“Angli et Franci”—এই লাতিন শব্দগুলো বাইয়ু ট্যাপেস্ট্রিতে সূচিকর্ম দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মজার ব্যপার, সম্ভবত এখানেই প্রথমবারের মতো ইংরেজ ও ফরাসিদের নাম একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত দেশ (এমনকি জাতি) দুটির প্রতিদ্বন্দ্বি মনোভাব শতাব্দী প্রাচীন এবং আজও বহু সংস্কৃতিতে প্রতিফলিত। কিন্তু মহাকাব্যিক বাইয়ু ট্যাপেস্ট্রিতে বিজয় থেকে বিভীষিকায় নাটকীয় রূপান্তর দেখা যায়। সেখানে এক জায়গায় লেখা, ‘এইখানে একই সময়ে ইংরেজ ও ফরাসিরা যুদ্ধে পতিত হয়।’ কালো অক্ষরে লেখা এই বাক্যের নিচে ঘোড়া এবং বর্ম পরা যোদ্ধারা ছিটকে পড়ে গেছে—কেউ উল্টো হয়ে, কেউ রক্তাক্ত অবস্থায়—এক বিভীষিকাময় বিশৃঙ্খলা। চিত্রের নিচের প্রান্তসীমায় পড়ে আছে মৃতদেহ ও একটি কাটা মস্তক।
অ্যাংলি এবং ফ্রাঙ্কিদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে, ৭০ মিটার দীর্ঘ এই শিল্পকর্মটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নর্মান্ডির বাইয়ু শহরে সংরক্ষিত। এটি প্রদর্শিত হবে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। বিনিময়ে সাটন হুর ধনরত্ন ও লুইস দাবার গুটি ফ্রান্সে যাবে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই প্রদর্শনী শুরু হবে। ধরেই নেয়া যায় এটি নিঃসন্দেহে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের অন্যতম জনপ্রিয় প্রদর্শনী হয়ে উঠবে। কেননা প্রতিটি ব্রিটিশ স্কুলশিক্ষার্থী জানে, এটি শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়, এটি তাদের ইতিহাস ও পরিচয়ের একটি দলিল।
শিল্পকর্মটি তাদের নিরাশ করবে না। এটি এক শক্তিশালী যুদ্ধের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চিত্রায়ন যা আগে কখনো তৈরি হয়নি। এর পাশে ট্রোজানের স্তম্ভে রোমের ডাসিয়ান যুদ্ধ অথবা লুভর মিউজিয়ামে নেপোলিয়নের যুদ্ধচিত্রগুলো নিষ্প্রাণ মনে হয়। কল্পনা করুন, যদি রিডলি স্কট তার সেরা সময়ে হ্যাস্টিংসের যুদ্ধ রিয়ে একটি সিনেমা বানাতেন, যেখানে কাটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ স্ক্রিনের দিকে উড়ে আসছে আর নরম্যানরা নরক উন্মুক্ত করছে—তবুও সেটা বাইয়ু ট্যাপেস্ট্রির মতো এতটা শ্বাসরুদ্ধকর হতো না। অত্যন্ত সরল, হাতে সেলাই করা চিত্রগুলো আপনাকে টেনে নিয়ে যায় বন্ধুত্ব ও বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিশোধ ও হতাশার এক বর্ণনায়, যেখানে মানুষের রুদ্ধ করা অনুভূতির দরজা খুলে যায়। এখানে যুদ্ধকে একদিকে গৌরবময় অভিযান, অন্যদিকে নিরর্থক হত্যাকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বাইয়ু ট্যাপেস্ট্রিতে যুদ্ধ এত স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হলো কেন? গবেষকরা মনে করেন নারীদের দ্বারা তৈরি হওয়া একটি সম্ভাব্য কারণ। ধারণা করা হয়, এটি তৈরির মূল