মাইক নেই, আলো নেই, পর্দা নেই। তবু দর্শক ছিল—এমন শিশুরা, যাদের চোখে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে শুধু ভয়। ঘর পুড়েছে, মানুষ মরেছে, পরিচিত পৃথিবী উল্টে গেছে। সেখানে একজন শিল্পী উপস্থিত হলেন কাঠ আর কাপড়ের পুতুল নিয়ে।

মঞ্চে ইয়াহিয়া খানের পুতুল একটি কৃষক পুতুলের বুকে বন্দুক ঠেকাল। জিজ্ঞেস করল, ‘মুক্তিযোদ্ধা কোথায়?’ কৃষক পুতুলটি একটু থামল। চারদিকে তাকাল। তারপর নিজের বুকে হাত রেখে বলল, ‘মুক্তি আমার ভেতরে আছে। সব বাঙালির ভেতরেই আছে।’

মুস্তাফা মনোয়ারকে বোঝার জন্য এ মুহূর্তটিই যথেষ্ট। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পের কাজ কেবল অনুভূতি জাগানো নয়, অনুভব করার শক্তি ফিরিয়ে দেয়া। যে মানুষ আঘাতে অসাড় হয়ে গেছে, তাকে আবার অনুভব করতে পারা মানুষে পরিণত করা। এ বিশ্বাস থেকেই তার সমগ্র শিল্পজীবনের সূত্র বের হয়।

মুস্তাফা মনোয়ার কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞান পড়তে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞান তাকে টানত না, আঁকাআঁকি টানত। একদিন সৈয়দ মুজতবা আলী তার আঁকা ছবি দেখলেন এবং তাকে নিয়ে গেলেন কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটে। ১৯৫৯ সালে সেই কলেজ থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হলেন তিনি। ১৯৫৭ সালে কলকাতায় নিখিল ভারত চারু ও কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিকসে স্বর্ণপদক, ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রদর্শনীতে তেলচিত্র ও জলরঙ—দুটি মাধ্যমে আলাদা দুটি স্বর্ণপদক। এ সাফল্যের পর একজন তরুণ শিল্পীর সামনে যে পথ খোলা থাকে তা মোটামুটি চেনা—ক্যানভাস, গ্যালারি, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী। কিন্তু সেই একই বছরে, ১৯৫৮ সালে, কলকাতায় রাজস্থান থেকে একটি পুতুলনাচের দল এল। মনোয়ার সে প্রদর্শনী দেখলেন এবং পরে বললেন, ‘রাজস্থানের সেই পুতুলের ভাস্কর্যের গুণ আর সরলতা আমাকে আঘাত করেছিল। শৈশবের যে ভাবনাগুলো মনে ছিল, সেগুলো বাস্তবে রূপ দেয়ার কথা মাথায় এল।’

18

শৈশবের সেই ভাবনা এসেছিল বাবার কাছ থেকে। কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন শিল্পরসিক মানুষ। ঝিনাইদহের শৈলকূপায় পৈতৃক ভিটায় পুতুলনাচের দল ডাকতেন। গ্রামের মেঠো মঞ্চে কাঠ আর কাপড়ের সেই সংসার তার মনে গেঁথে গিয়েছিল। পরিবারে লোকশিল্পের প্রতি এ শ্রদ্ধাই তাকে দিয়েছিলেন বাবা এবং সেই উত্তরাধিকার তিনি বহন করেছিলেন সারা জীবন।

বাংলাদেশের শিল্পচর্চার ইতিহাসে একটা স্থায়ী উত্তেজনা আছে লোকশিল্প ও আধুনিক শিল্পের মধ্যে। পটচিত্র, নকশিকাঁথা, পুতুলনাচ—হাজার বছরের এ সম্পদ একদিকে। অন্যদিকে পাশ্চাত্যের সঙ্গে সংলাপে গড়ে ওঠা আধুনিকতাবাদী চর্চা, যা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন থেকে শিল্পী মনিরুল ইসলাম পর্যন্ত এসেছে। এ দুই ধারা কখনো কথা বলেছে, কখনো পরস্পরকে অস্বীকার করেছে।

