শিল্প শুধু রঙ, তুলি ও ক্যানভাসেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি একধরনের গভীর মানবিক অনুভূতির প্রকাশও। চিত্রে কখনো কখনো শিল্পীজীবনের ব্যক্তিগত আবেগ, সম্পর্ক ও স্মৃতিগুলোও রঙের ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়ে ওঠে। বিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা তাদের শিশুসন্তানদের ছবি এঁকেছেন। সেই ছবি এবং সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের গল্প মানুষকে স্পর্শ করে আজও। এ চিত্রগুলো শুধু শিল্প নয়, বরং একটি জীবন্ত মানবিক অধ্যায়ের পরিচয় তুলে ধরে।
ক্লদ মনেঁর দুই ছেলে জ্যাঁ ও মিশেল
- ইমপ্রেশনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ ফরাসি শিল্পী ক্লদ মনেঁ। ক্লদ মনেঁ তার প্রথম পুত্র জ্যাঁ মোনের ছবি আঁকেন মাত্র চার মাস বয়সকালে। জীবনের বিভিন্ন সময়ে জ্যাঁর অন্তত ১১টি চিত্র অঙ্কন করেছেন ক্লদ মনেঁ। এর মধ্যে ১৮৭২ সালের গ্রীষ্মকালে প্যারিসের কাছে আর্জতোইয়ের পারিবারিক বাগানে আঁকা ‘জ্যাঁ মনেঁ অন হিজ হবি হরস’ ছবিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
- ১৮৭৮ সালে জন্ম নেয় মনেঁর দ্বিতীয় পুত্র মিশেল। দুর্ভাগ্যবশত তাদের মা ক্যামিলা পরের বছরই জরায়ু ক্যান্সারে মারা যান। এরপর মনেঁর পরিবার প্যারিসে শিল্পসংগ্রাহক আর্নেস্ট ও অ্যালিস হোশেদের ছয় সন্তানের সঙ্গে একত্রে বাস করত। মা হারানো ছোট্ট শিশুপুত্র মিশেলের প্রতি মনেঁর মায়া ও আবেগের শেষ ছিল না। তিনি মিশেলকে অন্তত তিনবার রঙ-তুলির ক্যানভাসে এঁকেছেন।
অঁরি মাতিস এবং তার সন্তান মার্গারিত, জ্যাঁ ও পিয়ের
- ফরাসি আধুনিক শিল্পের অন্যতম প্রতিনিধি অঁরি মাতিসের ছিল তিন সন্তান। তার প্রথম সন্তান ছিলেন মার্গারিত, তার জন্ম ১৮৯৪ সালে। মার্গারিতের জন্ম মডেল ক্যারোলিন জোব্লোর গর্ভে। এর চার বছর পর অঁরি মাতিস আমেলি নোয়েলি পারায়েরকে বিয়ে করেন। আমেলি মার্গারিতকে নিজের সন্তান হিসেবে লালন-পালন করেন। পরে এ দম্পতির আরো দুই ছেলে হয়—জ্যাঁর জন্ম ১৮৯৯ এবং পিয়ের ১৯০০ সালে। অসুস্থতার কারণে মেয়ে মার্গারিতকে প্রায়ই বাসায় থাকতে হতো। তাই তিনি বাবার অনেক ছবির মডেল হন। বাবার ছবি আঁকার প্রতিভা মেয়ের মার্গারিতের মধ্যেও বিকশিত হয়। ফলে মার্গারিত নিজেও প্রতিভাবান চিত্রশিল্পী হয়েছিলেন। কিন্তু নিজের বেশির ভাগ ছবি নষ্ট করে দেন, যেন কেউ তার স্বাক্ষরকে বাবার সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলে। পরে তিনি বাবার উত্তরাধিকার রক্ষায় জীবন কাটান এবং ১৯৮২ সালে ৮৭ বছর বয়সে মারা যান। এ নিয়ে বাল্টিমোর মিউজিয়াম অব আর্টের কিউরেটর জে ফিশার মন্তব্য করেছিলেন, ‘মার্গারিত ছিলেন সেই বন্ধন, যিনি সবাইকে একসঙ্গে ধরে রেখেছিলেন।’”

পিয়েরে-অগুস্ত রেনোয়া ও তার সন্তানরা
