রাজধানীতে একসঙ্গে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হতে যাচ্ছে। রুট তিনটি হলো বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর (এমআরটি লাইন-১), হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা (লাইন-৫ নর্দান রুট) এবং গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি (লাইন-৫ সাউদার্ন রুট)। এর মধ্যে লাইন-১ ও লাইন-৫ নর্দান রুটের চারটি নির্মাণ প্যাকেজের চুক্তি গতকাল সই হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে প্রকল্প দুটির মাঠপর্যায়ে কাজ শুরুর প্রক্রিয়া শুরু হলো। তবে একসঙ্গে তিন রুটে কাজ চললে যানজট ও জনভোগান্তি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) বলছে, এমআরটি লাইন-৬-এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ট্রাফিক পরিকল্পনা করা হচ্ছে। বিকল্প সড়কসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও রাখা হবে।

উত্তরার দিয়াবাড়িতে মেট্রোরেল ভবনে গতকাল চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশ সরকার ও জাপানের সহায়তা সংস্থা জাইকার যৌথ অর্থায়নে প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক। তিনি বলেন, ‘নির্মাণকাজে নিরাপত্তা ও মানে আপস করা যাবে না। কাজ সময়মতো শেষ করতে হবে, যাতে মানুষের ভোগান্তি দীর্ঘ না হয়।’

চুক্তির আওতায় লাইন-১-এর একটি প্যাকেজে মেট্রো রাখা ও মেরামতের কেন্দ্র (ডিপো) এলাকায় ওয়ার্কশপ, ট্রেন রাখার শেড ও পরিচালনা কেন্দ্রসহ ৪৯টি স্থাপনা হবে। চুক্তি হয়েছে সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে। আরেকটি প্যাকেজে পাতালপথ যেখানে শেষ হয়ে উড়ালপথে উঠবে, সেখান থেকে বালু নদের শুরু পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটারের বেশি উড়াল রেলপথ এবং জোয়ার সাহারা, বোয়ালিয়া ও মস্তুল স্টেশন তৈরি হবে। এটির ঠিকাদার সিআরইসি-এমআইএল-এমবিইসি যৌথ উদ্যোগ।

লাইন-৫ নর্দান রুটের ডিপো প্যাকেজে প্রশাসনিক ভবন, নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, ট্রেন রাখার স্থান, গুদাম ও ওয়ার্কশপ হবে। চুক্তি হয়েছে সিপিসি-হানিল যৌথ উদ্যোগের সঙ্গে। আরেক প্যাকেজে হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার এবং নতুন বাজার থেকে ভাটারা পর্যন্ত সাড়ে ছয় কিলোমিটার উড়ালপথ ও পাঁচটি স্টেশন (হেমায়েতপুর, বালিয়াপুর, বিলামালিয়া, আমিনবাজার, ভাটারা) নির্মাণ হবে। এর ঠিকাদারও সিআরইসি-এমআইএল-এমবিইসি।

লাইন-১ কাজ করবে বিমানবন্দর সড়ক, প্রগতি সরণি, কুড়িল, বাড্ডা ও রামপুরা হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত। নর্দান রুটের পথ হেমায়েতপুর, আমিনবাজার, গাবতলী, মিরপুর, কচুক্ষেত, বনানী ও গুলশান হয়ে ভাটারা। সাউদার্ন রুট যাবে গাবতলী, কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদ গেট, রাসেল স্কোয়ার, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল ও আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি। তিন প্রকল্পের কাজ প্রায় একই সময়ে চলবে। লাইন-১-এর মেয়াদ ২০৩৩ সালের ডিসেম্বর, নর্দান রুটের লক্ষ্য ২০৩২ সালের ডিসেম্বর এবং সাউদার্ন রুটের সময়সীমা ২০৩৩ সালের আগস্ট।

