পৃথিবীতে একদিন বলতে আমরা ২৪ ঘণ্টাকেই বুঝি। তবে বাস্তবে এই ২৪ ঘণ্টার দৈর্ঘ্য সবসময় একেবারে একই থাকে না। কয়েক দশকের ব্যবধানে পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতিতে সামান্য পরিবর্তন ঘটে, যার ফলে দিনের দৈর্ঘ্যও কয়েক মিলিসেকেন্ড পর্যন্ত বাড়তে বা কমতে পারে। এতদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, পৃথিবীর গভীরে থাকা কেন্দ্রীয় অংশ বা কোর এবং তার চারপাশের ম্যান্টলের পারস্পরিক ক্রিয়ার সঙ্গে এ পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে ঠিক কোন শক্তি এর পেছনে কাজ করে, তা স্পষ্ট ছিল না।
নতুন এক গবেষণায় সেই রহস্যের সম্ভাব্য ব্যাখ্যা পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। তাদের মতে, পৃথিবীর গভীরে মহাকর্ষ, তড়িৎচুম্বকীয় বল এবং যান্ত্রিক শক্তির মধ্যে চলা এক ধরনের ‘টানাটানি’ পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতিতে সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব আলবার্টার ভূ-পদার্থবিদ ম্যাথিউ ডামবেরি ও তার সহকর্মী হুইফেং ঝাং এ গবেষণা পরিচালনা করেন। তাদের তৈরি মডেল বলছে, পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষুদ্র পরিবর্তনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে মহাকর্ষীয় টর্ক বা ঘূর্ণন সৃষ্টিকারী মহাকর্ষীয় বল। তবে এই বল একা কাজ করছে না। এর বিপরীতে তড়িৎচুম্বকীয় ও যান্ত্রিক টর্কও কাজ করছে। ফলে পৃথিবীর গভীরে তৈরি হয়েছে এক জটিল শক্তির ভারসাম্য।
পৃথিবীর কেন্দ্রীয় অংশ বা কোর মূলত লোহা দিয়ে তৈরি। আকারে এটি প্রায় মঙ্গল গ্রহের সমান। এর সবচেয়ে ভেতরের অংশটি কঠিন, যাকে বলা হয় ‘ইনার কোর’ বা অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র। এর চারপাশে রয়েছে গলিত ধাতুর ‘আউটার কোর’ বা বহিঃকেন্দ্র। এই গলিত অংশের ওপর দিয়ে অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রটি পৃথিবীর অন্যান্য স্তরের তুলনায় স্বাধীনভাবে ঘুরতে পারে।
কোরের বাইরে রয়েছে কঠিন শিলাময় ম্যান্টল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, কোর ও ম্যান্টলের মধ্যে কয়েক ধরনের বল একসঙ্গে কাজ করে পৃথিবীর ঘূর্ণনের গতি বাড়ায় কিংবা কমায়। এর মধ্যে একটি হলো যান্ত্রিক টর্ক। গলিত বহিঃকেন্দ্রের ধাতু প্রবাহিত হওয়ার সময় ম্যান্টলের নিচের দিকের অসমান পৃষ্ঠে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিষয়টি অনেকটা নদীর স্রোত পাথরের চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার মতো।
দ্বিতীয় প্রক্রিয়াটি তড়িৎচুম্বকীয়। বহিঃকেন্দ্রের গলিত ধাতুর প্রবাহ থেকেই পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের বড় অংশ তৈরি হয়। এই চৌম্বক ক্ষেত্র ম্যান্টলের লোহাসমৃদ্ধ অংশের সঙ্গে ক্রিয়া করে এক ধরনের তড়িৎচুম্বকীয় টর্ক সৃষ্টি করতে পারে। তৃতীয় শক্তিটি আসে মহাকর্ষ থেকে। পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রের অপেক্ষাকৃত ঘন অংশগুলো ম্যান্টলের বেশি ঘন অংশের দিকে আকৃষ্ট হয়। এর ফলে সৃষ্টি হয় মহাকর্ষীয় টর্ক।
ডামবেরি ও ঝাং জানতে চেয়েছিলেন, এসব শক্তির কোন সমন্বয় পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যের বাস্তব পরিবর্তনের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এজন্য তারা একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করেন। এতে ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণার তথ্যও ব্যবহার করা হয়। ওই গবেষণায় ভূমিকম্পের সিসমিক তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে ১৯৬০-এর দশক থেকে পৃথিবীর অন্যান্য অংশের তুলনায় অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রের ঘূর্ণনের হার পরিমাপ করা হয়েছিল। সেই গবেষণায় দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র দীর্ঘ সময় ধরে পৃথিবীর বাকি অংশের তুলনায় সামান্য দ্রুত ঘুরছিল। তবে প্রায় ২০১০ সালের পর এর আপেক্ষিক ঘূর্ণনের গতি কমতে শুরু করে।
নতুন মডেলে দেখা গেছে, দিনের দৈর্ঘ্যের রেকর্ডকৃত পরিবর্তনের সঙ্গে সবচেয়ে ভালো মিল পাওয়া যায় তখনই, যখন মহাকর্ষীয় টর্ককে প্রধান শক্তি হিসেবে ধরা হয়। তবে একই সঙ্গে তড়িৎচুম্বকীয় ও যান্ত্রিক টর্ক বিপরীত দিকে কাজ করে মহাকর্ষীয় বলকে প্রতিহত করে। ঝাং বলেন, গবেষণার ফল পাওয়ার আগে তারা জানতেন না যে এসব শক্তি আসলে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।
এই টানাপড়েন অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রের ঘূর্ণনেও প্রভাব ফেলে। ডামবেরির ভাষায়, অভ্যন্তরীণ কেন্দ্র স্বাভাবিকভাবে ম্যান্টলের সঙ্গে একই অবস্থানে থাকতে চায়, কারণ উভয়ের ঘন অঞ্চলগুলো পরস্পরকে মহাকর্ষীয়ভাবে আকর্ষণ করে। কিন্তু বহিঃকেন্দ্রের সাধারণত পশ্চিমমুখী প্রবাহ অভ্যন্তরীণ কেন্দ্রকে সেই অবস্থান থেকে সরিয়ে দেয়। পরে মহাকর্ষ আবার ধীরে ধীরে তাকে পূর্বদিকে টেনে আগের অবস্থানের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
এই ক্রমাগত টানাটানিই শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর সামগ্রিক ঘূর্ণনে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিবর্তন ঘটায়। আর তার প্রভাব পড়ে আমাদের দিনের দৈর্ঘ্যে, যদিও সে পরিবর্তন এতটাই সামান্য যে সাধারণ জীবনে তা অনুভব করা যায় না।
গবেষকদের মতে, নতুন ফলাফল শুধু পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন বোঝাতেই সহায়তা করবে না, বরং গ্রহটির গভীরে থাকা রহস্যময় কাঠামো ও কোর-ম্যান্টলের পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিতে পারে।









