত ঢাকা শহর উপহার দিতে পারব।
দেশের প্রথম
মেট্রোরেল উদ্বোধন হচ্ছে ঢাকা
উত্তরে। মেয়র
হিসেবে আপনাকেও বেশকিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে
হয়েছে। সে
গল্পগুলো শুনতে
চাই।
চ্যালেঞ্জ
বলতে আমি
দেখেছি, আমার
ফুটপাতের মধ্যে
হঠাৎ করেই
মেট্রোরেলের ল্যান্ডিং
লাইন নেমে
যাচ্ছে। এটা
যাদি হয়
তাহলে তো
ফুটপাত ব্লক
হয়ে গেল।
ফুটপাত তো
মানুষের চলাচলের
জন্য। ল্যান্ডিং
যদি সেখানে
নেমে যায়
তাহলে কোনদিক
দিয়ে হাঁটবে
নগরবাসী। তখন
তাকে রাস্তায়
নামতে হবে।
আর রাস্তায়
নামলে গাড়ি
চাপা দিয়ে
চলে যাবে।
এটা বাস্তব
চিত্র। মেট্রোরেল
কর্তৃপক্ষ যদি
সিটি করপোরেশনের
সঙ্গে আগে
থেকে সমন্বয়
করত তাহলে
এ ভুলগুলো
হতো না।
আমি যখন
তাদের সঙ্গে
বসলাম, তাদের
বললাম, আমি
এভাবে করতে
দেব না।
বিভিন্ন বড়
বড় সেমিনারেও
এ কথা
বলেছি। গণমাধ্যমে
সেগুলো এসেছে।
এভাবে বলাবলির
কারণে তারা
তখন আমাদের
কাছে আসে।
আমি যখন
বাস্তবতা দেখালাম,
তখন তারা
বিষয়টি বুঝতে
পেরেছে। রাস্তার
পশ্চিম পাশে
অথবা পূর্ব,
যেখানেই জায়গা
আছে সেখানেই
জমি অধিগ্রহণের
প্রস্তাব দিয়েছি।
একটা স্টেশন
থেকে যখন
মানুষ নামবে
তখন তো
একজন-দুজন
নামবে না।
ঘণ্টায় ৬০
হাজার মানুষ
যাতায়াত করবে
মেট্রোতে। এর
মধ্যে যদি
এক হাজারও
নামে, তার
সঙ্গে ব্যাগ
থাকবে, বাচ্চাকাচ্চা
থাকবে, চলাচলের
জন্য একটি
বিশাল পরিধি
লাগবে। মেট্রোরেল
যেমন নিরাপদ
বাহন, এখান
থেকে নামার
পরও যেন
যাত্রীদের নিরাপত্তার
সমস্যা না
হয় সেটা
নিশ্চিত করাই
আমাদের কাজ।
তারা আমাকে
কথা দিয়েছে,
মেট্রোর ল্যান্ডিংয়ের
আশপাশের জমি
অধিগ্রহণ করবে।
তবে সে
কাজটা যদি
আগে করত,
তাহলে উদ্বোধনের
সঙ্গেই সঙ্গেই
আশপাশে ওপেন
স্পেস থাকত।
ওপেন স্পেস
খুবই জরুরি।
এটা খেলার
মাঠই হোক,
অথবা পার্ক
হোক বা
গ্রিন স্পেস
হোক, লাগবেই
লাগবে। তারা
কথা দিয়েছে
ওপেন স্পেস
রাখবে। পাশাপাশি
আমরা যদি
ইনডোর করিডোর
ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টটি
বাস্তবায়ন করতে
পারি তাহলে
নগরবাসী সীমাহীন
উপকৃত হবে।
আর মেট্রোরেল
পেয়ে নগরবাসী
খুশি। তারা
আত্মহারা। অনেকে
বিনোদন হিসেবেও
মেট্রোতে ঘুরবে।
মেট্রোরেলের কাজ
চলাকালীন নগরবাসীর ভোগান্তির সীমা
ছিল না।
আজ তার
সুফল ধরা
দিচ্ছে। নগরপিতা হিসেবে কী
বলবেন?
এটা
বাস্তব সত্য।
বিশেষ করে
যেসব এলাকায়
মেট্রোরেল গেছে,
গত ছয়-সাতটি
বছর তাদের
কী ভোগান্তি
হয়নি সেটা
বলুন। বর্ষাকালে
পানি, ধুলা,
যানজট, রাস্তা
বন্ধ; অনেক
কষ্ট হয়েছে!
আমি নগরবাসীকে
ধন্যবাদ জানাই,
আপনারা যে
কষ্ট করেছেন,
কষ্ট করলে
যে কেষ্ট
মেলে, পুরস্কার
মেলে, সে
পুরস্কার কিন্তু
আজ পেয়ে
যাবেন। এটা
নিয়ে আমার
কাছে অনেকে
অভিযোগ জানিয়েছেন,
আমি অনেকবার
গিয়েছি, রাস্তা
করেছি, মেট্রোরেল
কর্তৃপক্ষের সঙ্গে
আমাদের অনেক
বাকবিতণ্ডা হয়েছে,
এলাকাবাসীর সঙ্গে
বাকবিতণ্ডা হয়েছে।
তার পরও
আমরা মনে
করি, মেট্রোরেল
মানুষকে পরিবর্তন
করে দেবে,
পরিবর্তন করে
দেবে নগরবাসীর
দৈনন্দিন জীবনকে।
আমরা দেখেছি, জনগণের নিরাপত্তার জন্য অনেক
সময় আপনি
নির্মাণকাজও বন্ধ
করে দিয়েছেন।
এটা তো করতেই হবে। আমি যখন দেখলাম গার্ডার পড়ে যায়, কমপ্লায়েন্স মেইনটেইন করা না হয়, তখন কাউকে তো কথা বলতে হবে। এটার দায়িত্ব কে নেবে? কাউকে না কাউকে নিতে হবে তো। জনগণ আমাকে ভোট দিয়েছে, জনগণের সেফটিটাই আমি আগে দেখব। সবকিছুর আগে তাদের সুবিধাকে প্রধান্য দেব। আমি মনে করি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে যেটি সত্যি সেটাই তুলে ধরতে হবে সরকারের কাছে। খেলার মাঠ লাগবে, আমি বলেছি সরকারের কাছে। ফুটপাতে ল্যান্ডিং করা যাবে না, আমি বলেছি। নগরের ভোগান্তির জন্য যে ডিপার্টমেন্টই দায়ী হোক না কেন, যে-ই করুক না কেন আমি তার বিরুদ্ধে বলবই। এজন্য মানুষ আমাকে ভোট দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নমিনেশন দিয়েছেন জনগণের সেবা করার জন্য। আমি জনগণের সেবক হিসেবেই কাজ করতে চাই এ নগরে।





