রাজধানীর শেরেবাংলা নগর বলতে সবার আগে চোখে ভেসে ওঠে জাতীয় সংসদ ভবন, এর বিশাল কংক্রিটের দেয়াল, জ্যামিতিক নকশা, চারপাশের জলরাশি আর সবুজ প্রান্তর। কিন্তু এসব পরিচিত দৃশ্যের অন্তরালে রয়েছে নগর-পরিকল্পনার এক আধুনিক ইতিহাস। সচিবালয় ছিল এর গুরুত্বপুর্ণ, যা এতদিন রাজধানীর অপর অংশে থাকলেও এবার ফিরছে মহাপরিকল্পনার সীমানায়।

যে কারণে প্রসঙ্গটি সামনে এল— রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সম্প্রতি সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার ২৫তম বৈঠকে প্রস্তাবটি অনুমোদন পায়। ২০২৯ সাল থেকে নতুন এ কমপ্লেক্স থেকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও দফতরগুলোর কার্যক্রম শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, বিখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের তৈরি মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী আগারগাঁওয়ে প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জমির ওপর নতুন এ সচিবালয় নির্মাণ হবে। পুরো প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন হবে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কথা অনুযায়ী বিখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের তৈরি মাস্টারপ্ল্যান কেমন ছিল? সে ইতিহাসই বা কেমন ছিল? সে বিষয়ে জানা যাক এবার।

মার্কিন স্থপতি লুই আই কান শেরেবাংলা নগরকে শুধু সংসদ ভবনের অবস্থান হিসেবে কল্পনা করেননি। তার পরিকল্পনায় এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ রাজধানী কমপ্লেক্স, যেখানে আইনসভা ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি প্রশাসন, আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও নাগরিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠার কথা ছিল। সংসদ ভবন ছিল সেই বিশাল পরিকল্পনার কেন্দ্র, পুরো পরিকল্পনা নয়।

এ ইতিহাসের সূচনা ষাটের দশকে, যখন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়নি। তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক সম্পদের বণ্টন নিয়ে বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় রাজধানী ও জাতীয় পরিষদ কমপ্লেক্স গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়। ঢাকার উত্তরাংশে প্রায় এক হাজার একর জমি নিয়ে শুরু হয় এ পরিকল্পনা। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পটি স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্সে রূপ নেয়।

louis_i_kahn

লুই আই কান (১৯০১-১৯৭৪) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী স্থপতি। এস্তোনিয়ায় জন্ম নেয়া কান শৈশবে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। স্থাপত্যে তার বিশেষ আগ্রহ ছিল আলো, জ্যামিতি, নির্মাণসামগ্রীর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং মানুষের সম্মিলিত জীবনের অর্থ নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সল্ক ইনস্টিটিউট ও কিমবেল আর্ট মিউজিয়ামের মতো স্থাপনার পাশাপাশি ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন তার গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি।

কান-কে ঢাকার প্রকল্পে যুক্ত করার ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান তথা পরবর্তী বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যের পথিকৃৎ মাজহারুল ইসলামের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক মানের স্থাপত্যচর্চার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ তৈরিতে তিনি উদ্যোগী ছিলেন। স্থাপত্যবিষয়ক গবেষণায় বলা হয়েছে, মাজহারুল ইসলামের সুপারিশেই পাকিস্তান সরকারের গণপূর্ত বিভাগ কানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। ১৯৬২ সালে প্রকল্পের সূচনা হলেও আনুষ্ঠানিক নিয়োগের সময় নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ১৯৬২ ও ১৯৬৩ সালের উল্লেখ পাওয়া যায়।

বোঝাই যাচ্ছে, কেবল একটি সংসদ ভবনের নকশা তৈরি কানের দায়িত্ব ছিল না। তাকে এমন একটি নগর-পরিকল্পনা করতে হয়েছিল, যেখানে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজস্ব পরিচয় নিয়ে অবস্থান করবে। সংসদ, আদালত ও সচিবালয়ের পাশাপাশি কোথায় হাসপাতাল, গ্রন্থাগার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, আবাসন ও বিনোদনের জায়গা থাকবে, সেটিও ছিল তার পরিকল্পনার অংশ।

কানের প্রাথমিক পরিকল্পনায় দুটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্রের ধারণা ছিল। স্থাপত্যবিষয়ক গবেষণায় যাকে সিটাডেল অব অ্যাসেম্বলি এবং সিটাডেল অব ইনস্টিটিউশনস বলা হয়েছে। প্রথমটিতে জাতীয় পরিষদ ভবন, সুপ্রিম কোর্ট, মসজিদ এবং সংসদ সদস্য ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আবাসনের মতো স্থাপনা রাখার কথা ছিল। দ্বিতীয়টিতে পরিকল্পনা করা হয়েছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গ্রন্থাগার, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ক্রীড়াঙ্গন, বাজার ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা। এ বিন্যাসে আইনসভা ছিল রাষ্ট্রের সম্মিলিত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র, আর অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিক জীবনের বহুমুখী প্রয়োজন মেটানোর কথা ছিল।

