আসবাব মেরামত করতেন ভদ্রলোক। কিন্তু দাবি করলেন শিল্পকর্ম ঠিক করাও তার কাছে নস্যি। সে আস্থায়ই তার হাতে তুলে দেয়া হয় ‘দি ইম্যাকুলেট কনসেপশন অব লস ভেনেরেবলস’ সংস্কার করার দায়িত্ব। সপ্তদশ শতাব্দীর চিত্রশিল্পী বার্তোলোমে ইস্তেবাম মুরিওর আঁকা চিত্রকর্মটি সব দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। তবে অপাত্রে ভরসা করার খেসারত গুনতে সময় লাগল না। পরপর দুবারের চেষ্টায় শিল্পকর্মটির যে দুটি ভিন্ন চেহারা দাঁড়াল, তাতে অনায়াসে বলা যায় মাটি হয়ে গেছে মুরিওর শ্রম। নয়া রূপে যিশুর মা মেরির মুখ আর অভিব্যক্তি চেনার জো রইল না। সেটা দেখার পর দর্শক হাসবে নাকি কাঁদবে তা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল।
দুর্ঘটনার কবলে পড়ে শিল্পকর্ম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু সেটা মেরামতের জন্য চাই এমন কাউকে, যে শিল্পের ঐতিহাসিক ও নান্দনিক গুরুত্ব নিয়ে ওয়াকিবহাল। অথচ অতীতে এমন ঘটনা কম ঘটেনি, যখন সংস্কার করতে গিয়ে শিল্পটাই নষ্ট হয়েছে। মুরিওর চিত্রকর্মটি সেখানে একটা উদাহরণ মাত্র। শুধু স্পেনই নয়, অন্য দেশ থেকেও হামেশা নজরে আসে এমন খবর।
শিল্পকর্ম সংস্কারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত মাঙ্কি ক্রাইস্ট। ৮১ বছর বয়সী সিসিলিয়া জিমেনেজ ২০১২ সালে কাদাহীন মন নিয়েই শুরু করেছিলেন সংস্কারের কাজ। উদ্ধার করতে উঠেপড়ে লাগেন ১৯৩০ সালের দিকে আঁকা এলিয়াস গার্সিয়া মার্টিনেজের আঁকা ফ্রেস্কো ‘এচ্চে হোমো’ (মানুষ দেখো)। অথচ পুনরুদ্ধারের বদলে তিনি ধ্বংস করে ফেলেন শিল্পকর্মটিকে। ফ্রেস্কোটি পরবর্তী সময়ে বিহোল্ড দ্য মাঙ্কি ও মাঙ্কি ক্রাইস্ট নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। কারণ নতুন চিত্রকর্মের দিকে তাকালে যিশুকে না, অন্যকিছু দেখবে দর্শক। যিশুর কাঁটার মুকুটও যেন রূপান্তরিত হয়ে গেছে রুশি উশাঙ্কা টুপিতে। অনেকটা ভ্যান গঘের ব্যান্ডেজযুক্ত কানের মতো। যদিও জিমেনেজের দাবি, তিনি পুরোহিতের অনুমতি নিয়ে কাজটি করেছিলেন। কাজের মাঝখানে তিনি ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন। ফলে অসমাপ্ত রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তামাশার কারণে তার স্বাস্থ্য পর্যন্ত খারাপ হয়ে যায়। ‘বিহোল্ড দ্য মাঙ্কি’ এখন বোরজায় অবস্থিত চার্চের প্রধান পর্যটন আকর্ষণগুলোর মধ্যে একটি। দর্শক আকর্ষণ করেছে প্রায় দুই লাখ। অর্থ এসেছে গির্জা ও দাতব্য সংস্থার তহবিলেও।
শিল্প বিকৃতির পরবর্তী উদাহরণ দেখতে তাকাতে হবে স্পেনে। ৫০০ বছরের পুরনো কাঠ দিয়ে নির্মিত সেন্ট জর্জের ভাস্কর্য। সান মিগুয়েল ডি এসটেলা গির্জায় রয়েছে ভাস্কর্যটি, যেখানে সেন্ট জর্জ ঘোড়ায় চড়ে ড্রাগনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। একদিন গির্জার পুরোহিত ভাস্কর্যটিকে আগের জৌলুস ফিরিয়ে দিতে মনঃস্থ হন, দায়িত্ব তুলে দেন স্থানীয় স্কুল শিক্ষকের হাতে। তখনই ঘটে বিপর্যয়। সেন্ট জর্জের ভাস্কর্য পরিণত হয় ডিজনির কোনো কার্টুন চরিত্রে। কেবল নান্দনিকতা হারিয়েছে এমন না, হারিয়েছে ঐতিহাসিক মূল্যও। কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে কানাডায়। ২০১৫ সালে অন্টারিওতে একটি যিশু মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্থানীয় শিল্পী হেদার ওয়াইজ এটি পুনঃস্থাপন করেন। তবে ফলাফল এমন ছিল যে সবাই অবাক হয়ে যায়—মূর্তিটি দেখতে হয়েছিল ম্যাগি সিম্পসনের মতো। যিশু মূর্তির মাথার রূপান্তর নিয়ে নানা বিতর্ক শুরু হয়। অনেকেই বলেছিলেন, এটি ম্যাগি সিম্পসন বা গ্রেমলিনের মতো। কিছু মানুষ নতুন মাথাটিকে কৌতুকের চোখে দেখলেও অন্যরা এটিকে পছন্দ করেনি। