শিল্পীর কাজ কী? এর উত্তর অনেক কিছু হতে পারে। তবে কেবল বিমূর্ত চিত্র তৈরি বা পোর্ট্রেট আঁকাতেই একজন শিল্পীর সীমাবদ্ধ থাকার কথা না। তিনি সময়ের কথা বলবেন। তার সময়ের পরিবেশ, প্রকৃতি, অর্থনীতি ও সমাজচিন্তা উঠে আসবে শিল্পে। সবার না হলেও লস অ্যাঞ্জেলেসের শিল্পী রফিক আনাদোলের কাজে তার সময়টা উঠে আসে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে নিজের কাজে ব্যবহার করেন তিনি। এবারো তিনি রুম-সাইজড একটি ছবি উপস্থাপন করবেন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক মিটিংয়ে। দাভোসে হতে যাচ্ছে এ আয়োজন। সেখানে রফিকের উপস্থাপন করতে যাওয়া ছবিটিতে উঠে আসবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও পরিবেশের পরিবর্তন।

২০২৪ সালেও একটি ছবি উপস্থাপন করেছিলেন রফিক। সেই ছবির বিষয় ছিল রেইন ফরেস্ট ও সেখানকার গাছপালা ও ফুল। এবার তিনি বেছে নিয়েছেন জলবায়ু পরিবর্তন। বিশেষত অ্যান্টার্কটিকার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ যে হুমকির মতো সে বিষয়টা তুলে আনছেন। অ্যান্টার্কটিকার হিমবাহ গলে যাচ্ছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই। এমনকি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০২৫ সালে বিশেষ পদক্ষেপ নিচ্ছে হিমবাহ সংরক্ষণে। সেই বিষয়টিও মাথায় রেখে রফিক তার শিল্পকর্মটি ডিজাইন করেছেন। সেখানে হিমবাহর অবস্থার পাশাপাশি অ্যান্টার্কটিকার প্রাণিজগতের অবস্থাও উঠে আসবে।
চিত্রকর্মটিতে কোন বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন রফিক এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দি আর্ট নিউজপেপারকে তিনি বলেন, ‘হিমবাহ আর সেখানকার প্রাণিজগৎকে দেখার চেষ্টা করেছি।’ আনাদোল স্টুডিও কাজটি করেছে। সেটা করার জন্য তারা প্রচুর পরিমাণে তথ্য সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে ছিল অ্যান্টার্কটিকার পরিবেশের ছবি, সেখানকার জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে নানা তথ্য ও ছবি। প্রায় এক কোটি সেট তথ্য তারা ব্যবহার করেছেন শিল্পকর্মটি তৈরি করার জন্য।

আনাদোল ও তার দল বারবার আইসল্যান্ড, অ্যান্টার্কটিকা ও আরো নানা জায়গায় ভ্রমণ করে ছবিগুলো সংগ্রহ করেছেন। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা জরিপ করেছি। ভ্রমণ করেছি এক কোনা থেকে আরেক কোনায়। বরফের বড় বড় গুহা, টিলা দেখেছি। এর প্রাকৃতিক রূপ বোঝার চেষ্টা করেছি। চিত্রকর্ম তৈরির সূত্র হিসেবে এর ছবিগুলো আমরা ব্যবহার করেছি। এক্ষেত্রে বিভিন্ন কোণ থেকে ছবি নেয়া হয়েছে। আলোর ব্যবহারেও ভিন্নতা রেখে ছবি তোলা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মৌসুমে সেখানকার চিত্র নিয়েছিলাম আমরা।’
সবারই কম-বেশি জানা যে হিমবাহ পানির অন্যতম উৎস। এগুলো দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং হিমবাহ গলা পানির চাপে প্রকৃতির বিভিন্ন অংশে নানা পরিবর্তনও হচ্ছে।
আনাদোল তার কাজের মধ্যে নিজস্বতার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করেন। গত বছরও তিনি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে গিয়েছিলেন তার শিল্পকর্ম নিয়ে। সংস্থাটির শিল্প ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রধান জোসেফ ফাউলার আনাদোল সম্পর্কে উঁচু ধারণা পোষণ করেন। এমনকি আনাদোল যেভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তার সঙ্গে প্রকৃতিকে জুড়ে কাজটা করেছেন তা নিয়ে ফাউলার উচ্ছ্বসিত। তার মতে এ চিত্রকর্ম নিজেই এক ধরনের সংলাপ এবং সে বদলে যাওয়া প্রাকৃতিক পরিবেশ নিয়ে মানুষের (দর্শক) সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম।

