পৃথিবী গোলাকার। কিন্তু আমরা যখন বই, টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় বিশ্বমানচিত্র দেখি, তখন সেটি থাকে সমতল। আর গোল পৃথিবীর পৃষ্ঠকে সমতল কাগজে বা পর্দায় তুলে ধরতে গেলেই তৈরি হয় বিকৃতি।
কোথাও মহাদেশের আয়তন ঠিক রাখা হয়, কোথাও আকৃতি বা দূরত্ব। আবার কোনো মানচিত্রে দিকনির্ণয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ফলে পৃথিবীকে সব দিক থেকে শতভাগ সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারে—এমন কোনো মানচিত্র নেই।
এ সমস্যার কারণে প্রচলিত বিশ্বমানচিত্র বদলের আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির সাধারণ পরিষদে গৃহীত ‘কারেক্ট দ্য ম্যাপ’ প্রস্তাবের লক্ষ্য হলো এমন একটি মানচিত্র ব্যবহারের প্রচলন করা, যাতে আফ্রিকার মতো বিশাল মহাদেশের প্রকৃত আয়তন আরো সঠিকভাবে বোঝা যায়।
বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত ‘মার্কেটর ম্যাপ’-এ আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডকে প্রায় একই আকারের মনে হয়। অথচ বাস্তবে আফ্রিকা গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় ১৪ গুণ বড়।
জাতিসংঘ এ সমস্যা মোকাবিলায় ‘ইকুয়াল আর্থ’ প্রজেকশন গ্রহণ করেছে। এতে বিভিন্ন ভূখণ্ডের প্রকৃত আয়তন তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভুলভাবে তুলে ধরা হয়। তবে এটিও সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না।
মার্কেটর ম্যাপ: নৌ-চলাচলে কার্যকর, আয়তনে বিভ্রান্তিকর
১৫৬৯ সালে ফ্লেমিশ মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর এ মানচিত্র তৈরি করেন। এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রে ইউরোপীয় নাবিকদের পথনির্দেশে সহায়তা করা।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের কার্টোগ্রাফি বিভাগের অধ্যাপক জেমস চেশায়ারের মতে, কম্পাসের একটি নির্দিষ্ট দিক অনুসরণ করে কোনো নাবিক বাস্তবে যে পথ ধরে এগোবেন, সেটিকে মানচিত্রে সরলরেখা হিসেবে দেখানোই ছিল মার্কেটর প্রজেকশনের মূল উদ্দেশ্য। আর এ কাজটি মার্কেটর ম্যাপ অত্যন্ত ভালোভাবে করতে পারে।
তবে এর জন্য পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতলে রূপান্তর করার সময় মেরুর দিকে ভূখণ্ডকে ক্রমেই বড় করে দেখাতে হয়। ফলে বিষুবরেখার কাছের অঞ্চলগুলো তুলনামূলকভাবে ছোট এবং মেরুর কাছের অঞ্চলগুলো অতিরিক্ত বড় দেখায়।
ঠিক এ কারণেই গ্রিনল্যান্ডকে আফ্রিকার কাছাকাছি আকারের মনে হয়। অথচ বাস্তবে দুই ভূখণ্ডের আয়তনের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে।
সাড়ে ৪০০ বছরের বেশি সময় পরও মার্কেটর প্রজেকশনের প্রভাব ব্যাপক। শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে টেলিভিশন ও অনলাইন—বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত বিশ্বমানচিত্রে এর ভিত্তি দেখা যায়। এমনকি গুগল ম্যাপসেও এটি ব্যবহৃত হয়েছে।
সমালোচকদের মতে, কোনো অঞ্চলকে প্রকৃত আকারের চেয়ে ছোট করে দেখানো শুধু মানচিত্রের বিষয় নয়; এর মানসিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও থাকতে পারে। বড় কোনো কিছুকে মানুষ সাধারণত বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। কেনিয়ার ভূগোলবিদ কিওকো মুয়েন্দোর মতে, মার্কেটর মানচিত্রে আফ্রিকাকে ছোট করে দেখানোর ফলে মহাদেশটির বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, জনসংখ্যা ও বিনিয়োগের সম্ভাবনাও পরোক্ষভাবে খাটো হয়ে এসেছে।

