টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ভূমি গ্যালারিতে পা ফেলতেই ফটকে মুহূর্তের জন্য যেন থেমে গেলাম ‘দ্য মোমেন্টস’ দেখে। মুহূর্তগুলো যেন গিলে নিল বেনীআসহকলা। বুঝলাম এ প্রদর্শনী আমার খেরো খাতার গিঁট খুলে চোখ ধাঁধিয়ে তুলবে নিমেষে।
ভেতরে ঢুকতেই প্রথমে অ্যাক্রিলিকে করা ‘ড্যান্সিং লাইনস’ সিরিজের তিনটি চিত্র তাদের বর্ণিল আবহ নিয়ে স্বাগত জানাল।
এরপর চোখ গেল চারকোলে আঁকা ‘ট্রমাটাইজড’ ও ’হোয়েন দি ইভিনিং ইজ স্যাড’ শিরোনামের চিত্রকল্প দুটির ওপর। সমাজ ও শোষণের জাঁতাকলে বিপন্ন, এক ভীতসন্ত্রস্ত মানবজীবনের মূর্ত প্রতিচ্ছবি। ‘মেলানকোলি’ ও ‘সাউন্ডস অব জয় অ্যান্ড পেইন’ শিরোনামের চিত্রকর্ম দুটি মানবজীবনের বিমূর্ত অধ্যায় ফুটিয়ে তুলেছে, যা গভীর ভাবাবেগে আচ্ছন্ন। এ চিত্রকর্ম দুটি দেখে পার্শি বিশী শেলির বিখ্যাত মেলানকোলি কবিতা ‘দ্য স্কাইলার্ক’-এর কথা মনে পড়ে যায়।

শিরোনাম দেখে ঝট করে লক্ষ করলাম ছবিটা। ‘ফায়ারফ্লাইজ’ নামটি দেখে নিঃসন্দেহে আমার মতো অনেকের চোখে জোনাক পোকা ভাসবে। হ্যাঁ, মানবজীবনও তো জোনাক পোকার মতোই। সব নিরানন্দ দিন, নিকষ আঁধার কাটিয়ে, কত আকাশ-বাতাস-ভূমিকে আলোড়িত করা ঝড় সমালে, শেষে এক-একটি জীবনপ্রদীপ জোনাক পোকার মতো জ্বলতে থাকে এ পৃথিবীতে।
মেলানকোলির নীল রঙ থেকে বেরিয়ে এবার বেনীআসহকলায় আসা যাক। গুণী শিল্পী মাহমুদুর রহমান দীপন রংধনু থেকে রঙ এনে যেন এঁকেছেন তার ‘সিটি অব কালারস, কালারস অব ডিজায়ার’। জীবনের পরতে পরতে হাসি-আনন্দ-বেদনার যে মিথস্ক্রিয়া নিয়ে মানুষের বসবাস, নিজ জাদুর শহরে তারই অপকট রূপ এ চিত্রকর্ম। মানব আর যন্ত্রের পরস্পরনির্ভর নগরজীবনে হ্যালুসিনেশন ও ইল্যুশনের মধ্যে আমাদের যে বেঁচে থাকা, দুর্মর মনোজগৎ নিয়ে, এসব তারই রেখাচিত্র। মনুষ্যজগতের কিছু ভ্রম যা নিজের বিশ্বাসকে অবদমন করে রাখে জীবনের পথে।

মোট ৫৪টি চিত্রকর্ম নিয়ে প্রদর্শনী হলেও ভেতরে সংযোগপথে আরো কিছু শিরোনামহীন চিত্রকর্মের দেখা পাওয়া গেল। শিল্পী জানালেন, এগুলো প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক তালিকার বাইরে। শিরোনামহীন হলেও ছবিগুলো বর্ণনা করছে অনেক কিছু। একটা ছবিতে নম্বর পাওয়া গেল ৫৯। মনে হলো এটিই তার শিরোনাম। ৫৯ রকম ব্যর্থতার শিকল, ৫৯টি স্বপ্নের কারাগার যেন একটা মানুষের চোখে-মুখে বিধৌত বারবার।
এসব যখন ভাবছি, তখন এক দর্শনার্থীকে দেখলাম সম্মোহন নিয়ে সহধর্মিণীকে শিল্পের স্বরূপ চেনাচ্ছেন। তার এমন সম্মোহনের কারণ জানতে চাইলে বললেন, শিল্পী যে গল্পটা আসলে বলতে চাইছেন তা খুব সহজেই অনুমেয়। অনেক সময় আমরা যা অনুভব করি, কল্পনা করি কিন্তু দৃশ্যত বাস্তবিক রূপ দিতে পারি না, সেসবেরই প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছেন শিল্পী।
প্রদর্শনীতে আরো আছে ‘কলিং অব দ্য সি’, ‘ইভিনিং দ্য হিলস’ শিরোনামের চিত্রকল্পও। এছাড়া জায়গা পেয়েছে গ্রামীণ প্রকৃতি, রূপবৈচিত্র্য ও ফুলেল সব ঋতুর সমাহার। পাহাড়ের আমন্ত্রণ, সমুদ্রের গর্জন শুনে এসে আবার ডুবে গেলাম শ্রান্ত ইকারুসের ডানায় ভর করে চিরায়ত নারী চরিত্রে।
চারকোল, অ্যাক্রিলিক, জলরঙ ও প্যাস্টেল—চার মাধ্যমে শিল্পী এঁকেছেন চিত্রকর্মগুলো। প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ৪ জুলাই, শেষ হবে ১৮ জুলাই।









