বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির কারণে এক দেশের শিল্পীরা অন্য দেশে যেতে পারতেন। শিল্পের প্রকৃতি, ধারা, ধারণা বিনিময় হতো। বিশ শতকের শেষের দিকে তা আরো দ্রুত হতে শুরু করে। বাংলাদেশের চিত্রশিল্পও এর বাইরে নয়। স্বাধীনতার আগে থেকেই পূর্ববঙ্গের শিল্পীরা বিদেশ গিয়েছেন। পরবর্তীকালে দেশেই আয়োজিত হয়েছে নানা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী, সেমিনার, যা শিল্প-সংস্কৃতি বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করেছে। সেভাবেই বাংলাদেশের চিত্রশিল্প যুক্ত হয়েছে বহির্বিশ্বের সঙ্গে। তবে আগ্রহোদ্দীপক বিষয় হলো বাংলাদেশের চিত্রকলায় জাপানের প্রভাব দেখা যায়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সময় ও নানা প্রভাবকের উপস্থিতি। এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল এর মধ্যে অন্যতম।
জাপান তাদের চিত্রকলায় পশ্চিমা প্রভাব গ্রহণ করেছিল। সে ইতিহাস বেশ পুরনো। ষোলো শতকের জাপানি চিত্রকলায় পশ্চিমা প্রভাব লক্ষ করেছেন চিত্র ইতিহাসবিদ ও গবেষকরা। আর বাংলাদেশের প্রথিতযশা চিত্রকররা জাপানি চিত্রকলা পছন্দ করতেন। বাংলাদেশের চিত্রকলায় জয়নুল আবেদিন কিংবদন্তি। তিনিও জাপানি চিত্রকলা পছন্দ করতেন। মোহাম্মদ কিবরিয়া জাপানে পড়াশোনা করেছেন এবং সে দেশের চিত্রকলা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। একাডেমিকভাবেও চারুকলা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে জাপানের সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। ফলে বাংলাদেশের চিত্রকলায় জাপানের প্রভাব আরো স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এদিকে ১৯৮১ সালে শুরু হয় এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল। এটি আয়োজনে যুক্ত জাপান। তার ফলেও জাপানের চিত্রকলার সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ তৈরি এবং চিত্রকলা প্রভাবিত হয়।
বাংলাদেশের চিত্রশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন ব্যক্তির প্রায় সবাই ছিলেন চিত্রকর। তারা ইজেলে ছবি আঁকতেন। এরপর কয়েকজন প্রিন্টমেকার আবির্ভূত হন। সফিউদ্দিন আহমেদ তাদের একজন। তবে বাংলাদেশের প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পীরা পেইন্টারই ছিলেন। এর মধ্যে রশিদ চৌধুরী বিভিন্ন মাধ্যমে পারদর্শী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার প্রাচ্যকলা বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর দীপ্তি রানী দত্ত তার গবেষণায় দেখেছেন, প্রথম প্রজন্মের শিল্পীরা নির্দিষ্ট কোনো মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ হওয়ার চেষ্টা করেননি। নাসিমুল খবির তার বইয়ে জানিয়েছেন, এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল শুরুর আগে বাংলাদেশের চিত্রশিল্পীরা আধুনিক ইউরোপীয় চিত্রকলা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এরপর আশি ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের চিত্রকলায় নতুন ধারা শুরু হয়।