- শিল্পী পিয়েরের ১৮৮৫ সালে প্রথম ছেলের জন্ম হয় আলিন ভিক্টরিন শারিগোর গর্ভে। আলিন শারিগোকে শিল্পী পিয়েরে ১৮৯০ সালে বিয়ে করেন। আলিন রেনোয়ার বহু বিখ্যাত ছবিতে মডেল হয়েছিলেন। এর মধ্যে লঞ্চিয়ন অব দ্য বোটিং পার্টি (১৮৮১) অনত্যম। সন্তান জন্মের পর রেনোয়ার পরিবারের দৈনন্দিন জীবন নিয়ে অনেক ছবি আঁকেন, যেখানে তাদের সন্তানদের ধাত্রী বা আলিনের কাজিনকেও দেখা যায়। বড় ছেলে পিয়ের পরে মঞ্চ ও চলচ্চিত্র অভিনেতা হন। জ্যাঁ ও ছোট ছেলে ক্লোদও চলচ্চিত্র পরিচালক হন।
- লুসিয়েন বিসন ছিলেন রেনোয়ার আরেক কন্যা। ১৮৮০ বা ১৮৮৪ সালে তার জন্ম হয়। তার মা ছিলেন চিত্রশিল্পী ও নারী অধিকারকর্মী ফ্রেদেরিক ভালে-বিসন। ফ্রেদেরিক বিসন ‘সোসাইটি ফেমিনিন দেজ আর্টিস্টস’ নামে নারী শিল্পীদের সংগঠনের নেতৃত্ব দিতেন। রেনোয়ার মেয়ে লুসিয়েনকে ছোটবেলা থেকেই চিত্রশিল্পী হিসেবে গড়ে তোলেন। পরে লুসিয়েন প্যারিসের সেলন প্রদর্শনীতে বেশ সফলতা পান। তিনি মূলত নগর দৃশ্য ও প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবির জন্য জনপ্রিয় ছিলেন।
পল গগাঁ ও তার সন্তানরা
- শিল্পী পল গগাঁর জীবনে শিল্পই ছিল অগ্রাধিকার। যাপিত জীবনে পরিবারের প্রতি দায়িত্বের চেয়ে শিল্পচর্চাই বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। তার আটটি সন্তান ছিল। তাদের সবাই ছিল প্রতিভাবান। বড় ছেলে এমিল ছাড়া বাকিরা সবাই শিল্পী হয়েছিলেন। অবশ্য গগাঁ তাদের তেমন যত্ন নিতে পারেননি, যতটা হয়তো তিনি চেয়েছিলেন। একসময় তিনি স্বীকার করেছিলেন যে নিজের শিল্পের জন্য তিনি পরিবারকে ত্যাগ করেছেন। কারণ পরিবারের খরচ চালানোর মতো যথেষ্ট অর্থ তিনি কখনই জোগাড় করতে পারেননি।

পল গগাঁর স্ত্রী মেটে সোফির গর্ভে পাঁচটি সন্তানের জন্ম হয়। এর মধ্যে আলিন ও ক্লোভিস তার খুব প্রিয় ছিল। এ দুই সন্তানকেই তিনি তার আঁকা ছবিতে অমর করে রেখেছেন। দুর্ভাগ্যবশত প্রিয় দুই সন্তানই অল্প বয়সে মারা যায়। সংসার চালানোর জন্য একসময় স্ত্রী মেটে সন্তানদের নিয়ে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে আত্মীয়দের কাছে চলে যান। আর গগাঁ ভ্রমণে ব্যস্ত ছিলেন। স্ত্রী ও সন্তানদের খুব কমই দেখতে যেতেন। গগাঁর আরো তিনটি সন্তান ছিল, যাদের জন্ম হয়েছিল ভিন্ন মায়ের গর্ভে।
বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের নিজ শিশুসন্তানদের আঁকা ছবি ও তাদের গল্পগুলোয় দেখা যায়, চিত্রশিল্পীরা কেবল শিল্পের জগতে নয়, পরিবারেও নানা আবেগ, সাফল্য ও সংকটের মধ্য দিয়ে গেছেন। কারো সন্তানরা বাবার পথ অনুসরণ করেছে, কারো জীবন আবার বাবার অনুপস্থিতির যন্ত্রণা বহন করেছে। তবে প্রতিটি সম্পর্কই ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
ডেইলি আর্ট ম্যাগাজিনে প্রকাশিত মাগদা মিখালস্কার নিবন্ধ অবলম্বনে বাশার খান