শিল্পকর্মটি নিছক একটা ছবি নয়। এর সঙ্গে থাকবে মর্ফিং চেম্বার অর্কেস্ট্রার বাজনা ও কমেন্টারি। আনাদোল বলেন, ‘আমরা শৈল্পিক কাজ করতে চাই যেখানে কিছুটা নিরীক্ষা থাকবে। আর প্রতিটা কাজের পেছনেই উদ্দেশ্য থাকে মানুষকে অনুপ্রাণিত করা। এছাড়া মানবিকতার কথাও বলার চেষ্টা করি।’
আনাদোলের কাজ ফাউলার প্রথম দেখেন ২০২১ সালে। এরপর তাকে বড় পরিসরে কাজ করার জন্য তিনি আহ্বান জানান এবং আনাদোল রেইন ফরেস্টের চিত্রকর্ম নিয়ে হাজির হন ২০২২ সালে। আর্টিফিশিয়াল রিয়ালিটিজ: কোরাল তার অন্যতম শিল্পকর্ম।
আনাদোল এমন শিল্পকর্ম করতে উৎসাহী হলেন কেন? তিনি লক্ষ করেছিলেন কিছু ক্ষেত্রে একই সময় বিশ্বের গণ্যমান্য বহু ব্যক্তি এক স্থানে উপস্থিত হন। তিনি মনে করলেন এমন স্থানে একটা শিল্পকর্ম উপস্থাপন করা মানে একসঙ্গে অনেকের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল এতগুলো মানুষ যখন একটা উদযাপনের মধ্যে আছেন আমি তখন তাদের কাছে পৌঁছতে পারি। এখানে তাদের মনোযোগ পাওয়া যেমন সম্ভব, তেমনি শিল্প ও এর বিষয় নিয়ে সংলাপ হওয়াও সম্ভব। এমনকি তার প্রথম শিল্পকর্মটিও এমন পরিসরে উপস্থাপনের পর দারুণ মনোযোগ পেয়েছিল। এরপর সেটি মনোযোগ পায় জাতিসংঘের। রফিক আনাদোলের ভাষায়, ‘এভাবে একটা শিল্পকর্ম পরিণত হতো একটা অ্যাকটিভিস্ট আর্টওয়ার্কে।’
তবে এমন বিশেষ পরিসরে বিশেষ শিল্পকর্ম প্রদর্শন করেন বলে আনাদোল মনে করেন না যে শিল্প কোনো বিশেষ শ্রেণীর একচেটিয়া নয়। দ্য টকের সঙ্গে এক কথোপকথনে তিনি বলেন, ‘শিল্প সবার। সব বয়সের, সব স্থানের, সব ধরনের মানুষের। আর এটা ভাবতে আরো ভালো লাগে যে শিল্পীরা বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্নভাবে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করেন।’
চিত্রকর্ম কি শুধু জাদুঘরেই থাকবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে আনাদোল বলেন, ‘আমি মনে করি জাদুঘর বা গ্যালারিতে শিল্পকর্ম থাকা মানে মানুষ তার কাছে সহজে পৌঁছতে পারবে। কিন্তু সেখানেই শুধু সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্পকে আমি আরো নানা মাধ্যমে প্রচার ও গ্রহণ করতে চাই।’
চিত্রকর্ম তৈরির ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের বিষয়টিকে সাংস্কৃতিক সীমারেখা ভেদ করার মতো মনে করেন রফিক। তিনি বলেন, ‘আমি বহু পাবলিক প্লাটফর্ম থেকে ছবি সংগ্রহ করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তার মধ্যে অন্যতম। সেখান থেকে ছবি নেয়া মানে নানা ধরনের মানুষের মত নেয়া। এরপর তা থেকে অ্যালগরিদম অনুসারে নতুন কিছু তৈরি করি। আমার মনে হয় এর মধ্য দিয়ে আমাদের সামাজিক সীমারেখা ভাঙা হচ্ছে। এটা মানুষের সামষ্টিক স্মৃতি সংরক্ষণ করছে। আমরা সবাইকে গ্রহণ করতে পারছি। আমার কাছে এটা ইউটোপিয়ান স্বপ্নের মতো।’
দ্য টকস ও আর্ট নিউজপেপার অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান









