মানসিক সংগ্রাম, প্রতিরোধ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তোলেন। শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একুশে পদক (২০২৬)। ভাস্কর হিসেবে তার জীবন ও জীবনবোধ এবং দেশে ভাস্কর্য শিল্পের বর্তমান সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন নভেরার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুস্মিতা হোসেন
শিল্পী হয়ে ওঠার পথচলা কেমন ছিল?
চারুকলায় ভর্তির পেছনে আমার লক্ষ্যই ছিল ভাস্কর্য বিভাগে পড়া। সেখানে পড়াশোনার সময় শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রচুর সহযোগিতা পেয়েছি। আমার নিজেরও একধরনের চরম একাগ্রতা ছিল। ভোর ৬টায় চারুকলায় ঢুকে রাত ১০-১১টা পর্যন্ত কাজ করতাম। যদিও ক্লাস থাকত বেলা ২টা পর্যন্ত, কিন্তু আমি আউটডোরে বসে কাজ চালিয়ে যেতাম। সেসব আমি সচেতনভাবে করতাম নাকি স্বভাবতই হয়ে যেত তা জানি না। তবে অন্য কিছু করার চিন্তা কখনো মাথায় আসেনি। ছাত্রজীবনে একসময় পার্টটাইম চাকরি করেছি। ক্লাস শেষ হওয়ার পর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অফিসে কাজ করতে হতো। সেটা আমাকে ভীষণ কষ্ট দিত, মানিয়ে নিতে পারতাম না। অফিস থেকে বের হলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতাম। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দিয়ে আবার পুরোপুরি প্র্যাকটিসে মন দিলাম।
২০০৬ সালে পেলাম জয়নুল অ্যাওয়ার্ড গোল্ড মেডেল। এ পুরস্কার আমার কাজের মোড় ঘুরিয়ে দিল, আরো অনুপ্রেরণা দিল। এরপর চারুকলায় বেস্ট মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড ও এশিয়ান পর্যায়ে অনারেবল মেনশনের মতো স্বীকৃতিগুলো আমাকে আরো ভরসা দিয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমি ভাস্কর্য গড়ে যে আনন্দ পাই তা অন্য কোনো কাজে পাইনি। সম্ভবত এ আনন্দই আমাকে আজ পর্যন্ত এ পথে ধরে রেখেছে। মানুষের যেখানে ডোপামিন নিঃসৃত হয়, সেই কাজটাই সে বারবার করতে চায়। আমার ধারণা, আমার ক্ষেত্রে ঠিক সেটাই ঘটেছে।
সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে কল্পনাশক্তির বাইরেও বাস্তব অভিজ্ঞতা আর অন্তর্দৃষ্টির ভূমিকা অসীম। এ বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?
শুরুতে আমার অনুপ্রেরণা ছিল আমার পারিপার্শ্বিক অবস্থা। সমাজ, রাজনীতি কিংবা ধর্মীয় পারিপার্শ্বিকতা—চোখের সামনে যা দেখছি তা নিয়েই আমার প্রথম দিকের কাজগুলো।
ইমাজিনেশন কখনই হঠাৎ করে আসে না, এটা এক দীর্ঘ প্র্যাকটিস আর অভিজ্ঞতার ফল। প্রথম ধাপ হলো থিংকিং, অবজারভেশন—আমরা কী দেখছি, কী পড়ছি, কী শুনছি। বই পড়া এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। একটি কবিতা পড়তে পড়তেই মাথার ভেতরে নতুন দৃশ্য তৈরি হয়, আর সেখান থেকেই কল্পনার শক্তি বাড়তে থাকে।
দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতাও ইমাজিনেশনের উৎস। রাস্তায় বসে মানুষের চলাচল দেখা, নদীর মতো বহমান জীবনের প্রবাহ অনুভব করা, এসবই ভেতরে গভীর ইমপ্যাক্ট তৈরি করে। এরপর যখন আমরা আরো গভীরে যাই, তখন ধ্যান বা মেডিটেশনের মতো অবস্থায় গ্যালাক্সি, পৃথিবীর বাইরের জগৎ নিয়ে চিন্তা করি। এভাবেই ইমাজিনেশন বিস্তৃত হয়।

একটা পর্যায়ে এসে ইমাজিনেশন স্পিরিচুয়াল জায়গায় চলে আসে। সহজে সেখানে যাওয়া যায় না। দীর্ঘ চর্চার পর এখন আমি সে রকম একটি আধ্যাত্মিক জায়গা থেকে কাজ করি। রাস্তা দিয়ে মানুষ হেঁটে যাওয়াকে আমি বহমান নদীর মতো দেখি, যা অবচেতনে আমার মনে ছাপ ফেলে যায়।
দেশে ভাস্কর্যচর্চার ক্ষেত্রে প্রধান সংকট বা চ্যালেঞ্জগুলো কী?
