যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক বিমান মোতায়েনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। যা ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি ও সরাসরি সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অতিরিক্ত যুদ্ধবিমান ও রিফুয়েলিং ট্যাংকার মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। এ বিমানগুলো শুধু প্রতিরক্ষামূলক হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ইরানের ওপর সরাসরি কোনো হামলা চালানো হয়নি বলে দাবি করেছেন তারা। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, যুদ্ধবিমানগুলো ইসরায়েলকে রক্ষা এবং মার্কিন ঘাঁটি নিরাপদ রাখতে আকাশপথে নিয়মিত টহল দিচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের আকাশসীমার ‘সম্পূর্ণ ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ’ নিয়েছে।
ওপেন সোর্স গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ সংস্থা অরোরা ইনটেল জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজিক ঘাঁটি— যেমন ইংল্যান্ড, স্পেন, জার্মানি ও গ্রিসে রিফুয়েলিং ট্যাংকার ও যুদ্ধবিমান সরিয়ে নিয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি কৌশলগত প্রস্তুতি বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ সোমবার রাতে ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এ সামরিক মোতায়েনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের জনগণ এবং ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’
মার্কিন নৌবাহিনীও সক্রিয়ভাবে ইরানের ছোড়া ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রতিহত করছে। ইউএসএস দ্য সুলিভানস এবং ইউএসএস আর্লেই বার্ক যুদ্ধজাহাজ সম্প্রতি ইসরায়েলের দিকে ছোড়া মিসাইল ধ্বংস করেছে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে এখন যুক্ত হয়েছে ইউএসএস থমাস হাডনার, যা ওই অঞ্চলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারে সহায়তা করছে। ইউএসএস আর্লেই বার্ক অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এদিকে ইউএসএস কার্ল ভিনসন বর্তমানে আরব সাগরে অবস্থান করছে এবং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরো চারটি যুদ্ধজাহাজ। এই স্ট্রাইক গ্রুপটি সরাসরি ইসরায়েলের প্রতিরক্ষায় নেই, তবে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপকূলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয়েছে। ইউএসএস নিমিৎজ, যা আগে থেকেই কার্ল ভিনসন-এর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কথা ছিল, তা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং চলতি মাসের শেষের দিকে অঞ্চলটিতে পৌঁছাবে বলে জানা গেছে।
এছাড়া রেড সি ও পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে আরো মার্কিন ডেস্ট্রয়ার শিপ মোতায়েন করা হয়েছে। বাল্টিক সাগরে সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের পরিবারের সদস্যদের সতর্কতামূলকভাবে ঘাঁটি ত্যাগের অনুমতি দেয়া হয়েছে, যদিও এখনো পর্যন্ত অনেকেই রয়ে গেছেন। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। গত অক্টোবরেও ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা ও হুথি বিদ্রোহীদের লাল সাগরে জাহাজে হামলার প্রেক্ষিতে এ সংখ্যা বেড়ে ৪৩ হাজারে পৌঁছেছিল।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে যুদ্ধ শুরু হলে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করতে মার্কিন নেতৃত্ব অপরিহার্য হবে। ইসরায়েল নিজের পক্ষ থেকে ফোর্দো পরমাণু স্থাপনায় হামলার সক্ষমতা রাখে না, কারণ এটি গভীর পাহাড়ের নিচে নির্মিত এবং কেবলমাত্র মার্কিন বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমানই ‘বাংকার বাস্টার’ বহনে সক্ষম। বর্তমানে কোনো বি-২ বোমারু বিমান মধ্যপ্রাচ্যে নেই, তবে প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত হোয়াইটম্যান ঘাঁটি থেকে ৩০ ঘণ্টার রাউন্ড-ট্রিপে পাঠানো হতে পারে। বর্তমানে ডিয়েগো গার্সিয়ায় বি-৫২ বোমারু বিমান রয়েছে, তবে তারা কেবল হালকা মারণাস্ত্র বহন করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত কূটনৈতিক ভাষায় যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা না দিলেও, তার সামরিক প্রস্তুতি, মোতায়েন ও কৌশলগত অবস্থান স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে—যেকোনো মুহূর্তে যুদ্ধ শুরু হলে দেশটি সরাসরি জড়িয়ে পড়বে।














