জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও সরকারি সেবার মান নিয়ে জমে থাকা ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। ফ্রান্সে শুরু হওয়া বিক্ষোভের পাশাপাশি স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়াতেও রাজপথে নেমেছে হাজারো মানুষ। দেশভেদে আন্দোলনের কারণ ভিন্ন হলেও এর কেন্দ্রে রয়েছে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সরকারের নীতির প্রতি অসন্তোষ। কোথাও বিক্ষোভ ঘিরে ঘটেছে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফ্রান্সে কারফিউ জারির পাশাপাশি ইতালির মিলানে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
ফ্রান্সে বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে প্যারিসসহ কয়েকটি শহরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সোমবার রাতে কারফিউ জারি করা হয়। জোরদার করা হয় পুলিশি নিরাপত্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা। এতে তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও আন্দোলন থামার লক্ষণ নেই। আগামী শনিবার নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো। একই সঙ্গে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণাও দিয়েছে তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে গতকাল দেয়া এক পোস্টে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বলেন, ‘স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন এলাকার কর্তৃপক্ষ কারফিউ জারি করতে পারবে।’ অন্যদিকে ইতালির মিলানে বিক্ষোভ, লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর জরুরি বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে শহরটিতে সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছে সরকার।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপের সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যে ফ্রান্সেই সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। এতে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ অংশ নেয়। দেশটির বেশির ভাগ এলাকায় বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কয়েকটি স্থানে লুটপাট, ভাংচুর, ভবনে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রায় আড়াই হাজার বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শিক্ষক সংকট ও শিক্ষার মান নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরেই প্রতিবাদ চলছিল। এর সঙ্গে পরে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট এবং সরকারি নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ। ফলে শিক্ষার্থীদের দাবি ঘিরে শুরু হওয়া আন্দোলন ক্রমেই বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষে রূপ নিয়েছে।
প্যারিসের আমেরিকান গ্র্যাজুয়েট স্কুলের অধ্যাপক ডগলাস ইয়েটসের মতে, ফ্রান্সে সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক সংকট একসঙ্গে কাজ করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের অসন্তোষ আগে থেকেই ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অন্যান্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বড় সংকটের দিকে গড়িয়েছে।’
আগামী বছরের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন ইয়েটস। তার মতে, প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে বিরোধী দলগুলো।
ফ্রান্সের বাইরে স্পেন ও পর্তুগালেও জন-অসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে আবাসন ব্যয়। স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সলে কয়েক সপ্তাহ ধরে তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদ করছে বিক্ষোভকারীরা। দেশটির ব্যবসাবিষয়ক সংবাদপত্র এক্সপানসিওনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্পেনে ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১ হাজার ২২১ ইউরো। বিপরীতে ৮০ বর্গমিটারের একটি ফ্ল্যাটের গড় মাসিক ভাড়া প্রায় ১ হাজার ১৩০ ইউরো। অর্থাৎ ন্যূনতম মজুরিতে উপার্জিত অর্থের বড় অংশই ব্যয় হচ্ছে বাসা ভাড়ায়। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে আবাসন ব্যয় মিটিয়ে খাদ্য, পরিবহন ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্পেনের বার্সেলোনা এবং পর্তুগালের লিসবন ও পোর্তোতেও আবাসন ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদেশগুলোর মধ্যে পর্তুগালেই বাড়ির দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দেশটিতে বাড়ির দাম বেড়েছে প্রায় ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাড়ি নির্মাণ ও আবাসনের সরবরাহ বাড়িয়ে কেনা ও ভাড়ার ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা করছে পর্তুগাল সরকার।
ইতালিতে বিক্ষোভকারীদের দাবির পরিসর আরো বিস্তৃত। উন্নত কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মানোন্নয়ন, আবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি এবং বেতন বাড়ানোর দাবিতে রাজপথে নেমেছে হাজারো মানুষ। অন্যদিকে আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে উচ্চ বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের পাশাপাশি দুর্নীতি বন্ধ এবং স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও পেনশনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তারা।
ইউরোপজুড়ে এ অসন্তোষের পেছনে অর্থনৈতিক কাঠামোগত দুর্বলতাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের ইউরোপবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যান্ড্রু কেনিংহামের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা এ সংকটকে আরো জটিল করে তুলছে।
সিএনবিসিকে তিনি বলেন, ‘ইউরোপের অনেক দেশের রাজনীতিকেরা মানুষের উন্নত জীবনের প্রত্যাশা পূরণের আশ্বাস দিতে পারছেন না। একদিকে অর্থনীতি ধীরগতিতে এগোচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের ঋণ বাড়ছে। ফলে সরকারি ব্যয় বাড়ানো কিংবা কর কমানোর মতো পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।’
স্পেনের দেউস্তো বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক মারিয়া সিলভেস্ত্রের মতে, ইউরোপের তরুণদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং নিজেদের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি বাড়ছে। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একাধিক সংকট যখন একসঙ্গে ঘনীভূত হয়, তখন ছোট কোনো ঘটনাও দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরিত করতে পারে।
ইউরোপের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ তাই কেবল জ্বালানি, আবাসন কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক স্থবিরতা, ক্রয়ক্ষমতার অবনতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, সরকারি সেবার দুরবস্থা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সংকটও প্রকাশ পাচ্ছে। একদিকে মূল্যস্ফীতি ও আবাসন ব্যয়ের চাপ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা—দুইয়ের চাপে নীতিনির্ধারকদের সামনে কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এখন তাদের বড় চ্যালেঞ্জ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং ক্রমবর্ধমান জন-অসন্তোষ প্রশমনের কার্যকর পথ বের করা।