আমাদের দেশের শিল্পীরা ভাস্কর্যচর্চা করতে ভয় পান। কেননা এটি একটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল মাধ্যম। ভাস্কর্য লোহা, পিতল বা ব্রোঞ্জ নিয়ে কাজ করতে গেলে যেমন প্রচুর খরচ হয়, তেমনি মেল্টিং বা কাস্টিংয়ের জন্য নানা টেকনিক্যাল ইস্যু থাকে। ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রসেসের প্রয়োজন হয়, যার খরচ ও অানুষঙ্গিক বিষয়াদি একজন শিল্পীর পক্ষে একা সামলানো কঠিন।
এছাড়া আমাদের দেশে পেইন্টিংয়ের তুলনায় ভাস্কর্যের সংগ্রাহক কম এবং অনেক ক্ষেত্রে শিল্পীদের বাধ্য হয়ে কম দামে কাজ বিক্রি করতে হয়। এক্ষেত্রে সংগ্রাহকদের দোষটাও আমি দেখি না। আমরা চর্চাটাও ওভাবে দেখাতে পারিনি; আমাদের বড় মাপের ভাস্কর হাতেগোনা। অন্যদিকে ভালো করার জন্য যে আধুনিক স্টুডিও বা সরঞ্জামের প্রয়োজন, সেগুলোর অভাবেও অনেক মেধাবী ভাস্কর পড়াশোনা শেষ করে অন্য পেশায় চলে যান। এগুলো বিশাল সংকট। সেক্ষেত্রে ভাস্কর্যচর্চা ও শিল্পীর সংখ্যা বাড়লে এ শিল্পের বর্তমান সীমাবদ্ধতা বা স্থবিরতা দূর হবে আবার সংগ্রাহকরা ভাস্কর্যের প্রকৃত শৈল্পিক গুরুত্ব ও আর্থিক মূল্য সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারবেন।
আপনার কাজ খুব সম্ভবত ২০০৬ বা ২০০৭ থেকে কালেক্টররা সংগ্রহ করছে। এ দীর্ঘ পথচলায় পেইন্টিংয়ের সঙ্গে স্কাল্পচারের প্র্যাকটিসে আপনি কী ধরনের বিবর্তন দেখেছেন?
