‘এটা কি আসল মনেঁ’—নিউইয়র্কের গ্যাগোসিয়ান গ্যালারিতে তাকাশি মুরাকামির নতুন প্রদর্শনী ‘জাপোনিজম: কগনিটিভ রেভল্যুশন লার্নিং ফ্রম হিরোশিগে’-তে দাঁড়িয়ে এক দর্শনার্থী বিস্ময়ে প্রশ্ন করেন। আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত চলবে এ প্রদর্শনী, যার কেন্দ্রে রয়েছে ক্লদ মনেঁর বিখ্যাত জলপ্রপাতচিত্রের চোখধাঁধানো অনুলিপি—‘ওয়াটার লিলি পন্ড, অ্যান্ড মি, সাবমার্জড ইন দ্য পন্ড লাইক গোলম (২০২৫)’। ফরাসি ইম্প্রেশনিস্টের এ চিত্রকে মুরাকামি তার স্বকীয়তায় পুনর্নির্মাণ করেছেন। দূর থেকে তাকালে নিশ্চিত বিভ্রান্ত হবেন—এ যেন মনেঁরই মূল কাজ। এ বিভ্রান্তিই ইম্প্রেশনিজম দেখার আদর্শ ‘স্কুইন্টিং ডিস্ট্যান্স’। যদিও কাছে গেলে স্পষ্ট হয়, এটি মুরাকামির নিজস্ব প্রিন্ট প্রযুক্তিতে তৈরি এক অভিনব পুনঃরূপায়ণ। ছবিটি অনায়াসে প্রশ্ন তোলে—আসল কাকে বলে, নকলই- বা কাদের উত্তরাধিকার?

তাকাশি মুরাকামি এ প্রশ্নে সরাসরি জড়িয়ে পড়েছেন। তার এ সিরিজে রয়েছে ক্লদ মনেঁ, মার্কিন শিল্পী হুইসলার, এমনকি হিরোশিগে ও ভ্যান গঘের কাজের পুনর্নির্মাণ। যেন তিনি জাপানের ঐতিহ্য আর ইউরোপের আধুনিকতার মধ্যকার ভুলে যাওয়া সেতুগুলোকেই নতুন করে আঁকছেন। কখনো শ্রদ্ধা দিয়ে, কখনো ব্যঙ্গ করে।

তাকাশি মুরাকামি জানেন, আজকের দর্শক একটি স্ক্রিনের মধ্য দিয়ে দেখে। অথবা স্ক্রিনের আড়াল দিয়ে দেখতে চায়। বিখ্যাতর ছায়া আজকের দর্শকের কাছে অনেক সময়ই আসলের মহিমাকে ছাড়িয়ে যায়। আর সেই অন্তর্দৃষ্টিই তাকে সচেতন, পরিপ্রেক্ষিত জ্ঞানসম্পন্ন চিত্রশিল্পীদের একজন করে তোলে।

বিশেষ করে হিরোশিগের ‘হান্ড্রেড ফেমাস ভিউজ অব এদো’ সিরিজের ওপর ভিত্তি করে মুরাকামির শিল্পকর্মগুলো শুধুই এক ঐতিহ্যগত ‘কপি’ নয়। এক ধরনের আত্মদর্শন। মুরাকামি বলছেন, এ প্রতিলিপিগুলো তার নিজের শিল্প-ইতিহাসে অবস্থান খুঁজে পেতে সাহায্য করেছে। ‘আমি গল্পের বাইরে ছিলাম না, আমি শুধু সেই সুতোটা দেখতে পাইনি যেটা আমাকে যুক্ত করে’—এভাবে তিনি বুঝিয়েছেন, অনুকরণ কখনো কখনো উত্তরাধিকারের রূপও নিতে পারে।

এ অনুকরণের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ‘জাপোনিজম’ আন্দোলনের নতুন ব্যাখ্যা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ফরাসি সমালোচক ফিলিপ বুর্টি যে শব্দ চালু করেছিলেন, আজ তা আবার নতুন আলোয়। এ জাপানি ছাপচিত্রের সংস্পর্শে এসে ইউরোপীয় শিল্পীরা জাপানি শিল্পের (বিশেষ করে হিরোশিগের কাজ দেখে) সমতল রঙিন স্তর, উল্লম্ব বিন্যাস ও প্যাটার্নের ওপর গুরুত্বের অনুসরণে নতুন এক আধুনিক শিল্প ভাষা নির্মাণের চেষ্টায় ব্রত হয়েছিলেন। তারা এ প্রভাবে খুঁজে পান এক নতুন ধরনের সত্য, যা বাস্তবের বিভ্রম নয় বরং বস্তুগত সত্তার প্রকাশ। সেই সত্য উপলব্ধি করে শিল্প সমালোচক থিওডোর ডুরে বলেছিলেন, ‘জাপানের আগে সেটা অসম্ভব ছিল।’ ইউরোপ যে সময় জাপানি শিল্পকে আঁকড়ে ধরেছিল নিজের আধুনিকতাকে সংজ্ঞায়িত করতে, এখন সেই জাপানি শিল্পী মুরাকামি ইউরোপীয় ঐতিহ্যকে নিজের রঙে রাঙিয়ে তুলছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘লা জাপানিজের (২০২৫)’-এর কথা। যেখানে মনেঁর স্ত্রী কামিলকে কিমোনো পরা অবস্থায় আবার আঁকা হয়েছে। এখানে মুরাকামির নিজের স্বাক্ষরও রয়েছে মনের স্বাক্ষরের পাশে। এ যেন একটি প্রতীকী ‘পুনর্দখল’।

শুধু কৌশলগত পুনঃরূপায়ণ নয়, মুরাকামি এই প্রদর্শনীতে এনেছেন বহুস্বর। জেমস ম্যাকনিল হুইসলারের ‘নকটার্ন: ব্লু অ্যান্ড গোল্ড ওল্ড ব্যাটারসি ব্রিজ’ এর আধুনিক অনুলিপি ‘দেন এ ইউএফও ফ্লি বাই (২০২৫)’-এ মুরাকামি ব্রিজের ওপর আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লায়িং অবজেক্ট বা ইউএফওর উড়ন্ত চাকার মতো অবাস্তব বস্তু বসিয়েছেন। যা কেবল পপ চমক নয়—বরং অন্তর্নিহিত সংকেত। এই ইউএফও মনে করায়, ‘বিদেশী’ মানেই কি ভীতি? নাকি অগ্রহণযোগ্যতা?

মুরাকামি জানেন, আজকের বিশ্বে প্রতিলিপি মানে কেবল প্রযুক্তির খেলা নয়, বরং সাংস্কৃতিক অবস্থানেরও মন্তব্য। তার প্রদর্শনী সে মন্তব্য করেই যাচ্ছে—অস্ফুটে, কখনো উপহাসের রঙে, আবার কখনো শ্রদ্ধাভরে। আর সেই শ্রদ্ধা কখনো নিজের পূর্বসূরিদের জন্য, কখনো নিজের সংস্কৃতির জন্য। শিল্প যখন কেবল বিমূর্ততা নয়, বরং ইতিহাস, রাজনীতি ও পরিচয়ের আয়না হয়—তখন তা হয়ে ওঠে মুরাকামির মতো গুরুতর শিল্পীসত্তার আস্ত আয়না। এ প্রদর্শনী যেন মুরাকামির নিজের ‘অস্তিত্বগত বেদনার প্রতিচ্ছবি’—যেখানে পৃষ্ঠের রঙিনতা ছাপিয়ে উঠে আসে গভীরতর প্রতিফলন।