চেয়ারসদৃশ সিংহাসনে বসে আছেন বাদশাহ শাহজাহান। তার হাতে ধরা একটি বাজপাখি। সামনে দাঁড়ানো শাহজাদা দারা শুকোহ। দুজনই অন্দরমহলের উপযোগী তুলনামূলক সাদামাটা পোশাক পরা। সিংহাসনটি কারুকার্যখচিত। বাদশাহর পাশে রাখা কারুকার্যময় খাপে তলোয়ার এবং তার পাশে একটি ঢাল। নিচে নকশাদার গালিচা। ১৬৩০-৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ছবিটি এঁকেছিলেন মোগল মিনিয়েচারের অন্যতম শিল্পী গোবর্ধন। ১৮ দশমিক ৮ বাই ১৩ দশমিক ৪ ইঞ্চির এ ছবি অনুসরণ করে ৮ দশমিক ২ বাই ৭ ইঞ্চির একটি স্কেচ করেছিলেন ডাচ শিল্পী রেমব্র্যাঁ।
ভারতের চিত্রকলা পাশ্চাত্যকে প্রভাবিত করেছে। এর মধ্যে অন্যতম প্রভাব মোগল চিত্রকলা। বিশেষত মোগল মিনিয়েচার থেকে পাশ্চাত্যের কয়েকজন শিল্পী প্রভাবিত হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে রেমব্র্যাঁ অন্যতম। রেমব্র্যাঁ হারমেনসজোন ফান রাইন (১৬০৬-৬৯) বাইবেলের নানা দৃশ্য, ইউরোপীয় অভিজাতদের জাঁকজমকপূর্ণ প্রতিকৃতি এবং অসংখ্য আত্মপ্রতিকৃতির জন্য তিনি বিখ্যাত।
রেমব্র্যাঁ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পী কখনো ভারত সফর করেননি। ফলে ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তার সরাসরি পরিচয়ের সুযোগ ছিল না। কিন্তু চিত্রকর্ম সংগ্রহের অভ্যাস ছিল তার। সেই সূত্রেই মোগল চিত্রকলার সঙ্গে তার পরিচয়। এরপর নিজস্ব ভঙ্গিতে মোগলদের প্রতিকৃতি আঁকেন রেমব্র্যাঁ। তার আঁকা ২৫টি ছবিতে স্থান পেয়েছেন বাদশাহ ও দরবারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। ১৬৫৬-৬১ সালের মধ্যে এসব ছবি এঁকেছেন তিনি।
রেমব্র্যাঁ গবেষকদের মতে, ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে এসব চিত্রকর্ম নেদারল্যান্ডসে গিয়েছিল। তাদের মাধ্যমেই মোগল চিত্রকর্মের সঙ্গে পরিচিত হন।
লন্ডনভিত্তিক মোগল দক্ষিণ এশিয়ার শিল্প ইতিহাসবিদ ও নাসের ডি. খালিলি কালেকশন অব ইসলামিক আর্টের ডেপুটি কিউরেটর মেহরিন চিদা-রাজভি বলেন, ‘সপ্তদশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সক্রিয় এক বাণিজ্যিক শক্তি। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মোগল দরবারের মধ্যে নিয়মিত পণ্য, শিল্পকর্ম ও নানা বস্তুর আদান-প্রদান হতো। ফলে ছবি, স্কেচ ও বিভিন্ন শিল্পনিদর্শনসহ নানা ধরনের বস্তু বিপুল পরিমাণে নেদারল্যান্ডসে পৌঁছত। রেমব্র্যাঁর মতো শিল্পীরা সেগুলো দেখার এবং নিঃসন্দেহে সেগুলোর নাগাল পাওয়ার সুযোগও পেতেন।’

চিদা-রাজভির মতে, ১৬৫৬-৬১ সালের মধ্যে রেমব্র্যাঁ মোগল চিত্রকর্মের ‘কপি’ বা নিজস্ব সংস্করণ তৈরি করেছিলেন। সম্ভবত এ সময়েই মোগল শিল্পের প্রতি তার আগ্রহ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তার ভাষায়, ‘রেমব্র্যাঁ এমন এক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে ছিলেন, যেখানে মোগল দক্ষিণ এশিয়াসহ ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্যিক যোগাযোগ থাকা অন্যান্য অঞ্চলের শিল্প সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক ছিল।’
