ঢাকার লালমাটিয়ার কলা কেন্দ্রের গ্যালারিতে যেন সময় থেমে গেছে। দেয়ালে টাঙানো চিত্রকর্ম, ভাস্কর্যে আলো-ছায়ার খেলার মধ্যে ফিরে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী দুই দশকের শিল্পজগৎ। ৩১ অক্টোবর ২০২৫ উদ্বোধন হয়েছে বিশেষ প্রদর্শনী ‘ফিরে দেখা’। প্রদর্শনীটি ১৫ নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত চলবে। দর্শনার্থীরা প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এটি দেখতে পারবেন।

কলা কেন্দ্রের পরিচয় শুধু একটি শিল্প গ্যালারি নয়, বরং শিল্পীদের দ্বারা পরিচালিত এক সৃজনশীল কেন্দ্র। কলা কেন্দ্র এবার দর্শকদের উপহার দিয়েছে শিল্পচর্চার ইতিহাসে ফিরে যাওয়ার এক গভীর ও সংবেদনশীল যাত্রা। এ প্রদর্শনী বাংলাদেশের শিল্পচর্চার দুই গুরুত্বপূর্ণ দশক ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৫-এর ভাবনা, সংবেদন ও আত্মঅন্বেষণকে নতুন করে পুনরাবিষ্কার করেছে।

18

প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের ১৪ বিশিষ্ট শিল্পীর শিল্পকর্ম। আছেন কাজী রকিব, দীপা হক, ঢালী আল মামুন, দিলারা বেগম জলি, নিসার হোসেন, শিশির ভট্টাচার্য্য, সাইদুল হক জুইস, ফারেহা জেবা, রতন মজুমদার, হাবিবুর রহমান, রুহুল আমিন কাজল, লালা রুখ সেলিম, তৌফিকুর রহমান ও ওয়াকিলুর রহমান।

চিত্রকলা, ভাস্কর্য, প্রিন্টমেকিং ও মিশ্রমাধ্যমে গড়ে ওঠা তাদের সৃষ্টিকর্মগুলো মিলেমিশে যেন তুলে ধরেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের শিল্পদৃশ্যের এক বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি। কেউ যুক্ত ছিলেন ‘ঢাকা পেইন্টারস’ বা ‘সময় গ্রুপ’-এর মতো শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে। কেউ আবার হেঁটেছেন একান্ত অনুসন্ধানের পথে। তাদের কাজের রঙ, রেখা ও উপাদানে মিশে আছে সময়ের ভাষা, রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও ব্যক্তিসত্তার ক্রমবিবর্তনের অনুরণন। প্রতিটি ছবিতেই উঠে এসেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ। গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে একজন দর্শক যেন ক্যানভাসের মধ্য দিয়ে সেই সময়টাতে ফিরে যেতে পারছেন।

19

‘ফিরে দেখা’ কোনো নির্দিষ্ট কিউরেটরিয়াল ধারণা বা গবেষণাভিত্তিক প্রদর্শনী নয়, বরং এটি সময়ের প্রবাহে জন্ম নেয়া এক শিল্প-উপলব্ধির প্রতিফলন, যেখানে শিল্পীরা নিজেরাই হয়ে উঠেছেন সময়ের ভাষ্যকার। প্রদর্শনীর উদ্দেশ্য কোনো সময়ের পূর্ণাঙ্গ প্রতিচ্ছবি আঁকা নয়, বরং দর্শকের চোখে নতুন করে সেই সময়কে দেখার আহ্বান।

20

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন একদিকে যেমন সমাজে নতুন দিক উন্মোচন করেছিল, তেমনি শিল্পীদের চিন্তাধারা ও প্রকাশভঙ্গিকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। আন্তর্জাতিক শিল্পধারা, দেশীয় ঐতিহ্য ও নান্দনিক বোধের সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছিল এক নতুন শিল্পভাষা; যেখানে মুক্তি, মানবিকতা, লিঙ্গচেতনা, বাস্তবতা ও স্বপ্ন একসঙ্গে সহাবস্থান করেছে। এ সংলাপেরই প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ‘ফিরে দেখা’র প্রতিটি কাজের ভেতর।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন অধ্যাপক আবুল মনসুর। তিনি বলেন, ‘সত্তর থেকে নব্বইয়ের দশক বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়। ‘‘ফিরে দেখা’’ প্রদর্শনী সেই সময়ের শিল্পচর্চাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ এনে দিয়েছে। আমাদের দেশে অতীত প্রজন্মের শিল্পীদের কাজ নিয়ে প্রদর্শনীর উদ্যোগ খুবই কম। কলা কেন্দ্রের এ প্রচেষ্টা প্রজন্মের মধ্যে এক সেতুবন্ধ তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যৎ গবেষণা ও চিন্তার জন্য নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।’

অধ্যাপক মনসুরের এ কথাই যেন প্রদর্শনীর মর্মার্থকে ধারণ করে। ‘ফিরে দেখা’ কেবল অতীতকে স্মরণ নয়, বরং প্রজন্মান্তরে সংলাপের এক জীবন্ত সেতু।