উদ্যোক্তা ছিলেন বাইয়ুর বিশপ ও উইলিয়াম দ্য কনকোয়ারের সৎভাই ওডো। এটি সম্ভবত তৈরি হয়েছিল ক্যান্টারবেরিতে অ্যাংলো-স্যাক্সন অভিজাত নারীদের হাতে। সূচি করা একটি দৃশ্যে দেখা যায় একজন নারী ও একটি শিশু নরম্যান যোদ্ধাদের আগুন লাগানো একটি ঘর থেকে পালিয়ে যাচ্ছে। এটিকে উদাহরণ হিসেবে এনে বলা হয় এটি অবশ্যম্ভাবীভাবে নারীর দৃষ্টিভঙ্গিতে যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে প্রতিফলিত করে।
কিন্তু এর পরও এটি শান্তিবাদী, বা স্যাক্সনপন্থী নয়। এটি নরম্যান দৃষ্টিকোণ থেকে নরম্যান বিজয়ের গল্প বলে। নরম্যানরা কয়েক প্রজন্ম আগেও ভাইকিং ছিল। কিন্তু ১০৬০-এর দশকে তারা ইউরোপের নতুন সভ্যতার অংশ হয়ে উঠেছিল। এই সভ্যতা গঠিত ছিল সামন্ততন্ত্র ও বীরত্বের আদর্শের ওপর। ট্যাপেস্ট্রি মানুষকে নিয়ে যায় তাদের জগতে, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ঈশ্বরের সামনে শপথ নেওয়া এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর কাজ হলো সেই শপথ ভঙ্গ করা।
স্যাক্সন অভিজাত হ্যারল্ড গডউইনসনকে ঠিক এই কাজটি করতে দেখানো হয়েছে। শুরুতেই তাকে দেখা যায় সন্তানহীন ইংরেজ রাজা এডওয়ার্ডের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে, যার উত্তরাধিকারী হওয়ার আশা সে করে। তারপর সে তার প্রাসাদে যায়। প্রার্থনা ও ভোজ শেষে একটি ফ্রেঞ্চ ট্যুর শুরু করে। তার জাহাজ ঝড়ে পথভ্রষ্ট হয়। বন্দি হয় কিন্তু নরম্যান্ডির উইলিয়াম তাকে উদ্ধার করে। তারা যুদ্ধসঙ্গী হয়ে ওঠে। একসঙ্গে দুর্গ আক্রমণ করে। কিন্তু তারা সমান নয়। এক আবেগপূর্ণ দৃশ্যে হ্যারল্ডকে দেখা যায় পবিত্র নিদর্শনে হাত রেখে উইলিয়ামের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে।
সে শপথ করেছিল! পবিত্র নিদর্শনের ওপর! তাই যখন উইলিয়াম শুনলেন যে এই আনুগত্যের রীতির পরেও হ্যারল্ড ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেছে, তখন তিনি এক মুহূর্তও দ্বিধা করেন না। জাহাজ তৈরি হয়। অস্ত্র ও মদ বোঝাই হয়। নরম্যানরা হ্যারল্ডকে ধরতে আসে।

নৌকায় নদী পারের দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান
ট্যাপেস্ট্রিতে এই জগৎটি স্পষ্টভাবে চিহ্নিত, তীব্রভাবে জীবন্ত। এদের জীবন এতটাই আবেগপ্রবণ যে তারা কোনও বিষয়ে বিরোধ অবলম্বন নিয়ে ভাবেই না। বিশপ ওডো প্রত্যাশিতভাবে ভোজের আশীর্বাদ দেন। তারপরই দেখা যায়, তিনি যুদ্ধের কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। যখন যুদ্ধ একপাক্ষিক হত্যাযজ্ঞে রূপ নিচ্ছে—যেখানে কেউই জয়ী নয়—তখন বিশপ ওডোই নরম্যানদের উজ্জীবিত করেন। হঠাৎ করেই সবকিছু তাদের পক্ষে চলে যায়। প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত নরম্যানরা ব্যবহার করছিল নতুন উদ্ভাবিত রেকাব। ফলে তারা একসাথে ঘোড়ায় চড়তে ও বর্ষা নিক্ষেপ করতে পারত।
