দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বলিভিয়ার পাহাড়ি বনাঞ্চলে নতুন এক প্রজাতির বন্য বিড়ালের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো কোনো বিড়ালকে নতুন প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করা হলো। খবর গার্ডিয়ান।
স্থানীয় মানুষ এ ছোট বিড়ালটিকে ‘টিলকায়ো’ নামে চেনে। বলিভিয়ার মেঘে ঢাকা পাহাড়ি ইউঙ্গাস বনাঞ্চলে প্রাণীটির সন্ধান পাওয়া গেছে। এ অঞ্চলের বন বেশির ভাগ সময় মেঘে ঢাকা থাকে এবং বাতাসে আর্দ্রতাও অনেক বেশি।
টিলকায়োর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৬ সেন্টিমিটার এবং ওজন মাত্র ১ দশমিক ৪ কেজি। অর্থাৎ একটি সাধারণ গৃহপালিত বিড়ালের তুলনায় এটি আকারে ছোট। এর গায়ের লোম হালকা বাদামি। শরীরজুড়ে রয়েছে অনিয়মিত আকারের গোলাকার দাগ।
বিজ্ঞানীরা শুধু চেহারা দেখে প্রাণীটিকে নতুন প্রজাতি হিসেবে শনাক্ত করেননি। তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে পাওয়া বিড়ালের ডিএনএ বা জেনেটিক তথ্য পরীক্ষা করেছেন। এতে দেখা যায়, বলিভিয়ার এ বিড়াল অন্য টাইগার ক্যাটদের থেকে আলাদা। তাই এর বৈজ্ঞানিক নাম দেওয়া হয়েছে লিওপারডাস টিলকা।
টাইগার ক্যাট বলতে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া ছোট আকারের বন্য বিড়ালকে বোঝায়। আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, এসব বিড়াল মূলত একটি প্রজাতির। তবে কয়েক দশক ধরে করা জেনেটিক গবেষণায় দেখা যায়, তাদের মধ্যে একাধিক আলাদা প্রজাতি রয়েছে।
নতুন গবেষণায় দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া ৩৮টি বিড়ালের ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে জাদুঘরে রাখা আটটি পুরোনো নমুনাও ছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, টাইগার ক্যাট আসলে জেনেটিকভাবে আলাদা পাঁচটি প্রজাতি নিয়ে গঠিত।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, টিলকায়োর বংশধারা অন্য টাইগার ক্যাটদের থেকে প্রায় ১৪ লাখ বছর আগে আলাদা হয়ে যায়। এত দীর্ঘ সময় ধরে আলাদা থাকার কারণে প্রাণীটিকে আলাদা প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করার মতো যথেষ্ট জেনেটিক পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
তবে নতুন এ বিড়াল সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনো খুব বেশি কিছু জানেন না। এর মল পরীক্ষা করে ছোট ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর অবশেষ পাওয়া গেছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এসব প্রাণী টিলকায়োর খাবারের তালিকায় থাকতে পারে। ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিতেও দেখা গেছে, প্রাণীটি সম্ভবত রাতে বেশি সক্রিয় থাকে।
বর্তমানে এ প্রজাতির মাত্র দুটি জীবিত প্রাণী সম্পর্কে গবেষকেরা নিশ্চিতভাবে তথ্য পেয়েছেন। তাদের মধ্যে একটি ১০ বছর বয়সী পুরুষ বিড়াল। আগে একটি স্থানীয় পরিবার প্রাণীটিকে বাড়িতে রেখেছিল। এখন সেটি বলিভিয়ার সেনদা ভার্দে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে রয়েছে।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, ইউঙ্গাস বনাঞ্চল বর্তমানে নানা ধরনের হুমকির মুখে। বন উজাড়, কৃষিজমি বাড়ানো, মানুষের কারণে লাগা আগুন এবং খননকাজের কারণে এ অঞ্চলের বন ধ্বংস হচ্ছে। ফলে নতুন আবিষ্কৃত টিলকায়োর মতো প্রাণীর ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
গবেষকেরা তাদের নতুন তথ্য ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)-এর কাছে দিয়েছেন। সংস্থাটি ভবিষ্যতে পাঁচ ধরনের টাইগার ক্যাটকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করবে। এতে কোন প্রজাতি কতটা ঝুঁকিতে আছে, তা আরও স্পষ্ট হবে।
গবেষকদের একজন এদুয়ার্দো আইজিরিক বলেন, বিড়ালের মতো পরিচিত প্রাণীদের মধ্যেও এখনো নতুন প্রজাতি আবিষ্কারের সুযোগ রয়েছে। পৃথিবীতে এমন অনেক প্রাণী থাকতে পারে, যাদের মানুষ এখনো চেনে না। সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো—কিছু প্রাণীকে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করার আগেই হয়তো তারা বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।









