বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী চিত্রশিল্পীদের অন্যতম পাবলো পিকাসো। কেবল চিত্রশিল্পী নন, পিকাসো ছিলেন একাধারে ভাস্কর, মৃৎশিল্পী, ফ্যাশন ডিজাইনার ও মঞ্চসজ্জাশিল্পী, এমনকি লিখেছেন কবিতা ও নাটক। দীর্ঘ জীবনে তিনি সৃষ্টি করেছেন অসংখ্য মাস্টারপিস শিল্পকর্ম। তবে শিল্পীর শেষ জীবনে আঁকা চিত্রকর্মগুলো নিয়ে সমালোচনা হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ‘দ্য সাকসেস অ্যান্ড ফেইলিউর অব পিকাসো’ (১৯৬২) বইয়ে জন বার্জার বলেছেন, ‘পিকাসোর সময় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। তার শেষ জীবনের কাজগুলো ছিল ক্রমবর্ধমান ভয়াবহতার প্রতিচ্ছবি।’ ওই সময়কার শিল্পকর্মগুলোর আরো কঠোর সমালোচনা করেছেন পিকাসোর বন্ধু ডগলাস কুপার। তিনি বলেছেন, ‘এগুলো আসলে মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে উন্মাদ বৃদ্ধের আঁকিবুঁকি।’
এসব সমালোচনার কারণেই হোক আর শিল্পমানের কারণেই হোক, শিল্পীর ‘গোয়ের্নিকা’ বা ‘পোর্ট্রেইট অব ডোরা মার’-এর মতো বিখ্যাত কাজের তুলনায় তার শেষদিককার চিত্রকর্মগুলো তেমন স্বীকৃতি পায়নি। অথচ ১৯৬১ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে পিকাসো তিন হাজারের বেশি শিল্পকর্ম তৈরি করেছিলেন। নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের (মোমা) মতো বড় প্রদর্শনীতেও এ কাজগুলো প্রায় অনুপস্থিত ছিল। নিলামের বাজারেও দেখা যায় একই চিত্র। তবে সম্প্রতি নরওয়ের ত্রোনহাইমের জাদুঘর পোমোতে হওয়া প্রদর্শনী ‘পিকাসো: দ্য কোড অব পেইন্টিং’-এ শিল্পীর শেষ জীবনের কাজগুলো নতুন করে আলোচনায় এনেছে। প্রদর্শনীর কিউরেটররা দেখিয়েছেন, বৃদ্ধ বয়সে পিকাসোর সৃজনশীলতা কীভাবে মৃত্যুভয় দিয়ে প্রভাবিত হয়েছিল, অস্তিত্ব সংকট কীভাবে শিল্পীর কাজগুলোকে করে তুলেছিল উন্মত্ত, পরীক্ষামূলক ও বহুমাত্রিক।

ষাটের দশকের শুরুতে পিকাসো তার দ্বিতীয় স্ত্রী জ্যাকুলিন রকের সঙ্গে ফ্রান্সের মাউজিনে চলে যান। সেখানেই নিভৃতে শুরু হয় তার জীবনের শেষ ১২ বছরের অবিরাম শিল্পযাত্রা। ওই সময়টিতে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন শৈলী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন তিনি। তার আত্মপ্রতিকৃতির একটি সিরিজে দেখা যায়, একদিন তিনি এঁকেছেন একটি জ্যামিতিক মুখ, আবার পরের দিনই নিজের স্বাভাবিক পোশাকে বাস্তবধর্মী প্রতিকৃতি।
পরীক্ষামূলক বলা হলেও শিল্পী তখনো তার পুরনো বিষয়বস্তু যেমন—প্রতিকৃতি, নগ্নচিত্র এবং শিল্পী ও মডেলের সম্পর্ক নিয়েই ছবি এঁকেছেন। ‘নু আসি দঁজ আঁ ফোতুই, লে ব্রা লেভে’ (১৯৬৩) ছবিতে আঁকা বিকৃত দেহরেখা সৌন্দর্যবোধের পরিবর্তে তৈরি করে এক অদ্ভুত অস্বস্তি। আবার ‘ল্য পেঁত্র এ সঁ মদেল’ (১৯৬৪)-তে তিনি নিজেকে দেখান একজন বর্ণহীন বৃদ্ধ শিল্পী হিসেবে, যার সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রাণবন্ত তরুণী মডেল। দেখে মনে হয়, আসন্ন মৃত্যুর সামনেও নিজেকে তিনি চিরন্তন শিল্পীর ভূমিকায় অমর করে তুলতে চাইছিলেন।
এ সময়েই পিকাসো তার বিখ্যাত ‘মাস্কেটিয়ার্স’ সিরিজ শুরু করেন। আলেকজান্ডার ডুমার ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ উপন্যাস পড়ে মুগ্ধ হয়ে তিনি ওই রঙিন ও উচ্ছল চরিত্রগুলো আঁকেন, যা তার শেষ জীবনের নতুন সৃজনশীল পর্বের প্রতীক। সম্প্রতি ওই প্রদর্শনীর একটি বিশেষ অংশ হলো ১৯৭২ সালে পিকাসোর আঁকা একরঙা স্কেচ ‘তেত’, যার অর্থ মাথা। পিকাসোর মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে আঁকা কাঁচা রেখাচিত্রটি তার দর্শনকে স্মরণ করিয়ে দেয়—একটি শিল্পকর্ম শেষ করা মানে শিল্পীর মৃত্যু। তাই মৃত্যুকে দূরে রাখতে তিনি আঁকতেই থাকতেন, যতক্ষণ না তার শেষ নিশ্বাস ফুরিয়ে যায়। পিকাসোর শেষ চিত্রকর্মগুলো হয়তো অস্তিত্ব সংকটের প্রতিফলন, আবার হয়তো এক অনন্ত সৃজনশীলতার উন্মাদ বহিঃপ্রকাশ। যেভাবেই দেখা হোক, এগুলো নিরর্থক আঁকিবুঁকি অবশ্যই নয়, বরং মহান শিল্পীর অন্তিম সংগ্রামেরই দলিল।
সূত্র: আর্টসি









