এবছর বিশ্বজুড়ে অনেকগুলো শিল্প প্রদর্শনী হয়েছে। আবার অনেক পাবলিক আর্টও এসেছে। এগুলো কোনো প্রথাগত প্রদর্শনী নয়। জনচলাচল, সমাগম হয় এমন জায়গায় প্রদর্শিত। তার মধ্যে অনেকগুলো শিল্পকর্ম মানুষের মধ্যে জাগিয়েছে কৌতূহল। কেবল কৌতূহলই নয়, শিল্পকর্মগুলো মানুষ, সংস্কৃতি ও শিল্পের বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়েছে। শিল্পকলা নিয়ে কাজ করে আর্ট অ্যান্ড ডিজাইন ফ্যাব্রিকেশন কোম্পানি ইউএপি। তারা ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে হওয়া প্রদর্শনী থেকে বেশকিছু শিল্পকর্মের তালিকা প্রকাশ করেছে। তাদের মতে এ শিল্পকর্মগুলো কিউরেটরদের চোখে সেরা।
মিকালা দোয়েরের ‘কন্টিনাম’
সিডনির মেট্রো স্টেশনে একটি শিল্পকর্ম মানুষের চোখে পড়বে। মিকালা দোয়েরের তৈরি এ ইনস্টলমেন্টটি নানা রঙে সজ্জিত। মার্টিন প্লেস মেট্রো স্টেশনের দুটি প্রবেশপথে রাখা এ শিল্পকর্মের নাম কন্টিনাম। হঠাৎ দেখলে বিভিন্ন রঙে ছোপানো একটি ক্যানভাস মনে হয়। এর মধ্যে দক্ষিণ দিকের প্রবেশপথে রাখা মোজাইকের শিল্পকর্মটি সিরামিক টাইলসে তৈরি। শিল্পকর্মটি তৈরিতে ব্যাবহৃত সিরামিক দ্বারা সাবওয়ে স্টেশনে ব্যবহৃত মোজাইককে স্মরণ করা হয়েছে। এছাড়া জ্যামিতিক আকৃতিগুলো চলন্ত সিঁড়ি, রেলওয়ে ট্র্যাক ও নেটওয়ার্ককে উপস্থাপন করে বলে মনে করা হয়। এছাড়া এর ইস্পাতের কাঠামো শহর ও শহরজীবনকে উপস্থাপন করে বলে মনে করা হয়।
ক্যালাম মোর্টনের ‘ইন থ্রু দি আউটডোর’

মেলবোর্নের শিল্পী ক্যালাম মোর্টন। আধুনিক স্থাপত্যের প্রতি তার আগ্রহ অবিচল। তিনি সেন্ট্রাল সিডনির দুটি গলিপথ ধরে দালানের খিড়কি দরজার অবস্থান নতুন করে ভেবেছেন এ চিত্রকর্মের মাধ্যমে। দালানগুলো সম্পূর্ণ হওয়ার কয়েক দশক পর তৈরি করা সত্ত্বেও তিনটি মোজাইকের সিরিজ হিসেবে তৈরি ‘ইন থ্রু দি আউটডোর’ সেই রাস্তা ও দালানকে উপস্থাপন করে। সাধারণত অফিসের কর্মী, সকালে পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা ময়লার বিন পরিষ্কার করা ও রাতে ছিন্নমূল মানুষ পথে শুয়ে ঘুমায়। সেই পথকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এ শিল্পকর্মে।
শিল্পকর্মটি কিউরেট করেছেন বারবারা ফ্লিন দ্বারা। শিল্পকর্মটি সিডনির প্রচলিত মোজাইক প্যাটার্ন অনুসরণ করে তৈরি। কুইন ভিক্টোরিয়া বিল্ডিংয়ের মোজাইকের সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়।
ডায়ানা লেলোনেকের ‘রিড ফিল্ড’
রেইন গার্ডেন, বায়োরিটেনশন এরিয়া নামে পরিচিত ছোট অঞ্চলগুলো মূলত বৃষ্টির পানি ধরে রাখা ও শোধনে ব্যবহার করা হয়। পোল্যান্ডের ওয়ারশর গ্রোঞ্চো জেলায় এমন একটি রেইন গার্ডেন আছে। সেখানেই একটি পাবলিক আর্ট তৈরি করেছেন ডায়ানা লেলোনেক। এটি আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত আছেন ফান্ডাকজা উইট্রিনা ও কিউরেট করেছেন অগ্নিয়েজসকা সুরাল। স্থানীয় উদ্ভিদ ও প্রাণীদের বেঁচে থাকার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি জিনিসটি জিউয়িশ কিবুটজকে (ইসরায়েলে ইহুদিদের বসতি ব্যবস্থা) মনে করিয়ে দেয়। কিবুটজের ব্যবস্থাটা ছিল বসতি থেকে আসা আয়কে ভবিষ্যতের জন্য ব্যবহার করা। এ রেইন গার্ডেনেও পানি ধরে রেখে ফসল ফলানো এবং সেখান থেকে পাখি, ব্যাং ও অন্যান্য নানা প্রাণী উপকৃত হয়। রিড ফিল্ডকে খুব সহজ একটা ধারণা মনে হতে পারে, কিন্তু এটি মূলত জলবায়ু পরিবর্তন ও বর্তমান মানুষের বসবাস ও বসতি ব্যবস্থার দিকে আঙুল তোলে। ভবিষ্যতে কো-হ্যাবিটেশন কীভাবে হতে পারে তারও ইঙ্গিত দেয়।
ইঙ্গেলা ইহরমানের ‘ফার্স্ট কেম টু দি ওশান’
প্রাকৃতিক বিচারের প্রতি আগ্রহী ইঙ্গেলা ইহরমান। তিনি প্রকৃতির সঙ্গে সমসাময়িক শিল্পকে যুক্ত করে কাজ করছেন প্রায় ২০ বছর ধরে। ভাল গালেদার উপত্যকা ডলোমাইটসে তিনি এমনই একটি শিল্পকর্ম তৈরি করেছেন। নাম ‘ফার্স্ট কেম টু দি ওশান’। খুব সহজ একটি দৃশ্য। সবুজের ওপর শায়িত বিশাল একটি কঙ্কাল। ১৫০ বছর আগের কোনো প্রাণীর হবে হয়তো। বোঝাতে চাওয়া হয়েছে এখানেই হয়তো প্রাণীটির বসতি ছিল।
শিল্পকর্মটির বিশেষত্ব হলো কঙ্কালটি তৈরি করা হয়েছে স্থানীয় গাছের কাণ্ড দিয়ে। তবে তা কেটে নেয়া হয়নি। বিটল অতিমারীর পর ঝড়ে পড়া কাণ্ড দিয়ে কাজটি করেছেন শিল্পী।
জেন ক্যাট্রন ও পল আউটলর ‘হট ডগ ইন দ্য সিটি’
ম্যানহাটনে বাসনো বিশাল হট ডগটি দেখতে বেশ সুস্বাদু। বানিয়েছেন জেন ক্যাট্রন ও পল আউটল। টাইমস স্কয়ারের মধ্যখানে শিল্পকর্মটি স্থাপন করেছেন তারা। জায়গাটির সঙ্গে খাবারটির যোগসূত্র স্পষ্ট। নিউইয়র্কে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক হট ডগ বিক্রি হয়। শিল্পকর্মটি মহৎ কিছু নয় বরং চলতি খাদ্য সংস্কৃতি ও পুঁজিবাদের দিকে ইঙ্গিত করে। তবে এটি দর্শককে আমোদিত করেছে। সেই সঙ্গে শহর ও শহুরে মানুষকেও উপস্থাপন করে।
ইভান আরগোতের ‘ডাইনোসর’