2

ডিএমটিসিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, পাতাল মেট্রোর টানেল মাটির নিচ দিয়ে হওয়ায় ওপরের সড়কে প্রভাব তুলনামূলক কম পড়বে। লাইন-১-এর প্রায় ১৯ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার পাতালপথ। তবে স্টেশন ও ডিপো তৈরি, মাটির নিচে নামার খাদ খোঁড়া এবং পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন লাইন সরানোর সময় সড়কের কিছু অংশ সাময়িকভাবে বন্ধ বা সরু হতে পারে। সেখানে ব্যারিকেডের কারণে চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা আছে।

বাস্তবে এর প্রভাব এখনই দেখা যাচ্ছে। লাইন-১-এর আগাম কাজে প্রগতি সরণির বিভিন্ন অংশে যানজট হচ্ছে। কুড়িল থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত খোঁড়াখুঁড়ি ও নির্মাণসামগ্রীর কারণে সড়কের ব্যবহারযোগ্য জায়গা কমে গেছে। কুড়িল, যমুনা ফিউচার পার্ক, নর্দ্দা ও বাড্ডায় গাড়ির দীর্ঘ সারি পড়ছে। ধুলাবালি ও ফুটপাতের সমস্যায় পথচারীরাও ভুগছেন। একই এলাকায় ওয়াসার পানির লাইনের কাজও চাপ বাড়াচ্ছে।

বুয়েটের অধ্যাপক ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকায় কয়েকটি মেট্রোর নির্মাণকাজ একই সময়ে চলার জন্য বড় ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন। রাজধানীতে প্রধান সড়কের সংখ্যা কম। দুই-তিনটি প্রধান সড়কে একসঙ্গে কাজ চললে বিকল্প পথে যানবাহন পরিচালনার পর্যাপ্ত জায়গা থাকবে কিনা, তা বিবেচনায় নিতে হবে। বিপুলসংখ্যক যানবাহন কীভাবে সামাল দেয়া হবে, সে বিষয়ে আলাদা প্রকল্প নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।’

নর্দান রুট প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর সাড়ে ১৩ কিলোমিটার পাতাল ও সাড়ে ৬ কিলোমিটার উড়ালপথ। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর-গাবতলী অংশে দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কর্মজীবী মানুষের চাপ থাকে। গাবতলী ও মিরপুরের সড়কে জায়গা কমলে সাভার-আশুলিয়া থেকে শহরে ঢোকা এবং শহরের ভেতরে চলাচল, দুটিতেই ভোগান্তি বাড়তে পারে।

সাউদার্ন রুট প্রায় সাড়ে ১৭ কিলোমিটার। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত পাতাল, এরপর দাশেরকান্দি পর্যন্ত উড়ালপথের পরিকল্পনা আছে। কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদ গেট, কারওয়ান বাজারের মতো ব্যস্ত সড়কে কাজের জন্য জায়গা কমলে কেন্দ্রীয় ও বাণিজ্যিক এলাকায় জট বাড়তে পারে।

লাইন-৬ নির্মাণের সময় মিরপুর, ফার্মগেট ও মতিঝিলে দীর্ঘদিন জট, ধুলাবালি ও ফুটপাতে চলাচলের সমস্যা ছিল। নতুন প্রকল্পেও একই পরিস্থিতির শঙ্কা আছে। একাধিক রুটে একসঙ্গে কাজ হলে এক সড়কের চাপ আশপাশের সড়কেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পরিকল্পনা জানতে চাইলে সাউদার্ন রুটের প্রকল্প পরিচালক সেখ খলিলুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নির্মাণকাজের সময় যানজট কমাতে প্রকল্পের ট্রাফিক পরিকল্পনা অনুসরণ করা হবে। নির্মাণপ্রযুক্তি হিসেবে টপ-ডাউন পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। যেখানে প্রয়োজন, সেখানে বিকল্প সড়ক তৈরি করা হচ্ছে। এমআরটি লাইন-৬ নির্মাণের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথও সড়কের একেবারে কাছে না রেখে কিছুটা দূরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।’ এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী ঝুঁকি কমাতে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও জানান তিনি।