স্যাক্সনদের ঢালবেষ্টনী ভেঙে পড়ে। শেষ জীবিতদের ছোট ছোট দলে বিভক্ত করে ধ্বংস করে ফেলা হয়। হ্যারল্ড সেই বিখ্যাত তীরের আঘাতে বিদ্ধ হন—একটি সোজা কালো রেখা তার হেলমেটের নিচ দিয়ে ঢুকে যায়। সেখানে লেখা Harold Rex interfectus est, অর্থাৎ ‘রাজা হ্যারল্ড নিহত হয়েছেন’।
যখন যুদ্ধের পরিণতি স্থির হয়—জয় ও পরাজয় নির্ধারিত—ব্রিটেন তখন এক নতুন জায়গা। আমরা পরবর্তী ঘটনাগুলো দেখি না—যেমন দুর্গ নির্মাণ, উত্তরের নিপীড়ন, বা ডুমসডে বুক। কিন্তু সবই এই গল্পের মধ্যে ইঙ্গিত হিসেবে রয়ে যায়। উইলিয়ামের কঠোর রণকৌশলসম্পন্ন নাইটরা এক নতুন ধরণের জাতীয় রাষ্ট্রের স্থপতি হয়ে ওঠে।
ট্যাপেস্ট্রিটি এই ঘটনাগুলোকে এক মানবিক গল্পে রূপ দেয়। শুরুতে উইলিয়ামকে দেখা যায় এক উদার অভিজাত ব্যক্তি হিসেবে। সে তার বন্ধু হ্যারল্ডকে রক্ষা করছে। কিন্তু ক্রোধ তাকে আরও কঠিন করে তোলে। তার প্রতিশোধে আসে এক বিভীষিকাময় চূড়ান্ততা। শুধু হ্যারল্ড নয়, গোটা অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগকেই মরতে হয় শুধুমাত্র এক ভঙ্গ করা শপথ ও এক ব্যর্থ বন্ধুত্বের কারণে।
ট্যাপেস্ট্রিতে দেখার মতো পাঁচটি বিশেষ মুহূর্ত
—উইলিয়ামকে তার প্রভু হিসেবে আনুগত্যের শপথ নিতে এক আবেগঘন ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে হ্যারল্ড তার দুই হাত প্রসারিত করে পবিত্র নিদর্শনে হাত রাখে। উইলিয়াম সিংহাসনে বসে তাকে আদেশ করছেন। দৃশ্যটা যেন শেক্সপিয়রের কোনো নাটকের মতো।
— উইলিয়ামের যুদ্ধজাহাজের বহর যাত্রা শুরু করলে বোঝা যায়, নরম্যানরা কতটা সম্প্রতি ভাইকিং ছিল। এই লংশিপগুলো দেখতে অনেকটা রসকিল্ডের—ডেনমার্কে সংরক্ষিত নর্স জাহাজ—মতো। বিষয়টি ইতিহাসবিদ মার্ক মরিস লক্ষ করেছেন। সূচিকর্মের শিল্প নিপুণ। প্রতিটি জাহাজ ও পালা রঙিন ডোরায় আঁকা। নিচের দানবগুলো নিছক মজা করার জন্য যুক্ত।
—বীরত্বগাথার গল্প হঠাৎ নিষ্ঠুর বাস্তবতায় রূপ নেয়। কোনো সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই নর্মানরা একটি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়, আর একজন নারী ও শিশু অল্পের জন্য পালাতে সক্ষম হয়। মা যেন মুখ তুলে প্রশ্ন করছে: “কেন?”
—দেখো, ওরা তো হাত ছাড়াই ঘোড়া চালাচ্ছে! এক ইস্পাতের নদীতে, নর্মান অশ্বারোহীরা আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে—এক শৃঙ্খলাপূর্ণ, দুর্দমনীয় বাহিনী। তাদের পা অত্যাধুনিক রেকাবে। এটি তাদের বর্ষা সামলাতে ও ঢাল ব্যবহার করতে মনোযোগী রাখে। তবু, লড়াই রক্তাক্ত বিশৃঙ্খলায় পরিণত হবে।
—আর সব শেষ। হ্যারল্ড তার শেষ অনুচরদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে, চোখ বা মাথায় বিধে যাওয়া তীরে হাত রেখেছে। দর্শক অনুভব করতে পারেন তার বিস্ময়—হয়তো শেষ মুহূর্তে তীরটা টেনে বের করতে চাচ্ছে, না হয় অবিশ্বাসে ধরে রেখেছে। তার পায়ের কাছে মৃতদেহগুলো থেকে দামি চেইনমেল খুলে নেওয়া হচ্ছে।