মোগল বিশ্বের সঙ্গে এ পরিচয় রেমব্র্যাঁর শিল্পজীবনে এক অনন্য অধ্যায়ের সূচনা করে। শিল্প বিশারদ শ্রাডার মনে করেন, মোগল চিত্রকলায় প্রতিকৃতিই প্রধান অংশ হওয়ায় রেমব্র্যাঁ এর প্রতি আগ্রহী হন। তিনি বলেন, ‘তিনি নিজেও ছিলেন একজন প্রতিকৃতি শিল্পী। এছাড়া ডাচ সংস্কৃতিতে মোগলরা বেশ জনপ্রিয় ছিল। আর শাহজাহান ছিলেন রেমব্র্যাঁর সমসাময়িক।’
রেমব্র্যাঁ বিশেষজ্ঞ ও গবেষক অ্যামি গোলাহনি বলেন, ‘তার প্রথম দিকের কাজগুলোতে অপরিচিত বা বিদেশী বিষয়কে অন্য সময় ভূগোল ও সংস্কৃতির চিহ্ন হিসেবে ব্যবহারের আগ্রহ দেখা যায়।’
মোগল শাসকদের মধ্যে জাহাঙ্গীর, শাহজাহান, আওরঙ্গজেব ও মুসলিম পণ্ডিতদের প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন রেমব্র্যাঁ। শাহজাহান তার বিশেষ আগ্রহের বিষয় ছিলেন বলে মনে হয়। কারণ শাহজাহানের একাধিক প্রতিকৃতি করেছেন তিনি।
একটা প্রশ্ন জাগে—এসব ছবি কি নিছক অনুকৃতি? গবেষকরা মনে করেন, নিছক অনুকৃতি বলা যায় না। বরং ছবিগুলো ডাচ শিল্পীর নিজস্ব ব্যাখ্যা। তবু সেগুলো তার অসাধারণ অনুকরণক্ষমতার পরিচয় বহন করে। সবক’টি ড্রয়িং তিনি করেছিলেন তোরিনোকো নামের দামি জাপানি কাগজে। এগুলো সরাসরি জাপান থেকে সংগ্রহ করা হতো।
রেমব্র্যাঁর মোগল চিত্রগুলোয় রঙের ব্যবহার বেশি। চিদা-রাজভির মতে, রেমব্র্যাঁ সাধারণত আঁকা পাতার তুলনায় অনেক বড় পরিসরে কাজ করতেন। তার এ স্কেচগুলো হয়তো নিজের দক্ষতা বাড়ানোর অনুশীলন হিসেবেও তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
গোলাহনির ব্যাখ্যা রেমব্র্যাঁর এ পর্যায়ের শিল্পকর্মকে আরো স্পষ্ট করে। তিনি বলেন, ‘১৬৫০-এর দশক ছিল বৈচিত্র্যময় ও অত্যন্ত যত্নশীল শিল্পকলার দশক। মোগল ড্রয়িং তার একটি উদাহরণ। মোগল চিত্রকলার ক্ষেত্রে রেমব্র্যাঁ মূল শিল্পকর্মের কৌশল নিয়েই আগ্রহী ছিলেন।’
মোগল মিনিয়েচারে প্রতিটি ছবিতে প্রচুর উপাদান থাকলেও প্রতিটি উপাদানই স্পষ্ট ও গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ বিচিত্রর আঁকা ‘জুঝর সিংয়ের আত্মসমর্পণ’ ছবিটির কথা ভাবা যায়। ছবিতে শাহজাহানই মনোযোগের কেন্দ্র, কিন্তু জুঝর, গ্লোবের নকশা, পশ্চাৎপটও স্পষ্ট। এ মিনিয়েচারের আদলে রেমব্র্যাঁও একটি ছবি এঁকেছিলেন। ছবিটিতে শাহজাহান স্পষ্ট হলেও অন্য বিষয়গুলো বাদ পড়েছে। শাহজাহানের আরো একটি ছবিতে তাকে তার এক শিশুপুত্রের সঙ্গে দেখা যায়। এটিও কলম ও ব্রাউন ওয়াশে আঁকা।
মোগল মিনিয়েচারের মতো রঙিন না হলেও রেমব্র্যাঁর প্রতিটি ড্রয়িংয়েই মোগলদের শরীরের ভঙ্গি, পোশাক ও অলংকারের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া হয়েছে। রেমব্র্যাঁ মোগল পোশাকরীতিকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেছেন। তবু জামা (সেলাই করা লম্বা কোট), চাকদার (জামারই একধরনের পূর্ণ ঝুলের সংস্করণ, যা সাধারণত মসলিনে তৈরি হতো), নকশাদার পাটকা বা কোমরবন্ধ, গহনা, পাগড়ি এবং তার বিশেষ অলংকার সরপেচ, পাশাপাশি কারুকাজ করা জুতি (মোগল নারী-পুরুষ উভয়ের পরা সমতল, পা গলিয়ে পরার জুতা) ইত্যাদির সূক্ষ্মতার বিস্তারিত তিনি উপস্থাপন করেছেন ছবিতে।
এসব পোশাক ও অলংকার সামনাসামনি না দেখেও রেমব্র্যাঁ তা উপযুক্ত উপস্থাপন রাখতে চেষ্টা করেছেন। শাহজাহান ছাড়াও তার অংকনে এসেছেন জাহাঙ্গীর। একজন আমিরের সঙ্গে সাক্ষাতের দৃশ্যে তাকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। বাদামি ওয়াশ ও ধূসর কালির প্রায় একরঙা কম্পোজিশনের মধ্যে মোগল চেহারা ও সংস্কৃতির ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপাদানগুলোকে আলাদা করে তুলে ধরতে তিনি লাল ও হলুদ চক এবং লাল চকের ওয়াশ ব্যবহার করেছেন। জুতা, কোমরবন্ধ, পাগড়ির পিন, তলোয়ারের হাতলসহ বিভিন্ন অংশে এ রঙের ব্যবহার দেখা যায়।
মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যও তার আগ্রহের বিষয় ছিল। মোগল চরিত্রগুলোর নাক, দাড়ি ও গোঁফ তিনি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে এঁকেছেন। শাহজাহানের একটি প্রতিকৃতিতে তিনি সাদা দাড়ি এঁকেছেন। মমতাজ মহলের মৃত্যু-পরবর্তী শাহজাহানের শোকের কারণে তার চুল সাদা হয়ে যাওয়ার কথা প্রচলিত।
শ্রাডারের মতে, ‘অন্য একটি শিল্পরীতিতে কীভাবে প্রতিকৃতি তৈরি করা হয়, তা শেখার জন্যই রেমব্র্যাঁর কাছে অনুকরণ ছিল একটি পদ্ধতি।’
Four Mullahs Seated Under a Tree-এর রেমব্র্যাঁ সংস্করণের ক্ষেত্রে তিনি নিজের শিল্পরীতির সঙ্গে বেশকিছু নতুন উপাদানও যুক্ত করেছিলেন। অজ্ঞাত পরিচয় এক ভারতীয় শিল্পীর ১৬২৭-২৮ সালের মূল চিত্রে চার জ্ঞানী ব্যক্তিকে একটি কার্পেট পাতা বারান্দায় বসে আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যায়; তাদের সামনে রয়েছে বই। কিন্তু রেমব্র্যাঁ সংস্করণে কোনো বই নেই। বরং চরিত্রগুলোকে দেখা যায় একটি গাছের নিচে। কফির কাপের নকশা ও পটভূমির পরিবেশেও রয়েছে বেশকিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য।
গোলাহনির মতে, ‘মোগল চিত্রের ওপর ভিত্তি করে কলম ও কালিতে ড্রয়িং করার পর রেমব্র্যাঁ সমতল, স্থির এক শিল্পভাষার দিকে এগিয়ে যান, যেখানে রঙের ব্যবহার ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম। পরবর্তী সময়ের তার কয়েকটি চিত্রে এ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।’
মোগল মিনিয়েচারের সঙ্গে রেমব্র্যাঁর এ সম্পর্ক শুধু শিল্পরীতির প্রভাবের গল্প নয়। এটি আমস্টারডাম ও ইউরোপের বাইরের একটি পৃথিবীকে জানার তার আকাঙ্ক্ষারও প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি সংস্কৃতির পারস্পরিক আদান-প্রদান এবং ঘনিষ্ঠভাবে শেখার এক অসাধারণ ইতিহাস উন্মোচন করে। মানুষের মুখাবয়ব, পোশাক ও অলংকারের যে নিখুঁত বিবরণ তিনি তুলে ধরেছেন, তা তার বিশ্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির যথেষ্ট প্রমাণ। একই সঙ্গে এগুলো তাকে আজীবন কৌতূহলী, শেখার আগ্রহে উন্মুখ এবং নতুন কিছুর প্রতি উন্মুক্ত একজন শিল্পী হিসেবেও চিহ্নিত করে।










