ইদানীংকালে বাংলাদেশের দৃশ্যশিল্পের পরিমণ্ডলে নারীশিল্পীদের সরব উপস্থিতি ও ক্রমবর্ধমান সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। প্রায় নিয়মিতই আমরা তাদের একক ও দলীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হতে দেখছি বিভিন্ন চিত্রশালায়। সে তুলনায় নারীদের দ্বৈত প্রদর্শনী তেমন অনুষ্ঠিত হয় না বললেই চলে। এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে সম্প্রতি লালমাটিয়ার শিল্পী পরিচালিত চিত্রশালা কলাকেন্দ্র শিল্পপ্রেমীদের উপহার দিল দুই নারীশিল্পীর একটি চমৎকার দ্বৈত চিত্রপ্রদর্শনী; নামটিও যার বেশ চিত্তাকর্ষক, আলিঙ্গনে মিলছুট, ইংরেজিতে Embracing Inharmonious। শিল্পীদ্বয় মাসুদা খাতুন জুঁই ও জাফরিন গুলশান দুই ভিন্ন প্রজন্মের প্রতিনিধি, ব্যক্তিগত জীবনে যাদের মধ্যে রয়েছে একই বিদ্যায়তনের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্ক। কিন্তু এ প্রজন্মের ব্যবধান কিংবা গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের বিষয়টি তাদের যুগল-প্রদর্শনী আয়োজনের পথে কোনো অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং শিল্পীদের উপস্থিতিতে প্রদর্শনী দেখে এবং তাদের সঙ্গে কথা বলে এ আলোচকের মনে হয়েছে, প্রদর্শনীর সূত্রে তাদের মধ্যে একধরনের সহযোগিতা, সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার অমূল্য অনুভূতির জন্ম হয়েছে, যা বর্তমানের এ পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও বহুধাবিভক্ত সময়ের প্রেক্ষাপটে এক পরম প্রাপ্তি সন্দেহ নেই।
প্রদর্শনীর মূলকথায় আসা যাক। দুই শিল্পীর মধ্যে অগ্রজ মাসুমা খাতুন জুঁই ব্যক্তিগত জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষক, ফলে তার প্রদর্শিত কাজের একটা বড় অংশজুড়ে রয়েছে স্থাপনাশিল্প। তবে জুঁইয়ের স্থাপনা শিল্পগুলোর আঙ্গিক, আধার ও আধেয় কিঞ্চিৎ স্বতন্ত্র এবং বেশ ব্যতিক্রমীও বটে; এই অর্থে যে সেসবের প্রধান প্রেরণা তিনি খুঁজে পান তার নিত্যদিনের জীপনযাপনের অনুষঙ্গে। তিনি লক্ষ করেন তার ঘরের সাহায্যকর্মী থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটে, বাজারহাটের সর্বত্র যে শ্রমজীবী, নিম্নবিত্ত নারীদের দেখা পাওয়া যায়, তাদের জীবন নিতান্তই সাদামাটা, বর্ণহীন, অপরিসর ও বাহুল্যবর্জিত। প্রায় একখানা ক্ষুদ্র বোঁচকা কিংবা পোঁটলায় এঁটে যাওয়ারই মতো। অথচ তাদের পরিধানে বরাবরই তিনি দেখেন সস্তা কিন্তু রঙচঙে, বহু বর্ণিল, ফুল-লতাপাতায় আকীর্ণ, উজ্জ্বল ছাপা শাড়ি ও পোশাকের বাহার। এ পর্যবেক্ষণ ও ভাবনা থেকেই তিনি তাদের পরিধেয় নানা রঙের চকমকে ছাপা শাড়ির কাপড় দিয়ে নিজহাতে তৈরি করেন ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের অগণিত বোঁচকা, গাঁটরি ও পোঁটলা-পুঁটলির পসরা। তারপর সেসব দিয়েই চিত্রশালার