মুস্তাফা মনোয়ার এ বিভাজনকে নিজের সমস্যা মনে করেননি। তিনি দুটি ধারার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু কোনো একটির প্রতি আনুগত্য না জানিয়ে বরং দুটিকেই একটি নতুন শিল্পের ভেতরে একত্র করার চেষ্টা করেন। তার পুতুলনাচের মঞ্চে শেক্সপিয়ারের ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ উঠেছে, রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ উঠেছে, হান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের ‘নাইটিংগেল ও কুৎসিত রাজহাঁস’ উঠেছে। হাজার বছরের লোকমাধ্যমে বিশ্বসাহিত্য। লোকমাধ্যমে সমাজসচেতনতার পাঠ। লোকমাধ্যমে এইডস প্রতিরোধ থেকে পরিবেশ রক্ষার বার্তা।

19

এটি সংরক্ষণ নয়, উদ্ভাবন। যে শিল্পী লোকমাধ্যমকে জাদুঘরে রাখতে চান, তিনি সংরক্ষক। যিনি তাকে নতুন বিষয়বস্তু দিয়ে জীবন্ত রাখতে চান, তিনি ভিন্ন কাজ করছেন। তার পুতুল কাঠ, কাদামাটি আর কাপড় দিয়ে তৈরি—সম্পূর্ণ দেশীয় উপকরণে। কিন্তু সেই পুতুলের মুখে উঠত আধুনিক প্রশ্ন। মস্কো ও তাসখন্দে গেলেন বাংলাদেশের ফোক পাপেট নিয়ে। ডেনমার্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক পুতুল শিল্প উন্নয়ন কেন্দ্রের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হলেন। স্থানীয়তা বৈশ্বিক হয়ে উঠল, কিন্তু নিজেকে বিসর্জন না দিয়ে।

১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জ সরকারি হাইস্কুলে নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে পোস্টার আঁকলেন। পুরস্কার হিসেবে পেলেন কারাবাস। পাকিস্তানি সরকার বুঝেছিল, কিশোরের আঁকা ছবিও কথা বলে এবং সেই কথা বিপজ্জনক হতে পারে। এ উপলব্ধি তাকে পথ দেখিয়েছে সারা জীবন। শিল্প নিরীহ নয়, শিল্পের পরিণতি আছে।

তাই ১৯৭১ সালে যখন দেশ জ্বলছে, মুস্তাফা মনোয়ার অস্ত্র তুললেন না, পুতুল তুললেন। কিন্তু সেই পুতুলের ভাষা ছিল অস্ত্রের মতোই নির্দিষ্ট। সেই শরণার্থী শিবিরে যা ঘটেছিল, তার রেকর্ড রাখলেন আমেরিকান চলচ্চিত্র নির্মাতা লিয়ার লেভিন, যিনি মনোয়ারের পুতুলশোর ওপর একটি তথ্যচিত্র করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেই চিত্রধারণ পরে তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫)-এ ঠাঁই পেয়েছিল। একটি অস্থায়ী মঞ্চে কাঠ আর কাপড়ের শিল্পকর্ম ইতিহাসের দলিলে প্রবেশ করল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শিল্পকীর্তি নিয়ে আলোচনায় সাধারণত ক্যানভাস ও ভাস্কর্য আসে। মনোয়ারের এ অবদান কম উচ্চারিত থেকেছে। কোনো গ্যালারিতে ঝোলেনি কিছু, সংগ্রহশালায় রাখা হয়নি। তবু সেই শিশুদের হাসিতে টিকে গিয়েছিল।

দেশে ফেরার পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পরামর্শে আর্ট কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। কিন্তু বেশিদিন সেখানে থাকলেন না। চলে গেলেন টেলিভিশনে। কারণটি তিনি নিজেই একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানিদের প্রতি কিছুটা ক্ষোভ থেকেই ইচ্ছে করে টেলিভিশনে যোগ দিয়েছিলাম।’ শিশুদের মনে যেন পাকিস্তানিদের মিথ্যা প্রতিষ্ঠিত না হয়, সত্য ও সুন্দরের প্রতি যেন তারা সজাগ থাকে—এ লক্ষ্যেই শিশুদের টার্গেট করলেন।