১৯৮১ সালে শুরু হয় এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল। প্রথমে এর নাম ছিল এশিয়ান আর্ট বাংলাদেশ। ১৯৮৩ সালে নাম হয় এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল বাংলাদেশ। আয়োজিত সর্বশেষ বিয়েনালটি (২০তম) ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে পরের বছর ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত আয়োজিত হয়েছিল।

১৯৮১-৯৯ সাল পর্যন্ত আয়োজিত নয়টি বিয়েনালে জাপান নিয়মিত অংশ নিয়েছে। দেশটির শিল্পীরা ছয়বার সেরার পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি পাঁচবারে ছয়জন শিল্পী স্পেশাল মেনশন পুরস্কার পেয়েছেন। এ সময়ে জাপানের শিল্পীরা উডকাট, লিথোগ্রাফি, কপার প্লেট ও আধুনিক স্ক্রিন পদ্ধতিতে চিত্র উপস্থাপন করেছিলেন। বাংলাদেশের শিল্পীরা জাপানি শিল্পীদের কাজগুলো সরাসরি দেখার সুযোগ পান। তাদের এ গ্রাফিক্যাল কাজগুলো দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং নিজেদের কাজেও তার প্রতিফলন আনার চেষ্টা করেন। ১৯৮৩ সালের বিয়েনালে জাপানি শিল্পীরা বেশকিছু ইনস্টলেশন এনেছিলেন। ১৯৮৬ সালের বিয়েনাল থেকে জাপানি শিল্পীরা গ্র্যান্ড প্রাইজের পাশাপাশি দুটি স্পেশাল মেনশন অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। ১৯৯১ সালে মাত্র দুজন জাপানি শিল্পী এসেছিলেন ইনস্টলেশন নিয়ে। তাদের একজন পুরস্কৃত হন। ১৯৯৩ সালে ছিল গবেষণাভিত্তিক আলোকচিত্র।
১৯৯৫ সালে প্রথমবারের মতো ভিডিও ইনস্টলেশন রাখা হয়। ইনস্টলেশনটি পুরস্কার পায়। এ সংস্করণে জাপানি আর্ট কিউরেট করেছিলেন রাইজি কুরোদা। তিনি প্রস্তাব করেন, গ্যালারিতে চিত্র বা শিল্প উপস্থাপন করা উচিত বিষয় ও স্টাইলের ভিত্তিতে, দেশের ভিত্তিতে নয়। অর্থাৎ কিউরেশনেও তারা প্রভাব রেখেছিলেন। পরের বছরের কাজগুলোতে মিলেনিয়াল অ্যাপ্রোচ দেখা গিয়েছিল।
১৯৮১ সালের বিয়েনালে প্রথাগত মিডিয়াম নিয়েই কাজ হয়েছিল বেশি। এর বাইরে আমিনুল ইসলাম (১৯৩১-২০১১) ও অলোক রায়ের কয়েকটি কাজ ছিল। এছাড়া আবদুস সাত্তারের একটি বড় উডকাট ছিল। পুরস্কার পেয়েছিল শিল্পকর্মটি। জাপান এ সংস্করণে অনারেবল প্রাইজ পেয়েছিল প্রিন্ট মিডিয়ামে কাজের জন্য। এ সময় অলোক রায় সিরামিকের ইনস্টলেশন নিয়ে কাজ করেছিলেন, কিন্তু সে সময় অবধি সিরামিক ‘এলিট আর্ট’ হিসেবে গণ্য হতো না।
১৯৯৩ সালের বিয়েনালে বাংলাদেশী শিল্পীরাও বড় সংখ্যায় ইনস্টলেশন নিয়ে এসেছিলেন। কয়েকজন শিল্পী প্রথাগত ভাস্কর্য থেকে সরে গিয়ে থ্রিডি আর্ট ইনস্টলেশন করেছিলেন। ১৯৯৫ সালের বিয়েনালেও এ প্রবণতা দেখা যায়। এ সংস্করণ ছিল সপ্তম এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল বাংলাদেশ। এখানেই দেখা যায়, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের মধ্যে পূর্ববর্তী বিয়েনালগুলোর প্রভাব পড়েছে। আর তথ্য বিশ্লেষণ করেই বোঝা যায়, সে প্রভাব মূলত জাপানি শিল্পীদের। বাংলাদেশের তরুণ শিল্পীরা প্রথাগত চিত্র ও শিল্পকর্মের পাশাপাশি জাপানি শিল্পী প্রদর্শিত ধারায় নিরীক্ষা করছিলেন।
