লন্ডনের শিল্পাঙ্গনে তৈমুর গ্রাহনে পরিচিত নাম। তিনি একজন যাযাবর শিল্প ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তবে তিনি এখন আর পুরোপুরি ভবঘুরে শিল্প ব্যবসায়ী নন। লন্ডন ও নিউইয়র্কে প্রায় ১৫ বছর ধরে কাজ করার পর এ ফিনিশ-লেবানিজ শিল্প ব্যবসায়ী এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষস্থানীয় আর্টস ডিস্ট্রিক্ট, আলসারকাল এভিনিউয়ে একটি নতুন প্রকল্প শুরু করছেন। সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ক্যারিয়ারজুড়ে বিভিন্ন গ্যালারি স্পেসে কাজ করেছেন। গ্রাহনে বরাবরই প্রচলিত ধারার বাইরে কাজ করেন। ১৫ বছর ধরে তিনি একটি ভবঘুরের জীবনযাপন করেছেন বললে ভুল হয় না। বিশ্বজুড়ে পপ-আপ প্রদর্শনী আয়োজন করেছেন। ধারাটি ব্যাখ্যা করা যাক। সাধারণত শিল্প প্রদর্শনী হয় একটি স্থায়ী গ্যালারিতে। কিন্তু তৈমুরের আয়োজন করা প্রদর্শনীর কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী গ্যালারি ছিল না। নিজের মতো একটি জায়গায় তিনি প্রদর্শনী আয়োজন করতেন। এছাড়া ৫০ জনের বেশি শিল্পীকে নিয়ে একটি পরীক্ষামূলক আয়োজন করেছেন। এদের মধ্যে আছেন অ্যামি লিংকন, ডমিনিক ফ্যাং, সামিরা আব্বাসি ও লতিফা আলাজলান।
গ্রাহনের শিল্পের সঙ্গে সংযোগ শুরু হয়েছিল মধ্যপ্রাচ্য থেকে। লন্ডনে জন্ম এবং লন্ডন, নিউইয়র্ক ও বৈরুতে বেড়ে ওঠা গ্রাহনের শিল্পে আগ্রহ এবং প্রথম পরিচয় হয়েছিল আরব অঞ্চলে। তার লেবানিজ দাদা, নুহাদ এস-সাঈদ ছিলেন ইসলামী ধাতব শিল্পের এক নিবেদিত সংগ্রাহক। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার স্পষ্ট মনে আছে আমরা ওয়াশিংটন ডিসিতে ছিলাম। কারণ তার সংগ্রহটি স্মিথসোনিয়ান মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হচ্ছিল। সেটাই আমার শিল্পের প্রতি প্রথম স্মৃতি।’

এরপর নিজেও শিল্প নিয়ে কাজ করেছেন তৈমুর এবং নিজের মতো ভিন্ন ধারায় কাজ করাই ছিল তার প্রিয়। বোস্টনে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পড়াশোনা করেছেন তৈমুর। সেই সময় তিনি প্রায়ই বৈরুতে পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। শহরের প্রাণবন্ত শিল্পজগৎ তাকে মুগ্ধ করত। অভিজ্ঞ গ্যালারিস্ট সালেহ বারাকাত এবং অভিজ্ঞ চিত্রশিল্পী মুনা সেহনাউইর সঙ্গে সাক্ষাৎ তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। সে আগ্রহ থেকেই শুরু হয় তার ব্লগ ‘আর্ট অব দ্য মিড ইস্ট’। এটি তিনি মাত্র ১৯ বছর বয়সে শুরু করেন। প্রদর্শনী পর্যালোচনা এবং শিল্পী ও সংগ্রাহকদের সাক্ষাৎকার নিয়ে ব্লগটি ধীরে ধীরে তাকে শিল্পজগতে প্রতিষ্ঠিত করে।
