১৯৭২ সাল। অ্যাপোলো ১৭-এর নভোচারী জিন সার্নান ও হ্যারিসন স্মিট চাঁদের মাটি থেকে শেষবারের মতো পা তুলে নিলেন। সার্নান ছিলেন সবার শেষে। তাই ইতিহাস তাকেই মনে রাখল চাঁদে হাঁটা ‘শেষ মানুষ’ হিসেবে। সে মুহূর্তে কেউ কি ভাবতে পেরেছিল, পরবর্তী পদচিহ্ন পড়তে অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় লেগে যাবে? ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল, বুধবার সন্ধ্যায় ফ্লোরিডার আকাশ কেঁপে উঠল। আর্তেমিস-২-এর রকেট আগুন আর ধোঁয়া ছড়িয়ে ছুটল মহাকাশের দিকে। এ যাত্রা চাঁদে নামার নয় চাঁদকে ঘুরে আসার। ৫৩ বছরেরও বেশি সময় পর এ প্রথম মানুষ পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে বাইরে যাচ্ছে। পৃথিবী থেকে প্রায় চার লাখ কিলোমিটার দূরে। এতদিন মানুষ মহাকাশে গেছে, কিন্তু মহাকাশ স্টেশনের মতো মাত্র ৪০০ কিলোমিটার ওপরেই ঘুরেছে।

কিন্তু এ অগ্নিশিখায় লেখা আছে আরো বড় স্বপ্ন। চাঁদে মানবজাতির স্থায়ী ঘাঁটি গড়ার প্রথম যাত্রা। এ উদ্যোগের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের নাসার সঙ্গে কানাডা, ইউরোপ, জাপানসহ ৪০টিরও বেশি দেশ। সহযোগিতায় আছে ইলোন মাস্কের স্পেস এক্স ও জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিনের মতো বেসরকারি কোম্পানি। সেই ঘাঁটি কবে নাগাদ? বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০৩০ থেকে ২০৩৪-এর মধ্যে চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে দাঁড়িয়ে যাবে মানুষের প্রথম স্থায়ী আবাস। আজকের এ রকেটের আগুন সে স্বপ্নেরই প্রথম স্ফুলিঙ্গ। নাসার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত আর্তেমিস প্রোগ্রামে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর্তেমিস ৪ পর্যন্ত মোট খরচ ১০০ থেকে ১১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

AP26092049338941

আর্তেমিস ১: স্বপ্নের বীজ বপন

২০২২ সালের নভেম্বর মাস। পৃথিবী তখনো করোনা-উত্তর ক্লান্তিতে আচ্ছন্ন। সে ক্লান্তির মাঝেও মানুষ মাথা তুলে আকাশ দেখল। নাসার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটগুলোর একটি কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে নীরবে রওনা দিল চাঁদের পথে। সঙ্গে কোনো মানুষ ছিল না। ছিল শুধু ওরিয়ন মহাকাশযান এবং একটি প্রশ্ন—মানুষকে বহন করার সব ব্যবস্থা কি ঠিকঠাক আছে?

পঁচিশ দিনের যাত্রা শেষে ওরিয়ন নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরল। প্রকৌশলীরা যা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন হিট শিল্ড, নেভিগেশন, লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম সব উত্তীর্ণ। মিশন শেষে ঘোষণা এলো, আমরা প্রস্তুত। গাড়ি পরীক্ষা হয়ে গেছে। এখন সময় মানুষকে চড়ানোর।

আর্তেমিস ২: মানুষের প্রত্যাবর্তন

চাঁদের দিকে মানুষের প্রত্যাবর্তনের গল্পটা শুধু বিজ্ঞানের নয়, ইতিহাসেরও। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল যখন চার নভোচারী ওরিয়নে উঠলেন, তখন কেবল চারজন মানুষ উঠলেন না। বরং মানবজাতির ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।

কমান্ডার রেইড ওয়াইজম্যান, পাইলট ভিক্টর গ্লোভার, মিশন স্পেশালিস্ট ক্রিস্টিনা কক এবং কানাডিয়ান জেরেমি হ্যানসেন। এ চারটি নাম ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে গেল। ভিক্টর গ্লোভার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে গেলেন। ক্রিস্টিনা কক প্রথম নারী। আর জেরেমি হ্যানসেন প্রথম অ-মার্কিন নাগরিক।

AP26091689027252

১০ দিনের এই যাত্রায় রকেটটি চাঁদের চারদিক ঘুরে ফিরে আসবে, চাঁদে নামবে না। উৎক্ষেপণের প্রায় ছয় দিনের মাথায় ৬ এপ্রিলের দিকে ওরিয়ন চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছানোর কথা। সেখানে গিয়ে মহাকাশযানটি চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ ব্যবহার করে একটি ‘ফ্রি-রিটার্ন’ পথে ঘুরে আসবে, যাতে কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত জ্বালানি ছাড়াই পৃথিবীতে ফিরে আসা সম্ভব হয়। পুরো মিশনের সময়কাল ধরা হয়েছে ১০ দিন, যার সমাপ্তি হবে ১০ এপ্রিল প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণের মাধ্যমে। এই মিশনের মূল কাজ হলো যাচাই করা। গভীর মহাকাশে মানুষের শরীর কীভাবে সাড়া দেয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিক থাকে কিনা, জরুরি পরিস্থিতিতে কী হয়। এমনকি চাঁদের বিপরীত পিঠ যা কখনো পৃথিবী থেকে দেখা যায় না সেটাও নভোচারীরা কাছ থেকে দেখবেন প্রথমবারের মতো। পৃথিবী থেকে প্রায় চার লাখ কিলোমিটার দূরে গিয়ে মানুষ প্রশ্ন করবে আমরা কি আরো দূরে যেতে পারব? উত্তরটা আসবে পরের ধাপে।