একটি ঘরের মেঝেজুড়ে নির্মাণ করেন তার নতুন ধারার স্থাপনাশিল্প, যার মধ্য দিয়ে তিনি ব্যক্ত করেন ধনি-দরিদ্রের সমাজসম্পর্ক, নারীপুরুষের প্রেম-অপ্রেমের ব্যাকরণ, মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক শোষণ, রাজনৈতিক টানাপড়েন ইত্যাদির বহুমাত্রিকতাকে। একই সঙ্গে নারীদেহের নানাবিধ জৈব প্রক্রিয়া, অনুভূতি-উপলব্ধি, অন্তর্গত রসায়ন ইত্যাদিকেও ভাষা দেন তিনি নানা ত্রিমাত্রিক শিল্পবস্তু সংগঠনের মাধ্যমে, যার প্রধান উপকরণও হয় বিবিধ বস্ত্রখণ্ড, তাতে লালরঙের প্রাধান্য নারীজন্মের চিরন্তন এক অম্লমধুর শরীরী অভিজ্ঞতার ইঙ্গিত দেয় আমাদের।
অবশ্য মাসুদা খাতুন জুঁই যে কেবল স্থাপনাশিল্পেই পারঙ্গম, তা কিন্তু নয়। তার নিদর্শন তিনি রেখেছেন প্রদর্শনীতে বেশ কয়েকটি জলরঙে আঁকা চিত্রকর্ম অন্তর্ভুক্ত করে। এ কাজগুলো মূলত প্রতিকৃতি চিত্র, যার উপজীব্য সে নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী নারীরাই, যাদের জীবনের গল্প নিয়ে তিনি নির্মাণ করেন তার স্থাপনাশিল্পগুলো। তবে এসব প্রতিকৃতি চিত্রের প্রকৃতি একটু আলাদা; তিনি মুখাবয়বগুলো অঙ্কনে মোটামুটি বাস্তব চরিত্রদের অনুসরণ করলেও তাতে যুক্ত করেন কিছু কাল্পনিক শিল্পোপকরণ; মাশরুম, লতাগুল্ম যার অন্যতম, যা এ চরিত্রদের বাস্তবের সীমানা ডিঙিয়ে নিয়ে যায় ভিন্ন এক পরিসরে, যেখানে স্বপ্ন ও কল্পনা; স্মৃতি, সত্তা ও ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে যায়। জুঁইয়ের জলরঙের এ চিত্রকর্মগুলোর শিল্পরীতিতেও কিছুটা স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় মেলে, তার অধীত প্রাচ্যকলারীতির প্রভাবেই সম্ভবত সেগুলোয় একধরনের মরমিয়া আবহের আমেজ পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে মাসুদা খাতুন জুঁই যে এ প্রদর্শনীর মাধ্যমে একজন সময় ও সমাজসচেতন, সত্যিকার সংবেদনশীল, সুদক্ষ শিল্পী হিসেবে নিজেকে পরিচিত করাতে সক্ষম হয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

শিল্পী: জাফরিন গুলশান
জুঁইয়ের ছাত্রী জাফরিন তার শিক্ষকের তুলনায় বুঝিবা কিছুটা অন্তর্মুখী স্বভাবের। তিনি তার একেবারেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির অঙ্গন ছেড়ে বাইরের বস্তু পৃথিবীতে পা বাড়াতে তেমন আগ্রহী নন। তার শিল্পভাবনা ও চর্চার আরাধ্য হয়ে ওঠে তাই প্রগাঢ় আত্মবীক্ষণ, ফলে তার অভিমুখ হয় নিজের শরীর, সত্তা, সম্পর্ক, দাম্পত্য, মাতৃত্ব, বাৎসল্য ইত্যাদি। এককথায় নারীত্বের মৌল সারাৎসারটুকু। বলাবাহুল্য, এর সঙ্গে তার সমাজ, স্বদেশ, সংস্কৃতি ও স্বসময়ের সংশ্লেষণও ঘটে, তবে তা পরোক্ষভাবে। জাফরিন গুলশান মূলত তার নারীসত্তাটিকেই আমর্ম উদযাপন করতে চান নানা অনুষঙ্গে ও বিচিত্র বিভঙ্গে। প্রথমত তিনি তার দৈহিক স্বাতন্ত্র্য ও জটিল মনোরসায়নকে বুঝে নিতে চান শিল্পের ভাষায়, সেই