মার্কেটর ও ইকুয়াল আর্থ ম্যাপে আফ্রিকা
ইকুয়াল আর্থ: গুরুত্ব পেয়েছে আয়তন
মার্কেটর মানচিত্রের এ সীমাবদ্ধতা কাটাতেই ২০১৮ সালে একদল মানচিত্রবিদ তৈরি করেন ইকুয়াল আর্থ প্রজেকশন। এর লক্ষ্য ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের আয়তন ও আকৃতি তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরা।
১৯৬৩ সালের রবিনসন প্রজেকশন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি এ মানচিত্রে আফ্রিকা, গ্রিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন ভূখণ্ডের প্রকৃত আয়তনের পার্থক্য সহজে বোঝা যায়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোও এই মানচিত্র গ্রহণ করে।
তবে আয়তন সঠিক রাখতে গিয়ে ইকুয়াল আর্থকে মার্কেটরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ছাড়তে হয়েছে। এতে সরলরেখা ধরে কম্পাসের দিক অনুসরণ করা যায় না। বিভিন্ন স্থানের প্রকৃত দূরত্বও এই মানচিত্র থেকে নির্ভুলভাবে মাপা সম্ভব নয়।
অধ্যাপক চেশায়ারের ভাষায়, একটি মানচিত্রে একই সঙ্গে আয়তন, আকৃতি, দূরত্ব ও দিক—সবকিছু নিখুঁতভাবে ঠিক রাখা সম্ভব নয়। তা সম্ভব হলে আবার সমতল মানচিত্র নয়, গোল পৃথিবীতেই ফিরে যেতে হবে।
পিটার্স মানচিত্র: আয়তন ঠিক, আকৃতি বিকৃত
১৯৭০-এর দশকের শুরুতে জার্মান ইতিহাসবিদ আরনো পিটার্স তৈরি করেন পিটার্স বিশ্বমানচিত্র। এর ভিত্তি ১৮৫৫ সালে স্কটিশ মানচিত্রবিদ জেমস গ্যালের বর্ণিত একটি প্রজেকশন।
এ মানচিত্রে আকৃতির চেয়ে ভূখণ্ডের আয়তনের তুলনামূলক নির্ভুলতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ফলে আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডের আকারের প্রকৃত পার্থক্য বোঝা যায়।
তবে এর বিনিময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আকৃতি ব্যাপকভাবে বিকৃত হয়। মেরু অঞ্চলের ভূখণ্ড চ্যাপ্টা হয়ে যায়, আর বিষুবরেখার কাছের অঞ্চলগুলো অস্বাভাবিকভাবে লম্বাটে দেখায়। ফলে রাশিয়ার মতো দেশকেও বাস্তবের তুলনায় ভিন্ন আকারের মনে হতে পারে।
এছাড়া পিটার্স মানচিত্রের সরলরেখাগুলো কম্পাসের নির্দিষ্ট দিক নির্দেশ করে না। তাই নৌ-চলাচলের জন্য এটি কার্যকর নয়।
বিশ্বমানচিত্রে বৈচিত্র্য এখানেই শেষ নয়
পৃথিবীকে দেখানোর আরো অনেক পদ্ধতি রয়েছে। অ্যাজিমুথাল ইকুইডিস্ট্যান্ট প্রজেকশন এমন একটি মানচিত্র, যেখানে একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্র থেকে বিভিন্ন স্থানের দূরত্ব সঠিকভাবে দেখানো হয়। জাতিসংঘের পতাকায় ব্যবহৃত বিশ্বমানচিত্র এর একটি উদাহরণ। সেখানে উত্তর মেরুকে কেন্দ্র করে পৃথিবীকে দেখানো হয়েছে।
আবার সাউথ-আপ বা উল্টো মানচিত্রে প্রচলিত ধারণার বিপরীতে পৃথিবীর দক্ষিণাঞ্চলকে ওপরে এবং উত্তরাঞ্চলকে নিচে দেখানো হয়। অর্থাৎ প্রচলিত উত্তর-ওপরের মানচিত্রকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিলে যে চিত্র পাওয়া যায়, সেটিই সাউথ-আপ মানচিত্র।
বোঝাই যাচ্ছে, মানচিত্র শুধু পৃথিবীর ভৌগোলিক চিত্র নয়; এটি পৃথিবীকে আমরা কীভাবে দেখি, সেটিও প্রভাবিত করে। আর গোল পৃথিবীকে সমতলে তুলে ধরার সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো মানচিত্রই সবকিছু একসঙ্গে নিখুঁতভাবে দেখাতে পারে না। বরং কোন তথ্যটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ—আয়তন, আকৃতি, দূরত্ব নাকি দিক—তার ওপর নির্ভর করেই বেছে নিতে হয় উপযুক্ত মানচিত্র।
বিবিসি অবলম্বনে









