ঔপনিবেশিক যুগে অনেক ব্রিটিশ চিত্রকর ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করেছেন। এ ভ্রমণের উদ্দেশ্য বেশির ভাগ সময় ছিল স্থানীয় স্থাপত্য, প্রকৃতি ও জনজীবন চিত্রায়ণ করা। তাজমহল ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপত্য। সেকালেও এটি ছিল বহু ইংরেজ শিল্পীর জন্য বিশেষ আকর্ষণ ও অনুপ্রেরণার উৎস। তবে সময়ের ব্যবধানে তাদের তাজমহলকে দেখার দৃষ্টি বদলে গিয়েছিল। আর এ বদল ছিল ভারত নিয়ে ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন।
১৮ শতকের শেষ দিকের কথা। ১৭৮৩ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, প্রথম ব্রিটিশ পেশাদার ল্যান্ডস্কেপ চিত্রকর উইলিয়াম হজেস তাজমহল দেখতে আসেন। তিনি তাজমহলের স্থাপত্য কাঠামো, ভারসাম্যপূর্ণ গঠন ও গাণিতিক উপস্থাপনায় জোর দেন। দূর থেকে দেখা তাজমহলকে তিনি ‘নীল পটভূমিতে একটি নিখুঁত মুক্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
টমাস ড্যানিয়েল ও তার ভাতিজা উইলিয়াম ড্যানিয়েল ছিলেন বিখ্যাত ইংরেজ চিত্রশিল্পী যারা ১৭৮০-৯০-এর দশকে ভারতে এসেছিলেন। তারা একেবারে প্রারম্ভিক ঔপনিবেশিক যুগে ভারতীয় স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকেন। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অনেকটা বিস্ময়ে অভিভূত। তারা তাজমহলকে এক রহস্যময় ও রোমান্টিক সৌন্দর্যের নিদর্শন হিসেবে চিত্রায়ণ করেছিলেন। চিত্রগুলোয় অনেক সময় কুয়াশা, আলো-আঁধারি ও নিস্তব্ধতা দেখানো হতো, যেন এটি প্রাচীন, প্রায় ভুলে যাওয়া সভ্যতার চিহ্ন। এসব চিত্রকর্ম ইউরোপে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়। কারণ শিল্পকর্মগুলো অজানা ভারতকে তুলে ধরত। ড্যানিয়েলরা ইংল্যান্ডে ফিরে আসার পর ভারতে আঁকা তাদের ১৪৪টি শিল্পকর্ম (এর মধ্যে ছয়টি রঙহীন) ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। ১৭৯৫-১৮০৮ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশদের চিত্রকর্মে তাজমহলের উপস্থাপনা ছিল নন্দনতাত্ত্বিক। মোটকথা, ১৮০০ সালের আশপাশে ইউরোপীয় শিল্পীরা ভারতে নিজেদের কাজকে গবেষণাধর্মী ও নন্দনতাত্ত্বিক হিসেবে দেখতেন। চিত্রকর্মের ধরন ও উদ্দেশ্যে এমন ছিল যে তারা যেন বিশ্বের কাছে ভারতের ছবি তুলে ধরছেন।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ্য, ঔপনিবেশিক আমলে অনেক শিল্পী ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসকদের জন্য মানচিত্রধর্মী জলরঙ-চিত্র আঁকতেন। প্রখ্যাত শিল্পী সীতা রাম এ ধারার অন্যতম ছিলেন। সীতা রাম ভারতীয় চিত্রকর। তিনি তাজমহল নিয়ে বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘দ্য তাজমহল বাই মুনলাইট’ (চাঁদের আলোয় তাজমহল) আঁকেন ১৮১৫ সালে। এক্ষেত্রে তার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তা ফ্রান্সিস রডন। সীতা রামের চিত্রে চাঁদের আলোয় স্নাত তাজমহল, আশপাশে বাগান ও দিগন্তবিস্তৃত আকাশ প্রাঞ্জলভাবে ফুটে উঠেছে। চাঁদের আলোর বাস্তব অভিজ্ঞতায় সীতা রাম রাতে সরাসরি স্কেচ তৈরি করে ছবিটি সম্পন্ন করেন। এ ঘটনা সাক্ষ্য দেয়, সে সময় শুধু ইংল্যান্ডের চিত্রশিল্পীরাই নন, ব্রিটিশ সরকারের শীর্ষ প্রশাসকরাও তাদের অধীনে থাকা শিল্পীদের দিয়ে ছবি আঁকানোর ক্ষেত্রে তাজমহলের নান্দনিকতা ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।
১৯ শতকে এসে এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দেখা যায়। ১৯ শতকের শেষ অথবা ২০ শতকের শুরুর দিকে ইংরেজ শিল্পীরা ভারতকে অনেকটাই ভিন্নভাবে দেখছিলেন। ভারতে ব্রিটিশ শাসন তখন শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত। এর প্রভাব দেখা যায় ব্রিটিশ চিত্রশিল্পীদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও। এ সময় তাদের চোখে ছিল ঔপনিবেশিক প্রশাসকের চশমা, তুলিতে ছিল আধিপত্যের রঙ। তাজমহলকে তখন তারা শুধু রোমান্টিক সৌন্দর্যের নিদর্শন হিসেবে নয়, বরং এক ধরনের ঐতিহাসিক সম্পদ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। এ সময়কার চিত্রে অনেক সময় ভারতীয় স্থাপত্যের ওপর ব্রিটিশ কর্তৃত্বের প্রতিফলন দেখা যায়। যেমন বৃক্ষছায়া দিয়ে পরিবেষ্টিত তাজমহলের সামনের রাস্তা ধরে ঘোড়ার গাড়ি বা ব্রিটিশ অফিসারদের উপস্থিতি ইত্যাদি।
অনেক সময় এ শিল্পকর্মগুলো অনেক স্থাপনাকে সংরক্ষিত স্থান হিসেবে তুলে ধরত। যেন ব্রিটিশরা অতীতকে রক্ষা করছে। এ থেকে বোঝা যায়, ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে ব্রিটিশদের দৃষ্টিভঙ্গি সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রথমে ছিল রোমান্টিক ও অনুসন্ধানমুখী দৃষ্টিভঙ্গির চিত্রায়ণ, পরে তা হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণমূলক ও কর্তৃত্ববাদী। এ সময় শিল্প শুধু নান্দনিকতার জন্য নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। ভারতকে ‘অন্য রহস্যময়’ অথবা ‘ব্যবস্থাপনায় থাকা অঞ্চল’ হিসেবে দেখানো হয়। তাজমহলের মতো স্থাপত্য ব্যবহার করা হতো ব্রিটিশ আধিপত্যের বৈধতা দিতে, যেন তারা এমন একটি ঐতিহ্যকে রক্ষা করছে, যা স্থানীয়রা পারে না।
তাজমহল শুধু একটি সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, বরং ঔপনিবেশিক যুগের শিল্পচর্চায় এটি ছিল শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতীক। প্রায় ১০০ বছর ব্যবধানের শিল্পীদের তাজমহল দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের দেখায়, কীভাবে শিল্পকে ব্যবহার করে একটি জাতি অন্য জাতির ওপর দৃষ্টিভঙ্গি আরোপ করে—একে কখনো রহস্যময় করে তোলে, আবার কখনো শাসনযোগ্য হিসেবে চিত্রায়ণ করে।