20

এ স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ। টেলিভিশনকে তিনি দেখেছিলেন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে—সেই অর্থে, যেভাবে ১৯৫২ সালে পোস্টার হাতিয়ার ছিল, ১৯৭১ সালে পুতুলনাচ হাতিয়ার ছিল। ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশের টেলিভিশনে শুরু করলেন ‘নতুন কুঁড়ি’, শিশু প্রতিভার একটি মঞ্চ। ১৯৭৩ সালে নির্মাণ করলেন রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’। তারপর এল ‘মনের কথা’, পুতুলের সেই দুনিয়া যেখানে পারুল আর তার সাত ভাই বাস করত।

‘সাত ভাই চম্পা’র লোককাহিনী থেকে নেয়া পারুল ছিল শিল্পীমনের প্রতীক, যে সমস্যা সমাধান করে কল্পনার ভাষায়। বাউল ভাই গাইত গ্রামীণ সুরে, ষাঁড় ভাই জেদ ধরত। প্রতিটি চরিত্র একটি সামাজিক ধরনের রূপান্তর।

অনুষ্ঠানটি কেবল বিনোদন ছিল না, এটি শিল্পশিক্ষাও ছিল। প্রতি পর্বে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার (পরে তিনি নিজেই ক্যামেরার সামনে এলেন) হাতে-কলমে আঁকার পদ্ধতি দেখাতেন। টানা ১২ বছর প্রচারিত হয়েছিল ‘মনের কথা’। সত্যজিৎ রায় মনোয়ারের এ টেলিভিশন-প্রযোজনার মঞ্চসজ্জা ও আবহ নির্মাণের প্রশংসা করেছিলেন। ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘টেলিভিশন নাটকের বৈশ্বিক ইতিহাস’ অনুষ্ঠানে মনোনয়ন পেয়েছিল।

কিন্তু সমস্ত পুরস্কার ও মনোনয়নের বাইরে একটি মাপ আছে, যা পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না—কোটি মানুষের শৈশবস্মৃতিতে জায়গা করে নেয়া। যে শিশু পারুলকে ভালোবেসেছিল, সে আজ মধ্যবয়সী। সে জানে না চিত্রসমালোচকরা মনোয়ারকে কী বলেন; সে শুধু জানে বাউল ভাইয়ের গান তার শৈশবের অংশ। এটি কম কথা নয়।

একটি প্রশ্ন কম জিজ্ঞেস করা হয়েছে—মুস্তাফা মনোয়ারের চিত্রকলা আসলে কী?

ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম, তিনটি আন্তর্জাতিক স্বর্ণপদকের অধিকারী একজন শিল্পীর চিত্রকলা বাংলাদেশের কতজন দেখেছেন? গত বছর তার নব্বইতম জন্মদিনে চ্যানেল আইয়ে যে বিশেষ অনুষ্ঠান হয়েছিল, সেখানে দর্শকদের প্রথমবারের মতো তার অনেক চিত্রকর্ম দেখানো হয়েছিল, যেগুলো আগে কোনো প্রদর্শনীতে আসেনি। জলরঙ ও ড্রয়িং ছিল তার মূল মাধ্যম, কিন্তু সেই কাজ রয়ে গেছে মূলত ব্যক্তিগত।

