ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআরসি) ও উগান্ডায় ইবোলা ভাইরাসের একটি নতুন প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত ২৪৬ জনের শরীবে ভাইরাসটিতে শনাক্ত হয়েছে আর এরমধ্যে ৮৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রাদুর্ভাবটি প্রথম পূর্ব ডিআরসির ইতুরি প্রদেশে শনাক্ত হলেও ইতোমধ্যে দেশটির অন্যান্য এলাকা ও প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও এর সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে গতকাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ প্রাদুর্ভাবকে ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হিসেবে একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করেছে। সেইসঙ্গে এর বিস্তার রোধে জোরালো পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ইবোলা কী?

ইবোলা অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগ। মূলত ফলভোজী বাদুড়ের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন ভাইরাসের কারণে এ সংক্রমণ ঘটে থাকে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ‘ভাইরাল হেমোরেজিক ফিভার’ বা রক্তক্ষরণজনিত জ্বর দেখা দেয়।

B2ACSXP44RLGNBEG3X4DSAPE5Q

১৯৭৬ সালে প্রথম ভাইরাসটি আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি প্রাদুর্ভাবের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ডিআরসিতে এটি ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাব। এ প্রাদুর্ভাবগুলো মূলত ‘জুনোটিক স্পিলওভার’ বা প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে ছড়ানোর মাধ্যমে শুরু হয়। একবার মানুষ সংক্রমিত হলে, তাদের শরীরের তরল পদার্থ—যেমন বমি, রক্ত এবং বীর্যের মাধ্যমে তা অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, ক্লান্তি, পেশী ব্যথা ও মাথাব্যথা। এর পরবর্তী ধাপে বমি, ডায়রিয়া, র‍্যাশ (ফুসকুড়ি) এবং শরীরের ভেতরে ও বাইরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। ইবোলায় আক্রান্তদের গড় মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ ।

মানুষের ক্ষতি করে এমন চার ধরনের ইবোলা স্ট্রেন রয়েছে। এগুলো হলো: জাইর, সুদান, বুন্দিবুগিও ও তাই ফরেস্ট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি ‘বুন্দিবুগিও ভাইরাস’ দ্বারা ঘটছে। এর আগে কেবল ২০০৭ ও ২০১২ সালে এ স্ট্রেনের প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল।

প্রাদুর্ভাবটি কেন এত উদ্বেগের কারণ?

এবারের প্রাদুর্ভাব নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হওয়ার মূল কারণ— ধরনটি অত্যন্ত বিরল। এর কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন নেই এবং ডিআরসিতে চলমান যুদ্ধবিগ্রহের কারণে ভাইরাসের বিস্তার রোধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

সোয়ানসি ইউনিভার্সিটির সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইমন উইলিয়ামস বলেন, ‘এটি অত্যন্ত উচ্চ মৃত্যুহারসম্পন্ন একটি মারাত্মক রোগ, যার ভয়াবহতা কোভিড-১৯ এর চেয়েও অনেক বেশি। সৌভাগ্যবশত, ইবোলা কোভিড বা হামের মতো বাতাসে দ্রুত ছড়ায় না (কম সংক্রমণযোগ্য)। ইবোলা প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় যেকোনো বিলম্বের ফল ‘বিপর্যয়কর’ হতে পারে।’

https___archive-images.prod.global.a201836.reutersmedia.net_2015_10_08_LYNXNPEB970CA

ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার মেডিসিনের অধ্যাপক পল হান্টার জানান, যখন কোনো ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না, তখন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হলো আক্রান্তদের চিকিৎসা কেন্দ্রে নিয়ে এসে আলাদা করে রাখা, যাতে অন্য কেউ সংক্রমিত না হয়। কিন্তু ডিআরসির বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর ওপর সশস্ত্র মিলিশিয়াদের হামলার কারণে এটি করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

প্রাদুর্ভাবটি শনাক্তে বিলম্বের কারণ ও প্রভাব কী?

প্রাদুর্ভাবটি মূলত গত এপ্রিল মাসে শুরু হয়েছিল। জানা গেছে, প্রথম সন্দেহভাজন ভুক্তভোগী ছিলেন একজন ৫৯ বছর বয়সী ব্যক্তি, যার শরীরে ২৪ এপ্রিল লক্ষণ দেখা দেয় এবং তিন দিন পর (২৭ এপ্রিল) তিনি মারা যান। কিন্তু স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ এ প্রাদুর্ভাবের কথা জানতে পারে আরও পরে। আফ্রিকা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ যখন বিষয়টি জানতে পারে, ততক্ষণে ৫০ জন মানুষ মারা গেছেন।

আফ্রিকা সিডিসির মহাপরিচালক ডা. জিন কাসেয়া বলেন, ধীরগতির শনাক্তকরণের কারণে প্রাদুর্ভাবটি ছড়িয়ে পড়ার যথেষ্ট সময় পেয়ে গেছে।