নামে ডাইনোসর হলেও ভাস্কর্য একটি কবুতরের। এটাকে বলা হচ্ছে হাইপার রিয়ালিস্টিক ভাস্কর্য। কবুতর খুবই পরিচিত একটি পাখি, কিন্তু তাকে বিশাল করে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বোঝানো হয়েছে কবুতর এসেছে ডাইনোসর থেকে বিবর্তিত হয়ে এবং একটা সময় সে খাদ্যের জন্য মানুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ল। পাশাপাশি এটি মনে করিয়ে দেয় মানুষের পৃথিবীতে অন্যান্য প্রাণী কতটা নির্ভরশীল। মানুষই প্রাধান্য ও ক্ষমতা বিস্তার করছে পৃথিবীতে। ম্যানহাটনে ইভান আরগোতের হাতে তৈরি ও রঙ করা কবুতরটি দর্শকের চোখে খুব সহজেই পড়ে। নিউইয়র্ক সিটির বাসিন্দাদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে কবুতরটি।
এমানুয়েল ব্লেকের ‘হিন্দ রাজাব’

ইসরায়েলিদের হাতে নিহত হয়েছিল পাঁচ বছর বয়সী হিন্দ রাজাব। তাকে স্মরণ করে ডাবলিনে এমানুয়েল ব্লেক এঁকেছেন একটি ছবি। দেয়ালজোড়া ছবিটিতে বালিকাটি জীবন্ত। এ ম্যুরালের হিন্দ সাদাকালো রঙে অঙ্কিত। তার গায়ে গোলাপি টি-শার্ট। মাথায় ফিলিস্তিনের পতাকা বসানো হয়েছে ফুটের মুকুটের আদলে।
রাশিদ জনসনের ‘ভিলেজ অব দ্য সান’
কাতারের দোহায় দেখা যাবে ‘ভিলেজ অব দ্য সান’। এটি তৈরি করেছেন রাশিদ জনসন। মাঠের মধ্যে মোজাইকে তৈরি একটি ভাস্কর্য। তার ওপরে আঁকা নানা ছবি। বিষয়টি মূর্ত না আবার পুরোপুরি বিমূর্তও না। কাতার মিউজিয়ামের পাবলিক আর্ট প্রোগ্রামের অধীনে এটি তৈরি করেছেন রাশিদ। এতে লম্ব সমকোণে ২৪ মিটার দেয়াল স্থাপন করে চারটি অংশ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি চতুর্থাংশে বসানো হয়েছে বেশকিছু চিত্র। এটি এ-যাবৎকালে জনসনের সবচেয়ে বড় কাজ। দেয়ালে থাকা বেশকিছু চিত্র তার নিজের গ্যালারির ‘অ্যাংশাস ম্যান’ থেকে আনা। দেয়ালগুলোর ছায়ায় বসে দর্শক এতে থাকা চিত্রগুলোয় চোখ বোলাতে পারেন।
আর্টসি ডটনেট অবলম্বনে মাহমুদুর রহমান