মনোয়ার জানতেন, তার জলরঙ দেখবে ১০ জন, কিন্তু পারুলকে দেখবে ১০ লাখ। এ অংক তিনি নিজেই করেছিলেন এবং নিজেই বেছে নিয়েছিলেন ১০ লাখের পথ। তবু সেই অদেখা চিত্রকর্মের প্রশ্নটি থাকে। শিল্পের ইতিহাস প্রায়ই এমন মানুষকে অবিচার করে, যিনি একাধিক মাধ্যমে কাজ করেছেন। একটি পরিচয় বড় হয়ে যায়, অন্যগুলো ছায়ায় পড়ে থাকে। মনোয়ারের ক্ষেত্রে ‘পাপেটম্যান’ পরিচয়টি এতটাই বড় হয়েছে যে চিত্রকর পরিচয়টি অনেকটাই ঢাকা পড়ে গেছে। এটি তার সিদ্ধান্তের ফল হলেও শিল্পের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে এ শূন্যস্থান পূরণ করার দায়িত্ব এখন অন্যদের।

মুস্তাফা মনোয়ারের জীবন একটি নীরব থিসিস উপস্থাপন করে—শিল্পকে মানুষের কাছে নামিয়ে আনা যায় এবং সেই নামানোর মধ্যে শিল্প ছোট হয় না। বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রশিল্পের ইতিহাসে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পরে যে প্রজন্ম এসেছে, তাদের মধ্যে অনেকেই বেছে নিয়েছেন গ্যালারির পথ। সেই পথের মূল্য আছে, সেই কাজের গভীরতা আছে। কিন্তু মনোয়ার অন্য এক প্রশ্ন তুলেছিলেন—শিল্পকর্ম যদি শুধু যারা গ্যালারিতে যান তাদের কাছেই পৌঁছায়, তাহলে কি সমাজের সঙ্গে শিল্পের সত্যিকার সংলাপ সম্ভব?

এ প্রশ্নের জবাবে তিনি পুতুল বেছে নিয়েছিলেন। টেলিভিশন বেছে নিয়েছিলেন। শিশু বেছে নিয়েছিলেন। কারণ শিল্পের ভবিষ্যৎ শিশুর কল্পনায়—এটি তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন।

১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়েছিল ‘সিসেমি স্ট্রিট’। পুতুল, বাস্তব অভিনেতা, অ্যানিমেশন, গান আর ছোট ছোট নাটক মিলিয়ে একধরনের edutainment, যেখানে বর্ণমালা-সংখ্যার পাশাপাশি বন্ধুত্ব, সহমর্মিতা, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা আর আবেগ নিয়ন্ত্রণের মতো সামাজিক দক্ষতাও শেখানো হতো। বিশ্বজুড়ে এ অনুষ্ঠান আলোড়ন তুলেছিল। সেই আদলেই তৈরি হলো বাংলা সংস্করণ ‘সিসিমপুর’, যেখানে মুস্তাফা মনোয়ার অবদান রাখলেন। ১৯৯৭ সালে ধানমন্ডিতে প্রতিষ্ঠা করলেন এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, যেখানে পরবর্তী প্রজন্মের পুতুলশিল্পীরা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক থাকাকালীন সেখানে ডিজাইন বিভাগের প্রধান ছিলেন ভাষাসৈনিক শিল্পী ইমদাদ হোসেন। দুজনের যৌথ উদ্যোগেই তৈরি হয়েছিল বিটিভির লোগো। আর ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লালরঙের সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনাটিও তাদের যৌথ পরিকল্পনার ফসল।

এ সহযোগিতার কথাটি বলা দরকার, কারণ মনোয়ারের মতো বড় নাম প্রায়ই এমনভাবে স্মরণ করা হয় যেন প্রতিটি কাজ একার, অথচ তার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজই হয়েছে এমন সহযোগীদের সঙ্গে, যাদের নাম ইতিহাসে কম উচ্চারিত হয়।

মুস্তাফা মনোয়ার চলে গেছেন ২৯ জুন ২০২৬, নব্বই বছর বয়সে। শহীদ মিনারের পাশে, যেখানে তারই পরিকল্পনার লাল সূর্য দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে পরদিন তাকে রাখা হয়েছিল সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। সেই সূর্যটি এখনো আছে। পারুলও আছে, যে প্রজন্মের মনে তিনি আলো জ্বেলেছিলেন, তাদের স্মৃতিতে।

লেখক: শিক্ষক; প্রাচ্যকলা বিভাগ, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়