সোনালি আকাশের নিচে, ধোঁয়ায় মুড়িয়ে আসা এক নদীপথে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে এক ছোট্ট বাষ্পচালিত টাগবোট। পেছনে বাঁধা বিশাল এক যুদ্ধজাহাজ, যার মায়াবী সাদা অবয়বটি এক অতীত গৌরবের ছায়া—দ্য ফাইটিং টেমেরেয়ার। ব্রিটিশ রাজকীয় নৌবাহিনীর কামানসমৃদ্ধ এ যুদ্ধজাহাজ একসময় ছিল নেপোলিয়নিক যুদ্ধের বীর নায়ক। ১৮৩৮ সালে তার সমস্ত গৌরব ফুরিয়ে এসে সে নামছে স্ক্র্যাপ ইয়ার্ডের পথে, ধ্বংস আর অবসানের দিকে। জেএমডব্লিউ টার্নারের হাতে আঁকা এ চিত্রকর্ম ‘দ্য ফাইটিং টেমেরেয়ার’ শিল্পপ্রেমীদের মনে দীর্ঘকাল ধরে এক বিষণ্নতার ছবি। একটি জাতির হারিয়ে যাওয়া গৌরব, এক যুদ্ধজাহাজের শেষ যাত্রা।
কিন্তু ভুলটা এখানেই করে বেশির ভাগ মানুষ। তারা এ ছবিকে ভেবে বসে অতীতের শোকগাথা, যাতে উহ্য থেকে যায় টার্নারের প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গি। যদিও তিনি শুধু পুরনো গৌরবের হারিয়ে যাওয়ার বিলাপ করছেন না। বরং তার তুলির রেখায় ফুটে উঠছে নতুনের উল্লাস ও প্রযুক্তির জয়গান। খেয়াল করলেই দেখা যায় বৃদ্ধ যুদ্ধজাহাজকে টেনে নিয়ে আসছে ছোট্ট স্টিম টাগবোট। যেটি আসলে কোনো ‘খলনায়ক’ নয়, বরং শিল্পবিপ্লবের বিজয়রথ, যা হাজার বছরের পালতোলা জাহাজের যুগকে বিদায় জানিয়ে নতুন যুগের সূচনা করছে। সেই সূচনা, সেই রূপান্তর—এটাই টার্নারের শিল্পী সত্তার আসল বিজয়। আর এখানেই ছবিটি বারবার ভুল বোঝা হয়েছে। মানুষ এটিকে দেখে কেবল অতীতের মৃত্যুগান হিসেবে, অথচ টার্নার আমাদের শোনাতে চেয়েছেন ভবিষ্যতের জয়গান।
‘দ্য ফাইটিং টেমেরেয়ার’ প্রথম প্রদর্শিত হয় ১৮৩৯ সালে। তখন থেকেই চিত্রকর্মটি ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করে। আজও এটি ব্রিটেনের সবচেয়ে প্রিয় চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে একটি।
চিত্রকর্মের শিরোনামে উল্লিখিত ‘টেমেরেয়ার’ হলো ব্রিটিশ নৌবাহিনীর একটি ৯৮ কামানের যুদ্ধজাহাজ। নেপোলিয়নিক যুদ্ধের সময় ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৮৩৮ সালে জাহাজটিকে ভেঙে ফেলা হয়। এর বিভিন্ন অংশ বিক্রি করা হয়, যা সমগ্র জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে। টার্নারের চিত্রকর্মে দেখা যায়, একসময়ের পরাক্রমশালী যুদ্ধজাহাজটিকে একটি আধুনিক বাষ্পীয় টাগবোট টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
২০১২ সালের জেমস বন্ড চলচ্চিত্র ‘স্কাইফল’-এ এ চিত্রকর্মের একটি সংক্ষিপ্ত দৃশ্য উপস্থাপন করা হয়, যা এর ব্যাপারে একটি জনপ্রিয় ধারণাকে তুলে ধরে। দৃশ্যটিতে বন্ড (ড্যানিয়েল ক্রেইগ) ও কিউ (বেন হুইশ) লন্ডনের ন্যাশনাল গ্যালারিতে বসে ‘দ্য ফাইটিং টেমেরেয়ার’-এর সামনে আলোচনা করেন। প্রযুক্তিপ্রেমী কিউ বলেন, ‘এটি আমাকে সর্বদা আবেগী করে তোলে। একটি মহান পুরনো যুদ্ধজাহাজকে অপমানজনকভাবে স্ক্র্যাপের জন্য টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