ভাস্কর্য প্র্যাকটিসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্পেস ও অবকাঠামো। একটি সাধারণ রুমে ভাস্কর্যচর্চা সম্ভব নয়। এজন্য দরকার বড় ইন্ডাস্ট্রিয়াল জায়গা, ভারী মেশিন, নানা ধরনের সরঞ্জাম। এ কারণে ভাস্কর্যচর্চা শুরু করাই অনেকের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
প্রতি বছর বাংলাদেশের বিভিন্ন আর্ট ইনস্টিটিউট থেকে অনেক প্রতিভাবান ভাস্কর বের হলেও তারা যখন প্র্যাকটিস করতে যান, তখনই সামনে আসে বড় খরচের বাধা। অনেকেই এখানে এসে থেমে যান, অন্য চাকরিতে ঢোকেন। আর সেই চাকরির ভেতরে ঢুকে আর বের হতে পারেন না। তবু তাদের মনের ভেতরে থেকে যায় ভাস্কর্যচর্চা করার আকুতি।

এভাবে প্র্যাকটিস না হওয়ার কারণে কালেক্টররাও পর্যাপ্ত কাজ দেখতে পান না। হাতেগোনা কয়েকজন ভাস্কর ছাড়া আর কাউকে পাওয়া যায় না। যদি অনেক ভাস্কর একসঙ্গে নিয়মিত প্র্যাকটিস করতেন, তাহলে কালেক্টরদের জন্য কাজ দেখা ও সংগ্রহ করা সহজ হতো। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশে একসঙ্গে ১০ জন সক্রিয় ভাস্কর জোগাড় করাও কঠিন।
আমার মনে হয়, সামাজিকভাবে ভাস্কর্যকে ছোট করার কোনো প্রবণতা নেই। আসল সমস্যা হলো এর ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রসেস এবং এক্সপেনসিভ মিডিয়া। এ কারণে ভাস্কর্যচর্চায় সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ার মতো মানুষের সংখ্যা খুবই কম।
আপনিসহ আরো অনেক শিল্পীই এখন হাজারীবাগে স্টুডিও প্র্যাকটিস করছেন। সেখানে কি তাহলে কোনো ‘ক্রিয়েটিভ ভিলেজ’ গড়ে তোলা সম্ভব?
শিল্পীরা সবসময় এমন একটি জায়গা খোঁজেন যেখানে নিজের মতো একটি কমিউনিটি দাঁড় করানো যায়। অনেক সময় সেটা স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়, আবার অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে। হাজারীবাগের স্টুডিওর গল্পও ঠিক তেমনই। ২০১৭-১৮ সালের দিকে ট্যানারি মালিকরা যখন সেখান থেকে চলে যাচ্ছিলেন, তখন সুযোগ তৈরি হয় খালি জায়গাগুলোকে স্টুডিও হিসেবে ব্যবহার করার। আমার প্রথম থেকেই ইচ্ছা ছিল এটাকে একটি ক্রিয়েটিভ ভিলেজে রূপ দেয়া, যেখান থেকে প্রডাক্ট, ডিজাইন, নতুন আইডিয়া বের হবে; শিল্পী, আর্কিটেক্ট ও ডিজাইনাররা একসঙ্গে কাজ করবেন।
যদি এটাকে আরো সুন্দরভাবে গোছানো যায়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই এটি ভিন্নধর্মী এক কেন্দ্র হয়ে উঠবে।
শিল্পের সঙ্গে ব্যবসার কি কোনো বিরোধ আছে? ডেকোরেশনাল আর্ট বা ক্র্যাফট নিয়ে আপনার মত কী?
আমি মনে করি, শিল্পের সঙ্গে ব্যবসার কোনো বিরোধ নেই। চারুকলার সব শিক্ষার্থী শিল্পী হবেন না; কেউ ডিজাইন করবেন, কেউ ফ্রিল্যান্সিং করবেন, এতে কোনো ক্ষতি নেই। যেমন জয়নুল আবেদিনের ছবি যদি গহনা বা শাড়ির ডিজাইনে ব্যবহৃত হয়, তাতে তার কাজের ভ্যালু সাধারণ মানুষের কাছে আরো বাড়ে। শিল্প যখন মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হয়, তখনই তার সার্থকতা। তবে সংগ্রাহকদের কাছে একটি শিল্পকর্ম তখনই ‘রিয়েল এস্টেট’ বা মূল্যবান সম্পদ হয়ে ওঠে, যখন সেটি ইউনিক ও শিল্পীর দীর্ঘ সাধনার ফসল হয়।
বিদেশে শিল্পকর্ম পাঠানো বা ট্যাক্সেশনের ক্ষেত্রে আপনারা কী ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন?
