ইউরোপ থেকে ভারতে আসার সমুদ্রপথ আবিস্কার করেছিলেন তিনি। একজন মানুষের ক্ষেত্রে সাধারণ একজন ব্যবসায়ীর মতো আচরণ পাওয়া ছিল অপমানজনক—যা তিনি সহজে মেনে নিতে পারেননি। সময়টা ছিল ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দ। ভাস্কো দা গামা সদ্য ভারতের পশ্চিম উপকূলের কালিকটে পদার্পণ করেছেন। আসার পর এই ভূখণ্ডকে তিনি শোষণ করতে চেয়েছিলেন। পেছনে কারণও ছিল। ‘কালো স্বর্ণ’ অর্থাৎ গোলমরিচের জন্য।
ভারতের সীমানার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে সমুদ্র। এর উপকূলের আছে ভিন্ন ভিন্ন নিজস্ব ইতিহাস। ভিন্নতার কারণ প্রতিটি উপকূলের স্বাতন্ত্র। ভৌগলিক পার্থক্যের পাশাপাশি মানুষে মানুষেও ছিল (এখনো আছে) পার্থক্য। কেউ হয়ত শাসিত হতে পছন্দ করেছে। অন্যরা করেছে বিদ্রোহ। কেউ নিজেদের স্বাধীনতা বজায় রাখতে ছিল বদ্ধপরিকর।
যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে তার আগে বহু দশক ধরে বহু মানুষ চেষ্টা করেছে ‘মশলার দেশ’ ভারতে পৌঁছানোর। আর এ যাত্রায় বহু নাবিক হারিয়েছে প্রাণ। বহু দেশ হারিয়েছে জাহাজ ও তাদের বিনিয়োগ। এরপর কেউ পৌঁছেছে। তারা ধারণা করেছিল খুব সহজে আয়ত্ব করতে পারবে জায়গাটি। কিন্তু সেই কষ্টসাধ্য যাত্রার শেষে, যদি তাদের বলা হয় স্বর্ণ ও রূপা দিয়ে জিনিস কিনতে হবে, উপরন্তু শুল্কও দিতে হবে—তাহলে সেটা কি তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য? নিয়মানুসারে এ রকমই হবার কথা কিন্তু পর্তুগীজরা বিষয়টি পছন্দ করেনি।
কিন্তু কালিকটের শাসকও কম ছিলেন না। তিনি ছিলেন কালিকটের জমোরিন (সমুদ্রাধিপতি)। তাকে ভারতে এখনো সমুদ্রের রাজা, সমুদ্রী রাজা বলে সম্বোধন করা হয়। জমোরিনই ঐ অঞ্চলের আন্তর্জাতিক মশলা বাণিজ্যের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন। কারণ কালিকট বন্দর থেকেই ভারত মহাসাগরের বাণিজ্যপথ ধরে মশলা রপ্তানি হত মধ্যপ্রাচ্যের দিকে। জমোরিন কালিকটকে একটি সাধারণ বন্দর থেকে গড়ে তুলেছিলেন এক বিশাল বাণিজ্য-কেন্দ্রে। আর বর্তমান কেরালার একটি বড় অংশ ছিল জামোরিনের অধীনে।
ভাস্কো দা গামার সঙ্গে জমোরিনের সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং সাক্ষাৎটি বিথ্যাত হয়ে আছে। সাক্ষাৎ ঘটেছিল তথাকথিত ‘আবিষ্কারের যুগে’। তখন ইউরোপীয় অভিযাত্রী ও নাবিকরা নতুন নতুন ভূমি আবিষ্কার করছিল উপনিবেশ স্থাপন ও সম্পদ লুটের আশায়। বহু শতাব্দী ধরে আরব সাগরের বুকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছিল। কিন্তু পর্তুগিজরা সেই পুরনো বাণিজ্যপথে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছিল—বিশেষ করে—মশলার ব্যবসার দখল নিতে। তাদের লক্ষ্য ছিল ‘মশলার রুট’ দখলে নেওয়া, যার জন্য ভারতের মালাবার উপকূলে পৌঁছানো ছিল একান্ত জরুরি।
কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও সহজ ছিল না। যদিও শেষপর্যন্ত পর্তুগিজরা সফল হয়েছিল। তবু মশলার বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাদের এক শতাব্দী লেগে যায়। তাদের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল কালিকটের ক্ষমতাধর শাসক, জমোরিনরা—যারা মালাবার উপকূলে একাধিক বন্দর নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং নিজেদের গড়ে তোলা ভূমি রক্ষা করতে সর্বদা প্রস্তুত থাকতেন প্রবল প্রতিরোধে।
১৪ থেকে ১৬ শতকের সময়টা ছিল ‘কালিকটের স্বর্ণযুগ’। এই শহর জমোরিনরা তৈরি করেছিলেন। এরপর জামোরিনদের রাজবংশ প্রায় ৫০০ বছর ধরে অঞ্চল শাসন করেছিল। পূর্ব ও পশ্চিম উভয় দিকের পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা এই শহরের প্রতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন। শহরটি সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল জমোরিনদের চতুর অর্থনৈতিক কৌশল ও উদার সামাজিক নীতির কারণে। এছাড়া, জমোরিনদের একটি দক্ষ নৌবাহিনীও ছিল, যাদের সেনাপতিরা হঠাৎ হামলা ও পাল্টা আঘাতে পারদর্শী ছিলেন। জামোরিনরা এক সময় এতোটাই প্রভাবশালী ও শক্তিশালী ছিলেন যে মনে করা হতো কালিকটের এই রাজবংশের পরাজয় কখনো সম্ভব না।
কিন্তু পৃথিবীর বহু শক্তিশালী রাজবংশের মতোই জামোরিনদের ক্ষমতাও কমে গেছে বিভিন্ন করাণে। মূলত ব্রিটিশ শাসনের সূচনার সঙ্গে সঙ্গেই, মালাবারের এই প্রভাবশালী জমিদাররা ইতিহাসের পাতা থেকে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে থাকেন। বর্তমানে, ইতিহাস অনুরাগী বাদে আধুনিক ভারতের খুব কম মানুষই এই রাজবংশকে মনে রাখেন। কিন্তু জমোরিনদের উত্থান ও পতনের যাত্রা নিঃসন্দেহে এমন একটি গল্প, যা আবার নতুনভাবে জানানো ও শোনা উচিত।
জামোরিন রাজবংশ
জামোরিনদের রাজবংশ ‘নেডিয়িরিপ্পু স্বরূপম’ নামে পরিচিত ছিল। এ নাম বর্তমান কেরালার মালাপ্পুরাম জেলার এরনাড় অঞ্চলের নেডিয়িরিপ্পু নামক স্থান থেকে উদ্ভূত।
জামোরিনদের উত্থানের কাহিনি প্রথম বর্ণিত হয়েছে ১৭শ শতাব্দীর একটি গ্রন্থ কেরলোল্পতিতে। এ গ্রন্থটি মালাবার অঞ্চলের ইতিহাসের প্রাচীনতম বিবরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এতে পৌরাণিক কাহিনি, কিংবদন্তি এবং ঐতিহাসিক ঘটনার সংমিশ্রণ রয়েছে।
কেরলোল্পতিতে বলা হয়েছে, এরনাড়ু থেকে মানিচান ও বিক্রমান নামের দুই ভাই এসেছিলেন। এরা তখনকার চেরা রাজবংশের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি ছিলেন। যখন চেরা পেরুমাল রাজ্যত্যাগ করেন, তখন ওই দুই ভাই রাজ্যে উপস্থিত ছিলেন না, ফলে তারা ভূমির কোনো অংশ পাননি। ফিরে এসে তারা পেরুমালকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাদের উপেক্ষা করা হয়েছে। তখন যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তার মধ্যে পেরুমাল তাদেরকে একটি ঝোপঝাড়পূর্ণ এলাকা দান করেন। এই এলাকা পরবর্তীতে কোইলকোড়ে (কলিকট বা কালিকট) নামে পরিচিত হয়। পেরুমাল তাদের তার নিজের তলোয়ার, একটি ভাঙা শঙ্খ এবং একটি আদেশ জারি করেন, যেখানে বলা হয়—তারা (দুই ভাই) চাইলে আরো এলাকা জয় করতে পারেন। অর্থাৎ, তাদেরকে ক্ষমতা ও ভূমি বাড়ানোর সুযোগ দেয়া হয়।
কেরলোল্পতি-র বাইরেও জামোরিনদের উত্পত্তি ‘স্বরূপম’ নামক একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। এটি দ্বাদশ শতাব্দীতে চেরা সাম্রাজ্যের পতনের পর গড়ে ওঠে। জামোরিনরা নেডিয়িরিপ্পু স্বরূপম (স্বরূপমের নির্দিষ্ট অর্থ পাওয়া যায় না। তবে সম্ভবত এটি নির্দিষ্ট ভূমি-অঞ্চলকে বোঝায়) থেকে আবির্ভূত হন। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্বরূপমগুলোর মধ্যে ছিল:
- কোলাত্তুনাড় (কলিকট ও পয়্যনূরের মধ্যবর্তী অঞ্চল),
- পেরুম্বদাপ্পু (কোচিন, বর্তমানে কেরালার কোচি) এবং
- ত্রিপ্পাপ্পুর (ত্রাভাঙ্কোর, বর্তমান কোচি থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত অঞ্চল)।
নেডিয়িরিপ্পু স্বরূপম একটি পার্বত্য অঞ্চলে অবস্থিত ছিল। এর শাসক বুঝতে পারেন যে, কোনো বন্দর ছাড়া তাদের প্রসার সম্ভব নয়। অনুমান করা হয়, প্রায় ১১০০ খ্রিস্টাব্দে নেডিয়িরিপ্পুর শাসক এবং তার নায়ের (দক্ষিণ ভারতের একটি গোষ্ঠী। এদের উৎপত্তি বা ইতিহাস নিয়ে স্পষ্ট কোনো কথা পাওয়া যায় না। তবে নাইর বা নায়ের বলতে নাগা জনগোষ্ঠী আবার কখনো ‘মানুষের নেতা’ও বোঝানো হয়।) বাহিনী, কল্লায়ি নদীর উত্তরের পর্লানাড় (বর্তমান কলিকটের আশেপাশের এলাকা) আক্রমণ করে এবং একটি দীর্ঘ যুদ্ধের পর এই অঞ্চল দখল করেন।
এরপর, নেডিয়িরিপ্পুর এই শাসক, যিনি পরবর্তীকালে জামোরিন নামে পরিচিত হন, বন্দর এলাকায় বসবাসকারী মুসলিম বণিক এবং মোপলা সম্প্রদায়ের সঙ্গে মৈত্রি স্থাপন করেন। নাইর সেনাবাহিনী এবং মুসলিম মিত্রদের সহায়তায় তিনি তার অঞ্চল ও প্রভাব সম্প্রসারিত করেন।
১৩শ শতাব্দীর মধ্যে জামোরিন নীলা নদীর মোহনা (বর্তমানে ভারতপুঝা) এবং পোন্নানি বন্দরের (কলিকট থেকে প্রায় ৮০ কিমি দক্ষিণে) ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। পোন্নানি পরবর্তীকালে তার রাজনৈতিক সদরদপ্তর হয়ে ওঠে।
এরপর তিনি মামাঙ্কম নামক একটি প্রাচীন বাণিজ্য মেলা (উত্তর ভারতের কুম্ভমেলার সদৃশ) নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন, প্রতিবেশী ছোট রাজ্যগুলোর ক্ষমতা দখল করে। এই ঘটনাটি কলিকট থেকে পলঘাট পর্যন্ত অঞ্চলজুড়ে জামোরিনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে এবং তাকে উভয় তীরের কৃষিভূমির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেয়।
এই অঞ্চলে সে সময় আবররা ব্যবসা করতে যেত। ফলে কলিকট অচিরেই আরব বংশোদ্ভূত বণিকদের একটি ঘনবসতিপূর্ণ শহরে পরিণত হয়। এরা নতুন শক্তিশালী শাসক জামোরিনের পক্ষে অবস্থান নেন। তারা সামরিক সহায়তাও দেন এবং আরব দেশসমূহ ও তার বাইরেও বাণিজ্য বিস্তার করেন। জামোরিন, একজন সদয় শাসক হিসেবে, কলিকটকে একটি বাণিজ্যিক রাজধানীতে রূপান্তর করেন। তিনি যুদ্ধ ব্যতীত অন্য সময় পোন্নানির ত্রিক্কাভিল কোভিলাকম এবং কলিকটের তার অন্যান্য প্রাসাদে বসবাস করতে শুরু করেন।