এ দৃশ্য চিত্রকর্মটির ব্যাপারে একটি প্রচলিত ধারণাকে প্রতিফলিত করে যে এটি অতীতের গৌরব ও বিলুপ্তির প্রতি এক ধরনের নস্টালজিয়া জাগায়। এ দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী, টেমেরেয়ার হলো চিত্রকর্মের নায়ক, আর খলনায়ক টাগবোটটি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ইংরেজ লেখক উইলিয়াম মেকপিস থ্যাকারি টাগবোটটিকে ‘ছোট, বিদ্বেষপূর্ণ, শয়তানি বাষ্পীয় জাহাজ’ বলে বর্ণনা করেন। আর আমেরিকান ঔপন্যাসিক হারমান মেলভিল একে ‘বামনাকার বাষ্পীয় টাগবোট’ বলে উল্লেখ করেন।
টেমেরেয়ারের পতন নিঃসন্দেহে ব্রিটিশদের জন্য একটি আবেগঘন মুহূর্ত ছিল। ১৮০৫ সালের ২১ অক্টোবর ট্রাফালগারের যুদ্ধে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অ্যাডমিরাল লর্ড নেলসনের ফ্ল্যাগশিপ এইচএমএস ভিক্টোরি ফরাসি জাহাজ রিডাউটেবলের আক্রমণের মুখে পড়লে টেমেরেয়ার এগিয়ে আসে। রিডাউটেবলের ওপর প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করে। এর ফলে ব্রিটিশ নৌবাহিনী যুদ্ধে জয়লাভ করে।
কিন্তু টার্নার তার চিত্রকর্মে কি শুধু অতীতের গৌরবকে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন? নাকি তার বার্তাটি আরো গভীর ছিল?
টার্নারের শিল্পে শুধু অতীতের প্রতি শ্রদ্ধাই নয়, বরং আধুনিকতার প্রতিও এক গভীর মুগ্ধতা ছিল। তার শিল্পকর্ম ছিল সমসাময়িক রোমান্টিসিজমের কিছুটা বিপরীত। দ্য ফাইটিং টেমেরেয়ারে টার্নার শুধু একটি জাহাজের শেষ যাত্রাই নয়, বরং একটি নতুন যুগের সূচনাকেও চিত্রিত করেছেন। বাষ্পীয় টাগবোটটি এ চিত্রকর্মের আসল কেন্দ্রবিন্দু, কারণ এটি শিল্পবিপ্লবের প্রতীক। টেমেরেয়ারের মতো পালতোলা জাহাজগুলো হাজার বছর ধরে সমুদ্রযাত্রার প্রধান মাধ্যম ছিল। কিন্তু বাষ্পশক্তি সেই ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। এটি নাবিকদের প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করেছিল, যেখানে আগে বাতাস ও জোয়ার-ভাটার ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না, সেখানে বাষ্পীয় ইঞ্জিন নিশ্চিত গতি ও শক্তি দিতে সক্ষম হয়েছিল।
টার্নারের দর্শন অনুযায়ী শিল্পীর দায়িত্ব শুধু অতীতের সৌন্দর্যকে অমর করা নয়, বরং নতুন যুগের সৌন্দর্যকেও আবিষ্কার করা। দ্য ফাইটিং টেমেরেয়ারে তিনি পুরনো ও নতুনের মধ্যে একটি নাটকীয় সংঘাত সৃষ্টি করেছেন, যা মানব ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ককে ইঙ্গিত করে।