বাংলাদেশের শিল্পীদের ওপর জাপানি শিল্প ও শিল্পীদের প্রভাব নিয়ে লালা রুখ সেলিম তার ২০১৪ সালে ‘আর্ট অব বাংলাদেশ: দ্য চেঞ্জিং রোল অব ট্রেডিশনস, সার্চ ফর আইডেন্টিটি অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশন’ প্রবন্ধে লেখেন, ‘জাপানি শিল্পীদের আনা ধারায় সত্তরের দশকের শিল্প বদলে গিয়েছিল। তথ্যপ্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অগ্রগতির সঙ্গে শিল্পীরা নানা মাধ্যমে কাজ করতে শুরু করেন। এ সময় ইনস্টলেশন, পারফরম্যান্স, ভিডিও ও ফটোগ্রাফি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।’
এশিয়ান আর্ট বিয়েনাল আয়োজন করছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এর সঙ্গে আছে জাপানের ফুকুয়োকা আর্ট মিউজিয়াম। সেই জায়গা থেকে সরাসরি প্রভাবও দেখা যায়। ১৯৯১ সালে পঞ্চম বিয়েনালে অনারেবল মেনশন পেয়েছিলেন শিল্পী মাহবুবুর রহমান। ১৯৯৯ সালে তিনি গ্র্যান্ড প্রাইজ পান। ১৯৯৪ সালে তিনি অংশ নিয়েছিলেন চতুর্থ এশিয়ান আর্ট এক্সিবিশনে। এটি আয়োজন করেছিল ফুকুয়োকা আর্ট মিউজিয়াম।
কেবল বিয়েনালে অংশ নেয়ার জন্য বা বিয়েনালে অংশ নেয়া শিল্পীরাই প্রভাবিত হয়েছিলেন বিষয়টা এমন নয়। ১৯৯৫ সালের পহেলা বৈশাখ চারুকলা প্রাঙ্গণে মনিরুজ্জামান শিপুর ‘গ্রিন ম্যান ইন সেলফ জেল’ ও সালেহ মাহমুদের ‘সুরক্ষিত বন্দিশালা’ প্রদর্শিত হয়েছিল। তারা তাদের কাজকে মনুষ্য ভাস্কর্য বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
১৯৯৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শিল্পী অভিজিৎ চৌধুরী ‘সাউন্ড লাইট কালার’ শিরোনামে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। তিনি সেখানে বিভিন্ন উপাদান স্থাপন করেছিলেন। এর মধ্যে ছিল একটি স্লাইড শো, যা তার শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। একেকটি পারফরম্যান্স ১২-১৩ মিনিটের ছিল।
আশি ও নব্বইয়ের দশকে এমন অনেক কিছুই করছিলেন শিল্পীরা যা আগে দেখা যায়নি। অবশ্য বিয়েনালে জাপানের পাশাপাশি অন্য আরো দেশের শিল্পীরাও অংশ নেন। তাদের প্রভাবও পড়েছে দেশীয় শিল্পীদের কাজে। তবে এটা স্পষ্টভাবেই বলা যায় যে এশিয়ান আর্ট বিয়েনালের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পীরা জাপানি শিল্পকর্ম দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং আশি ও নব্বইয়ের দশকে সেই প্রভাব থেকেই তারা নিজেদের শিল্প, শিল্পমাধ্যম ও প্রদর্শনে পরিবর্তন এনেছিলেন এবং এ প্রভাব এখনো বিদ্যমান।
[নিবন্ধটি তৈরিতে দীপ্তি রানী দত্তের গবেষণাপত্র The Influence of Japanese Art on new Trends in Bangladeshi Art Practices: A Study of the Asian Art Biennale-এর সাহায্য নেয়া হয়েছে]









