নিউইয়র্কের এলিস আইল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একটি বিশেষ স্থান। উনিশ শতকের শেষভাগ আর বিশ শতকের প্রথমার্ধে হাজার হাজার অভিবাসী এ ছোট্ট দ্বীপের ইমিগ্রেশন স্টেশন দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন। এ অভিবাসীরা আজ যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। এ স্টেশন দিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেছেন পূর্ব ইউরোপের ইহুদ, কাজের খোঁজে আসা ইতালীয়, গণহত্যা থেকে বাঁচতে আর্মেনীয়, নতুন জীবনের সন্ধানে সিরীয়—এ রকম অসংখ্য অভিবাসীর জীবনের গল্প জড়িয়ে আছে এলিস দ্বীপে।
শিল্পী প্যাসিটা আবাদ ১৯৯১ সালে পর্যটক হিসেবে এসেছিলেন এই এলিস দ্বীপে। এ ভ্রমণ তাকে যুক্তরাষ্ট্রে হাজির হওয়া এশীয়, আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকান অভিবাসীদের গল্প সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে তোলে। কিন্তু খেয়াল করলেন এ গল্প আমেরিকার ইতিহাসে জায়গা পায়নি।
আবাদ নিজেও যুক্তরাষ্ট্রে একজন এশীয় অভিবাসী। তার জন্ম ফিলিপাইনের বাতানেস দ্বীপে। তিনি জানেন এশীয়, আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকানরা বিভিন্ন পথে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রেখেছেন। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে যে এশীয় ও লাতিন আমেরিকানরা স্ট্যাচু অব লিবার্টির দেশে পা রেখেছেন তাদের অভিজ্ঞতা জানতে তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তখন ১৯৯২ সালে তিনি আঁকেন এলএ লিবার্টি শিরোনামের একটি চিত্রকর্ম। এতে তিনি লেডি লিবার্টিকে বিভিন্ন রঙ ও প্যাটার্নের আলখেল্লায় হাজির করেছেন। তার পেছন দিকে অনেকগুলো রঙের বিচ্ছুরণ। তার হাতে ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্সের পরিবর্তে একটি রঙিন ফলক। মূলত যে বহু সংস্কৃতি-বর্ণের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রকে গড়ে তুলেছেন এবং তাদের ইতিহাস যে উপেক্ষিত সে বার্তাই তিনি হাজির করেন এ চিত্রকর্মে। এটি শিল্পী প্যাসিটা আবাদের সবচেয়ে আলোচিত কাজগুলোর একটি।
আশির দশকে আবাদ সুদান, আফগানিস্তান, লাওস, পাকিস্তান, ভারতসহ অনেক দেশ ভ্রমণ করেন। প্রতিনিয়ত ভ্রমণ তিনি বৈশ্বিক অস্তিত্বকে নিজের মধ্যে অনুভব করতেন। এ সময় তিনি বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে তার নিজের অভিবাসী জীবনের গল্পের মিল খুঁজে পেয়েছেন। এ সময় তার চিত্রকর্মে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে। তবে তার সবচেয়ে আলোচিত কাজ ‘ইমিগ্র্যান্ট এক্সপেরিয়েন্স’ সিরিজটি। ১৯৯০-এর দশকে তিনি এ সিরিজ আঁকেন। এ সিরিজের একটি চিত্রকর্মের নাম ফিলিপিনা: আ রেসিয়াল আইডেন্টিটি ক্রাইসিস। এতে পাশাপাশি দুজন নারীকে দেখা যায় বা পাশে ফিলিপিনো অভিনেত্রী মারিয়া ইসাবেল লোপেজ আর ডান পাশে মালয় সম্প্রদায়ের কৃষ্ণবর্ণের এক নারী। এ দুই নারীর পরিচয় আবাদ ভালোভাবে জানতেন। কিন্তু যাদের তিনি চিনতেন না তাদের জীবনও এঁকেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করা কোরীয় দোকানদার, গুয়ানতানামো বের এক উদ্বাস্তু শিবিরে থাকা হাইতিয়ান।
আবাদের শিল্প কনটেন্ট ও ফর্ম বহুমাত্রিক, বহুসংস্কৃতির ধারক। তিনি তার আঁকার বিষয়বস্তু হিসেবে যেমন বিভিন্ন সংস্কৃতির উপাদান নিয়েছেন, তেমনি আঁকার পদ্ধতিতে ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন কৌশল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে যে বিমূর্ত চিত্রায়ণের ধারা চলছিল, সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি ভিন্ন পথে হেঁটেছেন।
আবাদের ‘মাস্ক অ্যান্ড স্পিরিটস’ সিরিজটি প্রায় একই সময়ে তৈরি। এটি তার সবচেয়ে প্রশংসিত কাজের মধ্যে একটি বলে গণ্য হয়। এ সিরিজে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ইউরোপিয়ান মাস্ক। এখানে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ইউরোপীয় মুখোশটা তাহলে ঠিক কী রকম? এ প্রশ্নের মাঝে ছিল তার সমালোচনা। তিনি দেখিয়েছেন ইউরোপীয় শিল্পীরা তাদের মতো একরৈখিক দৃষ্টি-দর্শন দিয়ে দেখেছেন আফ্রিকার বহুমাত্রিক সংস্কৃতি-পরিচয়কে। তাদের কাছে আফ্রিকার বহুনকশার মুখোশগুলো যেন পরিচয়হীন।









