সকালের ব্যস্ততা শুরুর আগে এক কাপ কফি অনেকেরই নিত্যসঙ্গী। শরীর ও মনকে চাঙা করার পাশাপাশি কফি এখন বিশ্বজুড়ে একটি সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু জনপ্রিয় পানীয়টির যাত্রা শুরু হয়েছিল কোথা থেকে?

কফির উৎপত্তি নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত গল্পটি ইথিওপিয়ার। কথিত আছে, প্রায় ৮০০ খ্রিষ্টাব্দে কালদি নামের এক রাখাল বালক লক্ষ্য করে, তার ছাগলগুলো একটি গাছের লাল ফল খাওয়ার পর অস্বাভাবিকভাবে চনমনে হয়ে উঠেছে। কৌতূহল থেকে কালদি নিজেও ফলগুলো খেয়ে দেখে। সেও একই ধরনের চাঙা অনুভূতি পায়। পরে সেই ফল এক সন্ন্যাসীর কাছে নিয়ে যায় রাখাল। সন্ন্যাসীরা প্রথমে এগুলোকে ‘অশুভ’ মনে করে আগুনে ফেলে দেন। আঁচ লাগতেই ফল থেকে ছড়িয়ে পড়ে মন মাতানো এক সুবাস। পরে সেগুলো গরম পানিতে দিয়ে পান করে পরখ করা হয়। দেখা যায়, রাতে প্রার্থনার সময় জেগে থাকতে পানীয়টি বেশ কাজে আসছে।

তবে গল্পটি কফির প্রকৃত ইতিহাসের চেয়ে বহুল প্রচলিত এক কিংবদন্তি হিসেবেই বেশি পরিচিত। কফির উৎপত্তি ইথিওপিয়া ও উত্তর কেনিয়ার যাযাবর ওরোমো জনগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

কফিই

ইথিওপিয়া থেকে ইয়েমেনে

কফির ইতিহাসে ইয়েমেনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ধারণা করা হয়, ইথিওপিয়া থেকে লোহিত সাগর পেরিয়ে ১৫ শতকে কফি ইয়েমেনে পৌঁছায়। পরে সেখানে আরব অঞ্চলে এর চাষ শুরু হয়।

১৬ শতকের মধ্যে পারস্য, মিসর, সিরিয়া ও তুরস্কেও কফির পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। জেগে থাকা ও মনোযোগ ধরে রাখার গুণের কারণে ওই সময় আধ্যাত্মিক সাধনা ও প্রার্থনার ক্ষেত্রেও পানীয়টির ব্যবহার বাড়তে থাকে।

কফিহাউজ হয়ে উঠল আড্ডার কেন্দ্র

কনস্টান্টিনোপলে (বর্তমান ইস্তাম্বুল) ১৪৭৫ সালে বিশ্বের প্রথম কফিহাউজ চালু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সেখানে মানুষ শুধু কফি পান করতে যেত না। কফিহাউজে জমত গল্প ও আড্ডা, আদান-প্রদান হতো খবর, কেউ শুনত গান, কেউ খেলত দাবা আর চলত নানা বিষয়ে আলোচনা। আধুনিক যোগাযোগপ্রযুক্তি না থাকায় এসব কফিহাউজ তথ্য বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হয়ে ওঠে। এমনকি এগুলোকে ‘স্কুলস অব দ্য ওয়াইজ’ বা জ্ঞানীদের বিদ্যালয়ও বলা হতো।

Brazilian researchers remix coffee varieties to confront climate challenge

ইউরোপে কফির নতুন অধ্যায়

১৭ শতকের দিকে ইউরোপে পৌঁছে দ্রুত জনপ্রিয় হতে থাকে কফি। অনেকের মতে, ১৬৪৫ সালে ভেনিসে ইউরোপের প্রথম কফিহাউজ চালু হয়। এরপর ইংল্যান্ডেও কফির বিস্তার ঘটে। ১৬৫১ সালে অক্সফোর্ডে ও এরপর লন্ডনেও একের পর এক কফিহাউজ গড়ে ওঠে।

সেসব জায়গায় ব্যবসা, সংবাদ ও সামাজিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। তথ্যানুযায়ী, লন্ডনের কফিহাউজগুলোয় অনেক ব্যবসায়িক উদ্যোগ ও ধারণার সূচনা হয়েছিল বলে মনে করা হয়।

এশিয়া ও আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়া

কফির বিস্তার থেমে থাকেনি ইউরোপে। ১৬০০ সালের দিকে বাবা বুদান নামের এক মুসলিম তীর্থযাত্রী মক্কা থেকে ভারতে ফেরার সময় কয়েকটি কফিবিন গোপনে নিয়ে আসেন বলে প্রচলিত আছে। পরে এসব বীজ থেকেই আফ্রিকা ও আরবের বাইরে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক কফি শিল্পের ভিত্তি তৈরি হয়।

ডাচ ব্যবসায়ীরা ১৭ শতকের শেষ দিকে ইন্দোনেশিয়ায় কফি নিয়ে যায়। পরে সুমাত্রা, জাভা, বালি ও সুলাওয়েসিসহ বিভিন্ন দ্বীপে এর চাষ ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে ইউরোপীয় উপনিবেশকারীদের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরো কয়েকটি দেশেও কফির চাষ শুরু হয়।

তথ্যসূত্র নেসক্যাফে