উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জনসেবার অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভের পর ফ্রান্সে কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবারের বিক্ষোভে ব্যাপক ভাংচুর, দোকানপাটে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ গ্রেফতার হয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে রোববার দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। খবর রয়টার্স।

গতকালও প্যারিস ও মার্সেইয়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এসময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের চেষ্টা ঠেকাতে হস্তক্ষেপ করে দাঙ্গা পুলিশ।

এর আগে শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস দাঙ্গায় রূপ নেয়। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এসময় একটি পৌর ভবনে আগুন দেয়া হয়, দোকানপাটে লুটপাট চলে এবং বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকা হয়।

জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে মাখোঁ বলেন, ‘এই ছবিগুলো দেখে আমরা সবাই নিজেদের প্রশ্ন করেছি—তাদের মনে কী চলছিল? ফরাসিরা কীভাবে ফ্রান্সের সঙ্গে এমনটা করতে পারে?’

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো যৌক্তিকতা নেই, এর কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো অজুহাতও নেই। আজ রাতে আমরা সবাই ক্ষোভ ও লজ্জা অনুভব করছি।’

শনিবারের সহিংসতা মাখোঁর প্রতি জনগণের গভীর অসন্তোষের বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। এক দশকের শাসন শেষে আগামী বছর তার ক্ষমতা ছাড়ার কথা রয়েছে। এমন সময়ে সামাজিক অসন্তোষ, দুর্বল অর্থনীতি ও ক্রমবর্ধমান ঋণের কারণে তার শাসনামল ক্রমেই চাপে পড়েছে।

ইমানুয়েল মাখোঁ বলেন, শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ ও দাবিগুলো যৌক্তিক। এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যারা তাণ্ডব চালাতে চায়, তাদের এক করে দেখা উচিত নয়।

তবে ডানপন্থী কয়েকজন রাজনীতিকের জরুরি অবস্থা জারির দাবিতে সাড়া দেননি তিনি। এর পরিবর্তে মাখোঁ বলেন, প্রয়োজনে সরকারি ভবন ও স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা আঞ্চলিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিতে সরকার ব্যবস্থা নেবে।

French President Emmanuel Macron REUTERS

ইমানুয়েল মাখোঁ। ছবি: রয়টার্স

প্যারিসের বিক্ষোভস্থল ‘যুদ্ধক্ষেত্রের মতো’

সরকার এই সহিংসতার জন্য অতি বামপন্থী গোষ্ঠী এবং লুটপাটে উসকানি দেয়া অপরাধীদের দায়ী করেছে।

গত শনিবার প্যারিসে বিক্ষোভ চলাকালে হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানান, দেশজুড়ে পুলিশ ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করেছে। এছাড়া প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

গতকাল বিকালে প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের আবারো সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। বিক্ষোভকারীরা সাইকেলের স্তূপে আগুন ধরিয়ে দেন।

শনিবার কয়েক ডজন শহরে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ মিছিলে অংশ নেন। এক মাস ধরে চলা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার অবনতির বিরুদ্ধে বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষ এদিন এক জায়গায় এসে মিশে যায়।

কয়েকশ দোকান ক্ষতিগ্রস্ত

শনিবার ফ্রান্সজুড়ে লাখো মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করলেও সহিংসতায় জড়িত কিছু পক্ষ সরকারি ভবনে হামলা চালায়। বিলাসপণ্যের দোকান ও সুপারমার্কেটে লুটপাট করে এবং পুলিশের গাড়ি ও সদস্যদের ওপরও হামলা চালানো হয়।

আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে থাকা উগ্র ডানপন্থী ন্যাশনাল র‍্যালি দলের নেতা মেরিন ল্য পেনও শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ফ্রান্সকে এমন একটি দেশের ছবির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়তে দেয়া যাবে না, যেখানে ভাঙচুর, হামলা ও লুটপাট চলছে।

ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘সহিংসতা কোনো মতামত নয়। ধ্বংসযজ্ঞ প্রকাশের কোনো মাধ্যম নয়। আর বিশৃঙ্খলা ফ্রান্সের জন্য কোনো কর্মসূচি হতে পারে না।’

অন্যদিকে, উগ্র বামপন্থী ফ্রান্স আনবোড দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ বলেন, বিক্ষোভরত মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের দাবির জবাব দিতে হবে মাখোঁকে।

চীনামাটির তৈজসপত্রের জন্য বিখ্যাত লিমোজ শহরে আগুনে পুড়ে পৌর ভবনের ঘড়ির টাওয়ার ধসে পড়ে। এ ঘটনা ২০১৯ সালে প্যারিসের নটর ডেম ক্যাথেড্রালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।

শহরটির মেয়র গিয়োম গুয়েরাঁ বলেন, সেখানে পুলিশের পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়নি।

তিনি বলেন, ‘পৌর ভবনটি পুড়িয়ে দেয়ার সুস্পষ্ট ও পূর্বপরিকল্পিত চেষ্টা ছিল। ভবনের ভেতরে থাকা মানুষজন নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।’

পৌর ভবনটি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ না পেলে পদত্যাগ করার হুমকিও দিয়েছেন তিনি।

এদিকে ফরাসি অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেসকিউ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘যারা ভাংচুর করবে, তাদের এর মূল্য দিতে হবে, ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে হবে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যের জন্য জবাবদিহি করতে হবে।’

ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএমটিভিকে দেশটির খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্যারিফুরের প্রধান নির্বাহী আলেকজান্দ্র বোমপার জানান, তাদের ৫০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০টিতে লুটপাট চালানো হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে কয়েক কোটি ইউরোয়।