AP26091673124807

আর্তেমিস ৩: মহড়ার পালা

২০২৭ সাল। আর্তেমিস ২ সফলভাবে ফিরে আসার কিছুদিনের মধ্যেই প্রস্তুতি শুরু হবে তৃতীয় মিশনের। কিন্তু এবারও চাঁদে নামা নয়। এবার অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। মহাকাশে দুটি যান কাছে এসে জুড়ে যাওয়াকে বলে ‘ডকিং’। মনে হতে পারে সহজ কাজ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এটা হচ্ছে শূন্যে, প্রচণ্ড গতিতে, যেখানে একটু ভুল মানে সর্বনাশ। আর্তেমিস ৩-এ নভোচারীরা পৃথিবীর কক্ষপথে স্পেস এক্স এবং ব্লু অরিজিন-এর তৈরি চন্দ্রযানের সঙ্গে ডকিং করবেন। এই দুটি বেসরকারি কোম্পানি তৈরি করছে সেই বাহন, যা পরবর্তী মিশনে নভোচারীদের চাঁদের পৃষ্ঠে নামিয়ে দেবে।

কেন পৃথিবীর কক্ষপথে পরীক্ষা? কারণ এটা নিরাপদ। এখানে কোনো সমস্যা হলে উদ্ধার করা সম্ভব। চাঁদের কাছে গিয়ে পরীক্ষা করতে গেলে ঝুঁকি অনেক বেশি। নাসা জানে, তাড়াহুড়া করে বিপদে পড়ার চেয়ে ধীরে ধীরে নিশ্চিত হওয়া অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ। মানুষের জীবন দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সংস্কৃতি থেকে বিজ্ঞান বহু আগেই বেরিয়ে এসেছে। এ মিশনটা অনেকটা চাঁদে যাওয়ার আগে বিমানবন্দরে শেষবার সব কাগজপত্র যাচাই করার মতো। ছোট কাজ কিন্তু অপরিহার্য।

AP26090516488026

আর্তেমিস ৪: মানুষ চাঁদে ফিরছে

এরপর আসবে সেই মুহূর্ত। যে মুহূর্তের জন্য অর্ধশতাব্দিরও বেশি অপেক্ষা। ২০২৮ সালে আর্তেমিস ৪-এ দুজন নভোচারী চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে নামবেন এবং কাটাবেন প্রায় এক সপ্তাহ। এক সপ্তাহে নভোচারীরা মাটির নমুনা সংগ্রহ করবেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন। তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করবেন হলো মানুষ চাঁদে আসলে কতদিন থাকতে পারে, কী কী সমস্যা হয়, স্থায়ী ঘাঁটির জন্য কী ধরনের অবকাঠামো দরকার। প্রতিটি তথ্য, প্রতিটি পর্যবেক্ষণ গিয়ে জমা হবে পরবর্তী পরিকল্পনার ভিত্তিতে।

191011152625-01-lunar-south-pole-water

চাঁদের দক্ষিণ মেরু

কিন্তু কেন দক্ষিণ মেরু?

কারণ বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, সেখানকার গভীর গহ্বরগুলোতে লুকিয়ে আছে বরফের আকারে পানি। এ পানি কেবল পানীয়ের জন্য নয়। হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেনে ভেঙে তৈরি করা যাবে রকেটের জ্বালানি। অর্থাৎ চাঁদ নিজেই হতে পারে মহাকাশ যাত্রার জ্বালানি স্টেশন। কল্পনা করুন পৃথিবী থেকে রকেটে উঠলেন, চাঁদে জ্বালানি নিলেন, এরপর ছুটলেন মঙ্গলের দিকে।

আর্তেমিস ৪-এর পর থেকে প্রতি বছর একটি করে চন্দ্র মিশন। ধীরে ধীরে গড়ে উঠবে ‘আর্তেমিস বেস ক্যাম্প’ চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে মানুষের স্থায়ী আবাস। সেখানে থাকবে বাসযোগ্য কক্ষ, সৌরশক্তিচালিত বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, গবেষণাগার এবং যোগাযোগ কেন্দ্র।

এর পরের গন্তব্য মঙ্গল। ২০৩০-এর দশকের শেষদিকে বা ২০৪০-এর দশকে মানুষ প্রথমবার মঙ্গলে পা দিতে পারে। চাঁদ হবে সেই অভিযানের মহাকাশ-বন্দর।