এটি একটি বড় সমস্যা। বিদেশে আর্ট পিস পাঠাতে গেলে অনেক সময় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত ট্যাক্স দিতে হয়। কাস্টমস কর্মকর্তারা আর্টকে পণ্য বা ম্যাটেরিয়াল (যেমন ব্রোঞ্জ বা ফাইবার গ্লাস) হিসেবে বিচার করেন। কারণ আমাদের নীতিমালায় আর্ট সম্পর্কে আলাদা কোনো স্পষ্ট ক্লজ নেই। এমনকি দেশের বাইরে কাজ বিক্রি হলেও সেই টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে আনা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। আমার নিজের কাজ সিঙ্গাপুরে পাঠানোর সময় সেটিকে ‘অ্যান্টিক’ দাবি করে কার্বন টেস্টের জন্য ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এ সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য শিল্পীদের সংগঠিত হওয়া এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কাজ করা জরুরি।
শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর একুশে পদক পেয়েছেন। একজন শিল্পী হিসেবে এ অর্জন বা স্বীকৃতির দায়িত্বটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
প্রথমত বলব, রাষ্ট্রীয় এ স্বীকৃতি পেয়ে আমি নিজেকে খুব গর্বিত ও সৌভাগ্যবান মনে করি। আমি কখনো এটা আশা করিনি, তাই এটি আমার জন্য অন্য রকম এক আনন্দের। আমাদের দেশটা খুব নবীন এবং আমাদের ভাস্কর্যচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসও খুব বেশি দিনের নয়। নভেরা আহমেদ আমাদের দেশে আধুনিক ভাস্কর্যচর্চার পথিকৃৎ, তার পরে হামিদুজ্জামান খান, আবদুর রাজ্জাকের মতো আধুনিক ভাস্কররা এসেছেন। এর আগে যারা ছিলেন তারা আধুনিক বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চর্চাটা করেননি।
নভেরা আহমেদের মাধ্যমে ভাস্কর্যচর্চার যে যাত্রা শুরু, আমি নিজেকে সেখানে একটি কানেক্টিং ডট মনে করি। আমি ওই যাত্রার একজন যাত্রী ও অংশীদার। এখন আমি যে অবস্থানে আছি, আমার পরে সেখানে আরেকজন আসবেন। এ রকম একটা ক্রনিক্যাল জার্নিতেই আমার বিশ্বাস ও বসবাস। সেজন্য রাষ্ট্রীয় এ প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিকভাবেই একটি দায়িত্ব চলে আসে। ভাস্কর্যচর্চা যে সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র, সেটাকে দেশের অর্থনীতিতে কীভাবে কাজে লাগানো যায় এবং অনুজদের কীভাবে অনুপ্রাণিত করা যায়, কীভাবে প্রচুর ভাস্কর তৈরি করা যায়, সে রাস্তাটি তৈরি করার মতো ভাবনাগুলোও এ দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
নতুন প্রজন্মের ভাস্করদের জন্য আপনার পরামর্শ বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আমি উপদেশে বিশ্বাসী নই, বরং প্র্যাক্টিক্যালি কিছু করতে চাই। আমার লক্ষ্য হলো হাজারীবাগের স্টুডিওটিকে এমন একটি আধুনিক ভাস্কর্য স্টুডিও হিসেবে গড়ে তোলা, যেখানে সব ধরনের সরঞ্জাম থাকবে। যাতে তরুণ শিল্পীরা ইন্ডাস্ট্রিয়াল জায়গায় না গিয়েও কাজ করতে পারেন। আমি চাই আরো বেশি ভাস্কর তৈরি হোক, তারা প্রয়োজনে ডেকোরেশন পিস বা প্রডাক্ট তৈরি করুন, কিন্তু চর্চাটা যেন চালিয়ে যান। শিল্পী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো দেশ ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসা এবং সেই মূল্যবোধ কাজের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া।