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল, বিকট মাথাটি যুক্ত করার পর চোরেরা মূল মাথাটি আবার গির্জায় ফিরিয়ে দেয়। অনুশোচনায় কিনা কে জানে! তবে ততক্ষণে গির্জার পুরোহিত বিকট মাথাটির সঙ্গেই সখ্য গড়ে তুলেছিলেন। মূর্তিটির ব্যাপারে শিল্পী হেদার ওয়াইজ বলেন, এটি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ। তিনি যিশুর মাথাটাকে সংস্কার করতে পেরে খুবই গর্বিত। যদিও নতুন রূপটি খুবই অদ্ভুত, তবু মানুষ মজার হিসেবেই গ্রহণ করেছে। পরবর্তী সময়ে এটি নিজেই একটি আর্ট পিস হিসেবে বিখ্যাত হয়।
পরবর্তী ঘটনা ২০১৮ সালের। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দিকে তৈরি তিনটি ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয়। সে ভাস্কর্যটিকে মেরামত করার জন্য বেছে নেয়া হয় অদ্ভুত পদ্ধতি। পুনঃস্থাপনের সময় পেইন্টে পুরোপুরি অগোছালো ও হাস্যকর রঙ ব্যবহার করা হয়। মেরামতকারী মারিয়া লুইসা মেনেন্দেজ ছিলেন একজন তামাকের দোকান মালিক। তিনি ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে ভেবেছিলেন ভাস্কর্যটিকে একটু রঙিন করে দিতে। ভাস্কর্যগুলো সাদামাটা লাগছিল তার চোখে, যতটুকু পেরেছেন হাতের কাছে থাকা রঙ ব্যবহার করেছেন। তার ভাষা ছিল সহজ, ‘যেগুলো আমি মনে করেছিলাম সঠিক রঙ। প্রতিবেশীরা তাদের পছন্দও করেছিল।’

কানসু প্রদেশের এক গাইড হাজার বছরের পুরনো সঙ রাজবংশের বুদ্ধ মূর্তির ওপর পেইন্ট নিয়ে সমস্যার কথা তোলেন। ১৯৯৫ সালে স্থানীয় গ্রামবাসী অদক্ষ ও অপ্রচলিত পদ্ধতিতে বুদ্ধ মূর্তিটি মেরামতের কাজ করেছিলেন। ২০১৮ সালে শু শিন যখন সেই মূর্তির যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন, তখন বিশ্বব্যাপী খ্যাতি পায়। হাসাহাসি হয়। আনইউয়ে কাউন্টি সরকার গ্রামবাসীর জ্ঞানহীনতাকে দায়ী করেন। যদিও তাদের ইচ্ছা ছিল ভালো। এ ঘটনার পর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য প্রশাসন অন্যান্য পুরাকীর্তির ব্যবস্থাপনা এবং সুরক্ষায় উন্নতি করেছে।
আরো একটি ঘটনার কথা বলে শেষ করা যেতে পারে। একজন স্থানীয় কারিগর মেহমেদ দাশপাকান তুরস্কের জাদুঘরে প্রাচীন মোজাইকগুলোর পুনঃস্থাপনা নিয়ে আলাপ তোলেন। মোজাইকের সূক্ষ্ম অঙ্কিত চিত্রগুলো বিকৃত দেখাচ্ছিল এবং কিছু বিষয় হারিয়ে গিয়েছিল। যেন মেরামত করতে গিয়ে দুই হাজার বছরের পুরনো মোজাইক সংস্কারের নামে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। যদিও জাদুঘর কর্তৃপক্ষের দাবি, ছবিগুলো পুনঃস্থাপনার প্রাথমিক পর্যায়ে তোলা হয়েছিল এবং সেগুলো শিগগিরই তাদের চেহরায় পুনঃস্থাপন করা হবে।

অদক্ষ কারিগররা যখন বিখ্যাত শিল্পীদের কাজে হাত দেন, তখন সাধারণত তা মেরামতের চেয়ে ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেটাই হয়েছে বারবার। যদিও এ ধরনের ঘটনা দুঃখজনক, তার পরও মানুষের নির্বুদ্ধিতা এক ধরনের হাস্যরস তৈরি করে। পুনঃস্থাপন প্রকল্পগুলো শুধু ভুলের কারণেই যে বিখ্যাত হয়ে ওঠে, এমন না। সেগুলো যেন এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হয়। এটা ভুল করা ও ভুল সিদ্ধান্ত নেয়ার চিরকালীন সংস্কৃতি।