প্রাথমিক নকশায় সচিবালয়, সরকারি দফতর, বিজ্ঞান ও চারুকলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, গ্রন্থাগার, মসজিদ, বাজার, স্টেডিয়াম এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের আবাসনের পরিকল্পনাও ছিল। সংসদ সদস্যদের জন্য হোস্টেল, মন্ত্রী ও সচিবদের আবাসন এবং সরকারি কর্মচারীদের বসবাসের জায়গা নির্ধারণের ধারণা ছিল। অর্থাৎ শেরেবাংলা নগরকে শুধু প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের এলাকা হিসেবে নয়, বসবাস ও নাগরিক জীবনের উপযোগী একটি পরিকল্পিত নগর হিসেবেও গড়ে তোলার কথা ভাবা হয়েছিল। তবে এসব প্রস্তাবের সবগুলো কানের শেষ মাস্টার প্লানেও অপরিবর্তিত ছিল না। ১৯৬২ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনার একাধিক সংস্করণ তৈরি হয়; বিভিন্ন পর্যায়ে স্থাপনার অবস্থান ও বিন্যাসে পরিবর্তন আসে।

এ পরিকল্পনার সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ জাতীয় সংসদ ভবন। কানের কাছে সংসদ ছিল শুধু আইন প্রণয়নের জায়গা নয়, মানুষের সম্মিলিত রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রতীক। তাই ভবনটিকে আশপাশের স্থাপনার ভিড়ে হারিয়ে যেতে দেয়া হয়নি। বিশাল কংক্রিটের দেয়াল, বৃত্ত ও ত্রিভুজের মতো জ্যামিতিক আকৃতি, দীর্ঘ প্রবেশপথ এবং নিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক আলো ভবনটিকে স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে। চারপাশের জলরাশি ও উন্মুক্ত প্রাঙ্গণও এই স্থাপত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলো ভবনের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পুরো কমপ্লেক্সের স্থানিক বিন্যাস ও দৃশ্যমানতা তৈরি করেছে।

louis_i_kahn2

জাতীয় সংসদ ভবনের নকশা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রকল্পটির রাজনৈতিক অর্থ বদলে যায়। পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানীর জন্য পরিকল্পিত স্থাপত্য নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্সে রূপ নেয়। কিন্তু কানের বৃহত্তর মাস্টার প্লানের সব অংশ বাস্তবায়িত হয়নি। সংসদ ভবন ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু স্থাপনা নির্মিত হলেও প্রস্তাবিত সচিবালয়, গ্রন্থাগার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার অনেক কিছু তার পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তব রূপ পায়নি। তার মৃত্যুর আগে ১৯৭৪ সালেও প্রকল্পের সব অংশের কাজ শেষ হয়নি।

শেরেবাংলা নগরের উন্মুক্ত জায়গা, হ্রদ ও সবুজ প্রান্তর নিয়ে পরবর্তী সময়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার পেছনেও এ বৃহত্তর পরিকল্পনার গুরুত্ব রয়েছে। কানের নকশায় খোলা জায়গাগুলো অব্যবহৃত জমি ছিল না; ভবন, জলরাশি, প্রাঙ্গণ ও উদ্যানের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমেই পুরো কমপ্লেক্সের স্থাপত্যিক পরিচয় গড়ে উঠেছিল। ফলে এসব জায়গায় নতুন স্থাপনা নির্মাণ করলে শুধু জমির ব্যবহার বদলায় না, পরিবর্তিত হতে পারে পুরো কমপ্লেক্সের ভারসাম্যও।

লুই আই কানের পরিকল্পনা দেখায়, একটি রাষ্ট্রীয় ভবন কীভাবে বৃহত্তর নগর-পরিকল্পনার কেন্দ্র হতে পারে, যেখানে প্রশাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, আবাসন ও নাগরিক জীবন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাজধানী গড়ার পরিকল্পনা স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ কমপ্লেক্সে রূপ নিলেও কানের মহাপরিকল্পনার অনেক অংশ অসম্পূর্ণ থেকে গেছে। আজকের শেরেবাংলা নগর তাই একদিকে তার স্থাপত্যদর্শনের বাস্তব নিদর্শন, অন্যদিকে একটি বৃহত্তর নগর-পরিকল্পনার অসম্পূর্ণ ইতিহাস।