একজন মানুষ, যিনি কখনো পৌঁছে যান হাতের তালুতে এঁটে যাওয়ার মতো ক্ষুদ্র মানুষের দেশে, কখনো আবার নিজেকে আবিষ্কার করেন দৈত্যদের জগতে। তার ভ্রমণের গল্পে আছে উড়ন্ত দ্বীপ, যুক্তিবাদী ঘোড়া আর মানুষের আচরণ নিয়ে অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন। এই ভ্রমণকারী লেমুয়েল গালিভার। আর তার বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সমাজ ও মানুষের নানা অসংগতি তুলে ধরেছেন আইরিশ লেখক জোনাথন সুইফট।

তিন শতাব্দী আগে, ১৭২৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত হয়েছিল আইরিশ লেখক ও ব্যঙ্গাত্মক সাহিত্যিক জোনাথন সুইফটের বিখ্যাত কালজয়ী উপন্যাস ‘গালিভার্স ট্রাভেলস’। প্রকাশের পর এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও বিশ্বসাহিত্যে এর জনপ্রিয়তায় এতটুকুও ভাটা পড়েনি। আজ সেই প্রকাশের ৩০০ বছর পূর্ণ হলো।

শিশুতোষ রূপকথার চেয়েও বেশি কিছু

চারটি ভিন্ন ও অদ্ভুত অঞ্চলে লেমুয়েল গালিভার নামের এক জাহাজি ডাক্তারের কাল্পনিক ভ্রমণের গল্প নিয়ে রচিত এই গ্রন্থ। বাহ্যিকভাবে এটিকে একটি রোমাঞ্চকর অ্যাডভেঞ্চার বা শিশুদের চমৎকার গল্প মনে হলেও, মূলত এটি ছিল তৎকালীন মানবসমাজ, রাজনীতি এবং মানবপ্রকৃতির ওপর লেখা এক তীব্র ও শ্লেষাত্মক কটাক্ষ।

উপন্যাসের প্রথম অংশে গালিভার লিলিপুটদের দেশে পৌঁছান। সেখানে মাত্র ছয় ইঞ্চির ক্ষুদ্র মানবদের তুচ্ছ বিষয় নিয়ে যুদ্ধ, অহংকার ও রাজনীতি ইউরোপীয় রাজতন্ত্রের অসারতাকে উন্মোচিত করে। পরবর্তী অংশে তিনি যান ব্রোবডিংনাগ নামের দৈত্যদের দেশে। সেখানে গালিভার নিজেই এক ক্ষুদ্র জীবে পরিণত হন এবং দৈত্যাকার বাসিন্দাদের বস্তুনিষ্ঠ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে মানবজাতির ক্ষুদ্রতা ও অহংকার ভেসে ওঠে।

তৃতীয় অংশে লাপুটার উড়ন্ত দ্বীপসহ বিভিন্ন অঞ্চলের অবাস্তব বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের হাস্যকর গবেষণা তুলে ধরা হয়, যা মূলত তৎকালীন অতি-বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও বাস্তবতাহীন প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার সমালোচনা।

উপন্যাসের চতুর্থ ও শেষ অংশটি ছিল সুইফটের সবচেয়ে বিতর্কিত ও শক্তিশালী সামাজিক কটাক্ষ। এই পর্বে গালিভার পৌঁছান ‘হুইনম’ নামের এক অদ্ভুত দ্বীপে, যা পরিচালিত হতো যুক্তিবাদী ও পরম দয়ালু কথা বলা ঘোড়াদের দ্বারা। সেখানে ‘ইয়াহু’ নামের কুৎসিত, লোভী ও পশুরূপী এক প্রজাতির প্রাণীর বাস ছিল, যাদের আকৃতি ও আচরণ মানুষের মতোই। বুদ্ধিমান ঘোড়াদের সঙ্গে থাকার পর গালিভার অনুধাবন করেন যে, তথাকথিত সভ্য মানবজাতি আসলে পোশাক পরা ও হিংসুটে ‘ইয়াহু’ ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ এবং সমাজের প্রতি তার এই গভীর বিষাদ ও ঘৃণা তাকে ঘরের স্বজনদের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং তিনি ঘোড়াদের যৌক্তিক সমাজকেই শ্রেয় মনে করতে থাকেন।

নিজের নাম আড়াল করেই প্রকাশ

বইটি প্রকাশের সময় সুইফট নিজের নাম সামনে আনেননি। বইটি লন্ডনে প্রকাশিত হয় ট্রাভেলস ইনটু সেভারাল রিমোট নেশনস অব দ্য ওয়ার্ল্ড নামে। বইটিতে গালিভারকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, যেন তিনি সত্যিকারের একজন ভ্রমণকারী, যিনি নিজের অভিজ্ঞতা লিখে জানিয়েছেন। এতে পাঠকের কাছে কাহিনিটি বাস্তব ভ্রমণবৃত্তান্তের মতো মনে হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

তবে বইটির ব্যঙ্গাত্বতা এতটাই তীক্ষ্ণ ছিল যে প্রকাশক বেঞ্জামিন মোট কিছু অংশ বদলে দেন। বিশেষ করে ইংল্যান্ডের রাজনীতি ও শাসকদের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়, এমন কিছু বিষয় নরম করার চেষ্টা করা হয়েছিল। এতে সুইফট সন্তুষ্ট ছিলেন না। পরে ১৭৩৫ সালে প্রকাশিত একটি সংস্করণে তার মূল লেখার আরো কিছু অংশ সংযোজন করা হয়।

প্রকাশের পর বইটি দ্রুত পাঠকের মনোযোগ কাড়ে। প্রথম মুদ্রণের কপি এক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় বলে উল্লেখ রয়েছে। সময়ের সঙ্গে বইটি শিশুদের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে শিশুদের জন্য প্রকাশিত অনেক সংস্করণে মূল বইয়ের রাজনৈতিক ব্যঙ্গ ও প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী কিছু অংশ বাদ দেয়া হয়েছে। ফলে অনেক পাঠক গালিভারের গল্পকে শুধু কল্পনার অভিযান হিসেবে চিনলেও এর ভেতরে থাকা সামাজিক সমালোচনার গভীরতা তাদের অজানাই থেকে যায়।

তিনশ বছর পরও বইটির আবেদন টিকে থাকার কারণ সম্ভবত এখানেই। গালিভার অচেনা দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ান। কিন্তু প্রতিটি দেশ তাকে শেষ পর্যন্ত নিজের পরিচিত পৃথিবী সম্পর্কেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, মানুষের অহংকার, অন্ধ বিশ্বাস আর অযৌক্তিক বিরোধের যে ছবি সুইফট এঁকেছিলেন, তা কেবল তার সময়ের জন্যই প্রাসঙ্গিক ছিল না। কল্পনার ভ্রমণ দিয়ে শুরু হওয়া এই বই তাই শেষ পর্যন্ত পাঠককে ফিরিয়ে আনে নিজের সমাজ ও নিজের আচরণের সামনে।