সঙ্গে প্রেম-অপ্রেম, দাম্পত্যের সুখ ও অসুখ, সর্বোপরি মাতৃত্বের বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির সঙ্গে একধরনের ব্যক্তিগত বোঝাপড়া সেরে তাকে জগতের সামনে মেলে ধরেন রঙে ও রেখায়, আকার ও ইঙ্গিতের মধ্যস্থতায়। তার ক্যানভাসে অবশ্য রঙের আধিক্য তেমনটি চোখে পড়ে না আমাদের, যেমনটি নেই তাতে বহুবিধ রূপকল্প ও অবয়বের জঙ্গমতা। এর পরিবর্তে আমরা সেখানে একপ্রকার সারল্য, স্থিরতা, অন্তর্মুখী প্রবণতা ও আত্ম-অবলোকন আনন্দের আস্বাদ পাই যেন। ‘চোখ’ তাই একটা গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ হয়ে দেখা দেয় জাফরিনের কাজে: সে চোখ কখনো তার নিজেরই আঁকা, নানারূপে ও আকৃতিতে, কখনোবা আবার খেলনা পুতুলের মুখাবয়ব থেকে সযত্নে উৎকলন করে এনে ক্যানভাসের শরীরে নবরূপে প্রতিস্থাপন করা। এ চোখ আদতে জাফরিনের নিজেকেই দেখা ও দেখানোর একটি প্রতীকী প্রয়াসমাত্র, যা দর্শককে উদ্বুদ্ধ করে তার চিত্রকর্মের উপরিতলকে অতিক্রম করে গভীর এক অর্থের অনুসন্ধানে ব্রতী হতে। জাফরিন তার একটি শিল্পকর্মে এ ছোট ছোট পুতুলের চোখ দিয়েই দর্শকের উদ্দেশে লিখে দেন একটি অমোঘ শব্দ: দেখ।
আঙ্গিকের দিক থেকে জাফরিন প্রধানত দ্বিমাত্রিক কাজেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেন বেশি, মূলত ড্রইং ও অ্যাক্রিলিকে করা পেইন্টিং; অবশ্য তার বেশকিছু কাজে মিশ্রমাধ্যমের সচেতন প্রয়াসও লক্ষণীয়। সেক্ষেত্রেও তিনি তার নারীজীবনেরই নানাবিধ গার্হস্থ্য উপাদান ও অনুষঙ্গকেই প্রাধান্য দেন, যাতে সেগুলো তার শিল্পীসত্তা ও শিল্পচিন্তার মৌল পরিসর থেকে খুব বেশি দূরে সরে যেতে না পারে। ত্রিমাত্রিক কাজেও যে জাফরিন যথেষ্ট কুশলী সেটি প্রদর্শনীতে অন্তর্ভুক্ত একটি বৃহদাকার স্থাপনাশিল্পেই প্রতীয়মান হয়েছে, তবে নারীর ঋতুকালীন অভিজ্ঞতার অনুষঙ্গে নির্মিত আরেকটি ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্মে এর সর্বোচ্চ নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ দেখি আমরা, যেখানে নানাবিধ বস্ত্রখণ্ড, একটি মেনস্ট্রুয়াল কাপ এবং সেটিকে ঘিরে অসংখ্য সুচের বৃত্তাকার বিন্যাসের মধ্য দিয়ে নারীর ঋতুচক্রের মতো অত্যন্ত জটিল মনোদৈহিক ও সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চটিকে উপস্থাপন করা হয়। পরিশেষে বলি, এ গুরুত্বপূর্ণ চিত্রপ্রদর্শনীটিতে দুই নারীর দুই ধরনের শিল্পযাত্রার, একটি অন্তর্মুখী ও অন্যটি বহির্মুখী, পরস্পর-আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের যে অপরূপ ঐক্য সাধিত হয়, তা নিঃসন্দেহে আমাদের সমকালীন শিল্পাঙ্গনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। শিল্পী মাসুদা খাতুন জুঁই ও জাফরিন গুলশানকে অভিনন্দন ও উষ্ণ অভিবাদন। উল্লেখ্য, এ প্রদর্শনী চলবে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত।