চার বছর ধরে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের উল্লেখযোগ্য সমসাময়িক শিল্পীদের উপস্থাপনায় নাম কামান। এদের মধ্যে আছেন ফরাসি-আলজেরিয়ান শিল্পী জিনেব সেদিরা ও কাতিয়া কামেলি, এমিরাতি শিল্পী মোহাম্মদ কাজেম এবং মরোক্কান ফটোগ্রাফার হাসান হজ্জাজ।
২০১৭ সালের দিকে গ্রাহনে নতুন যাত্রার জন্য প্রস্তুত হন। তিনি লন্ডনে ফিরে যান পরিবার ও বন্ধুদের কাছে থাকার জন্য। সেখানে তিনি নিজের নামেই একটি আর্ট অ্যাডভাইজরি প্রতিষ্ঠা করেন এবং অনলাইন ও পপ-আপ প্রদর্শনী শুরু করেন। সাউথ কেনসিংটনের ক্রোমওয়েল প্লেস এবং ফিৎসরোভিয়ার বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী করেন, যেখানে অংশ নেন আমেরিকান শিল্পী মাইয়া ক্রুজ পলিলেও ও গেইল স্পেইন এবং দক্ষিণ কোরিয়ান শিল্পী গাহি পার্ক।
কিন্তু গত বছর আবারো তার মধ্যে স্থান পরিবর্তনের তাড়না আসে এবং তিনি দুবাইয়ে স্থানান্তরের কথা গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘দুবাই আমার জন্য এখন এমন এক জায়গা, যেখানে আমি পৃথিবীর যেকোনো শহরের চেয়ে বেশি মানুষকে চিনি। এটা ভালো লাগে কারণ সবাই এখানে আছে। এটা এখন এক নতুন কেন্দ্রবিন্দু মনে হয়।’
সত্যি বলতে দুবাই গত কয়েক দশকে সত্যিই এই অঞ্চলের শিল্পবাজারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আলসারকাল এভিনিউ ছাড়াও আছে আর্ট দুবাই নামক অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং আন্তর্জাতিক আর্ট ফেয়ার। সোথবিস ও ক্রিস্টিজের মতো বৃহৎ অকশন হাউসও এখানে আধা স্থায়ী ভিত্তিতে বসেছে। এটি ইরান, তুরস্কসহ পুরো অঞ্চলের আধুনিক ও সমসাময়িক শিল্পকে তুলে ধরছে।
কাছেই শারজায় আছে প্রভাবশালী শারজা বিয়েনালে এবং বারজিল আর্ট ফাউন্ডেশন, যা আরব বিশ্বের শিল্পকর্ম প্রদর্শনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশের আমিরাত আবুধাবি হয়ে উঠছে দেশের মিউজিয়াম গন্তব্য, যেখানে আছে লুভর আবুধাবি এবং আসছে গুগেনহেইম আবুধাবি ও জায়েদ ন্যাশনাল মিউজিয়াম।
গ্রাহনের নতুন দুই-তলা স্পেস ‘তৈমুর গ্রাহনে প্রজেক্টস’-এ তিনি তার নিজস্বভাবে কাজ করছেন এবং একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছেন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি শিল্পীদের ‘প্রতিনিধিত্ব’ করার বদলে ‘সহযোগিতা’ শব্দটি ব্যবহার করতে চান এবং সাধারণ গ্যালারির বদলে ‘প্রকল্প স্থান’ ধারণাকে এগিয়ে নিতে চান।
দুবাইকে বেছে নেয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার জন্য এটা একটা প্রজেক্ট স্পেস। এখানে থাকবে আর্টিস্ট টকস, প্রদর্শনী ঘুরে দেখা। আমি চেষ্টা করব লোকজনকে গ্যালারিতে নিয়ে আসার। চলুন কফি খাই, আর চারপাশ ঘুরে দেখি।’
[আর্টসিতে প্রকাশিত রাওয়া তালাসের নিবন্ধ অনুসরণে লিখিত]









