বৃষ্টি ধোয়া গ্রীষ্মের পড়ন্ত এক বিকাল। তখনো ঢিমেতালে পড়ছে ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি। বৃষ্টির ছাঁট মাথায় নিয়ে উপস্থিত হই ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে। সেখানে চলছে কাজী সালাউদ্দিন আহমেদের একক চিত্রকর্ম প্রদর্শনী। মূলত এ উদ্দেশ্যেই যাওয়া শিল্পের ওই আঙিনায়। প্রত্যেকটি প্রদর্শনী নতুন কিছু দেখার সুযোগ এনে দেয়। এ যাত্রায়ও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। সেসব নিয়ে আজকের এ লেখা।
অকল্পিত নগর নির্মাণ এবং ধ্বংসের উপসংহারে বিশ্ব ভূগোলের নাগরিক হিসেবে শিল্পী বেদনার্ত হয়ে ওঠেন। সচেতনতার অনুভব থেকে তুলির আঁচড়ে শিল্পী ফুটিয়ে তোলেন তার নান্দনিক ভাবনা। সেই ভাবনার বিস্তার বুনতেই শিল্পী কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ তার চিত্রকর্ম নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন দর্শনার্থীদের সামনে, যার নাম ‘ধ্বংসাবশেষ’; যার পারিভাষিক অর্থ রাবিশ, বর্জিতাংশ, বাজে জিনিস। ‘বাজে’ শব্দের অর্থ অকেজো, নিরর্থক, ফালতু, অসার। কিন্তু শিল্পী সালাউদ্দিন আহমেদের শিল্পকর্মগুলো দেখার পর মনে হবে আরে! এই বাজে মানে তো প্রাণে বাজে। অর্থাৎ হৃদয়ে যে সুর বাজে। অনুরণিত করে। অবশ্য বিমূর্ত ধাঁচের চিত্রকর্মের এটাই বড় এক গুণ, যা অদেখা ভুবনের মাঝে এক অনুরণন ঘটায়। অনুভব ও বোধের শৈল্পিক রেখা হলো বিমূর্ত চিত্রকলা। এর উপস্থিতি হাজারও রূপে, যার অনুভূতি ব্যাখ্যাতীত। এর বিস্তৃতি ব্যাখ্যার জগতে না ঢুকি।

ফিরে আসি চলমান প্রদর্শনী প্রসঙ্গে। বৃহৎ গ্যালারির দেয়ালজুড়ে সাজানো হয়েছে ২৮টি চিত্রকর্ম। প্রদর্শন কক্ষের সদর দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই নজর কাড়বে দুটি চিত্রকর্ম। এ শিল্পকর্ম দুটি যেন আকাশে উড়ছে। কাছে গেলে মনে হবে নিছক ছোপ ছোপ লাল রঙের বিন্যাস। আদতে এর অর্থ কী! ওই যে আগে কিছুটা বলেছি। বিমূর্ত কলার মূল শক্তি ইঙ্গিত ও ইশারা, যা দর্শনার্থীদের মনে দ্রুত ইউটার্ন ঘটাতে পারে। সে যা-ই হোক, ফিরি এবার শিল্পীর করা আকাশে উড়ন্ত যান হেলিকপ্টার প্রসঙ্গে। যে যন্ত্র ব্যবহার করে দুর্বৃত্ত ও ক্ষমতালিপ্সুরা রক্তপিপাসু হয়ে উঠেছে। ধ্বংস করছে সভ্যতা। নগর এবং নগরের মানুষকে মেরে ফেলছে। মূলত এ শিল্পকর্ম দুটির বক্তব্য এটাই! শুধু এ দুটি শিল্পকর্মের ভাষাই নয়, সব চিত্রকর্মের আবেগও এক। এজন্য গ্যালারিতে ঝোলানো কোনো চিত্রকর্মের আলাদা কোনো নাম দেয়া হয়নি। দরজার পাশে লুকিয়ে থাকা আরেকটি শিল্পকর্ম যাতে নগরের ভবন ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ওই একই কাজ একটু সময় নিয়ে দেখলে মনে হবে এ তো জলাবদ্ধতার চিত্র। সামান্য বৃষ্টিতে যে শহর নরক যাতনার ককপিট হয়ে ওঠে। সেই শহরের পুরান ঢাকায় বেড়ে ওঠা শিল্পী কাজী সালাউদ্দিন আহমেদ। সেই যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার লক্ষ্যে তার তুলি তো নিশপিশ করবেই।

বলা যায় তার দীর্ঘশ্বাসের প্রতিফলনই এ চিত্রকর্মগুলো। গ্যালারিতে দেখা হয়ে গেল শিল্পীর সঙ্গে। প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘ধ্বংসাবশেষ’ কেন রাখা হলো তার কাছে জানতে চাইলে স্মিত হাস্যে শিল্পী বলেন, ‘এখানকার সব কাজের বোর্ড বানানো হয়েছে পুরনো খবরের কাগজ মণ্ড করে। অর্থাৎ আমার প্রয়াস ছিল ধ্বংস থেকে পুনরায় শিল্পে রূপ দেয়া। কাজের টেক্সচার ও বিষয় আঙ্গিক এক অভিন্ন সূত্রে গেঁথেছি। এজন্য শিরোনাম এমনটা রাখা হয়েছে।’
এ শিল্পীর কাজের ভুবন মূলত নগরকেন্দ্রিক। এজন্য নগরের জীবনযাপন ও যাতনার প্রতিফলন ঘটেছে তার কাজের মধ্যে। গাজা, ইউক্রেন, কাশ্মীরসহ জীবন বাঁচাতে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের হতাশা শিল্পীকে আলোড়িত করেছে। সেই তাগিদ থেকেই শিল্পীর এ কাজগুলো। শিল্পী অসহায় মানব জাতির জন্য একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদ অনুভব করেন। এ শিল্পী অতীতেও আলকাতরার টিন দিয়ে শিল্পকর্ম তৈরি করেছিলেন। আবার ফেলে দেয়া খবরের কাগজের ওপর চিত্রকর্ম এঁকে তো এশিয়ান গ্র্যান্ড পুরস্কারও জিতেছেন এ শিল্পী। পুরনো কাগজ সাধারণত বিভিন্ন প্যাকেজিংয়ের কাজে ব্যবহার করা হয়। সেটাকে তিনি মণ্ড করে বোর্ড বানিয়ে শিল্পে রূপ দিয়েছেন। পৃথিবীর কোনো বস্তুই যে নিঃশেষ হয় না। ফুরিয়েও যায় না। তার প্রমাণ মেলে এ প্রদর্শনীতে ঠাঁই পাওয়া ২৮টি চিত্রকর্মের দিকে তাকালে। মিশ্র মাধ্যমে করা এ কাজগুলোর আকার ২৬ বাই ৩২ ইঞ্চি। ঢাকার সংস্কৃতির পরিচিত আঙিনা হিসেবে পরিচিত এ প্রদর্শনগৃহ। এজন্য দর্শনার্থীদের উপস্থিতি থাকে নজরকাড়া। সেদিনও অনেকের সঙ্গে কথা হয় প্রদর্শনী প্রসঙ্গে। প্রথমে কথা হয় সুলতানা রাজিয়া নামের দর্শনার্থী সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এ চিত্রকর্মগুলো অনুভবের বিষয়। তাই প্রকৃত শিল্প সমালোচক ছাড়া ঠিকঠাক ব্যাখ্যা দেয়া সম্ভব নয়’ প্রদর্শনীর চিত্রকর্মগুলোকে যেন নিরীক্ষার চাঁছে ফেলে দেখছিলেন এক নারী। আক্ষরিক অর্থে তিনি প্রতিটি কাজকে পরীক্ষার মধ্যে রেখে দেখছেন। বুঝি পরখ করছেন। পরিচয়ের পর জানতে পারি তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। তার কাছে চিত্রকর্মগুলো সম্পর্কে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘শিল্পীর এ শৈল্পিক বয়ান শিল্পের সঙ্গে মানুষের অনুভূতির এবং নাগরিক সম্বন্ধীয় এক মেলবন্ধন তৈরি করেছে। তুলির আঁচড় এবং শিল্পীর অভ্যন্তরীণ অনুভূতির হাহাকার যেন শব্দ খুঁজে পেয়েছে প্রতিটি চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে। নাগরিক জীবন ও যান্ত্রিকতার মাঝে একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচার প্রয়াস যেন এ প্রদর্শনীর চিত্রকর্মগুলো।’

গ্যালারিতে শুধু রঙিন চিত্রকর্ম নয়, শিল্পকর্মও ঠাঁই দেয়া হয়েছে। তাতে শিল্পের মাত্রা আরো বেড়েছে বৈকি!
কথা হয় শিল্পী ও সমালোচক মোস্তফা জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শিল্পীরা সবসময় তাদের নিজস্ব ভাষায় বেদনাদায়ক ঘটনা, বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী নৃশংসতার প্রতি প্রতিক্রিয়া জানানোর উপায় খুঁজে বের করেন। তারা প্রায়ই রূপক ও প্রতীকের মাধ্যমে আবেগগত ও বাস্তবতা প্রকাশ করেন। সেটা অবশ্য রূপক হিসেবে। কাজী সালাউদ্দিন আহমেদও এর ব্যতিক্রম নন। তিনি কয়েকটি ধারাবাহিক কাজের জন্য বেশ পরিচিত। তিনি আধুনিক উন্নয়নের পথ তৈরি করার জন্য পুরান ঢাকার প্রাক-আধুনিক ভবন ধ্বংসের বেদনাকে দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করেছেন। আবার বিশ্বব্যাপী নৃশংসতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ ও ধ্বংস দেখে সালাহউদ্দিন চুপ থাকেননি। প্রতিবাদস্বরূপ চিত্রকর্ম এঁকেছেন।’

১৭ মে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে ৩১ মে পর্যন্ত। রোববার ব্যতীত প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের জন্য উন্মুক্ত গ্যালারির দুয়ার। সেই সঙ্গে শিল্প সমঝদারদের চিত্রকর্ম সংগ্রহের সুযোগও রয়েছে। কাজেই সময় করে ঘুরে আসতে পারেন শিল্পের এ বারান্দা থেকে।









